অ্যান্ড্রু সায়মন্ডস

৯ জুন, ১৯৭৫ তারিখে ওয়ারউইকশায়ারের বার্মিংহামে জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার ছিলেন। মূলতঃ অল-রাউন্ডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ডানহাতে ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ডানহাতে মিডিয়াম কিংবা ডানহাতে অফ-ব্রেক বোলিংয়ে পারদর্শী ছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে সকল স্তরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।

‘রয়’ ডাকনামে ভূষিত অ্যান্ড্রু সায়মন্ডস ৬ ফুট ২ ইঞ্চি (১.৮৭ মিটার) উচ্চতার অধিকারী ছিলেন। তারকা ক্রিকেটারের মর্যাদা পেয়েছেন। ১৯৯৪-৯৫ মৌসুম থেকে ২০০৮-০৯ মৌসুম পর্যন্ত সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন অতিবাহিত করেছেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটে কুইন্সল্যান্ড এবং ইংরেজ কাউন্টি ক্রিকেটে গ্লুচেস্টারশায়ার, কেন্ট, ল্যাঙ্কাশায়ার ও সারে দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়াও, ডেকান চার্জার্স, মুম্বই ইন্ডিয়ান্স ও অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট একাডেমির পক্ষে খেলেছেন। ১৯৯৪-৯৫ মৌসুমে কুইন্সল্যান্ডের পক্ষে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো অংশ নেন। অপরাজিত ১০৮ রান তুলে নিজস্ব প্রথম প্রথম-শ্রেণীর শতক হাঁকান।

১৯৯৮ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়কালে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে সর্বমোট ২৬ টেস্ট, ১৯৮টি ওডিআই ও ১৪টি টি২০আইয়ে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালে দলের সাথে পাকিস্তান গমন করেন। ১০ নভেম্বর, ১৯৯৮ তারিখে লাহোরে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক পাকিস্তানের বিপক্ষে ওডিআইয়ে অংশ নেয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে প্রবেশ করেন। তিনি মাত্র দুই ওভার বোলিং করেছিলেন ও ব্যাটিংয়ে নামার কোন সুযোগ পাননি।

ওডিআই অভিষেকের ছয় বছর পর টেস্ট খেলার সুযোগ পান। ২০০৩-০৪ মৌসুমে রিকি পন্টিংয়ের নেতৃত্বাধীন অজি দলের সাথে শ্রীলঙ্কা গমন করেন। ৮ মার্চ, ২০০৪ তারিখে গলেতে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে তাঁর অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। প্রথম ইনিংসে শূন্য রানে বিদেয় নেন। দ্বিতীয় ইনিংসে অবশ্য ২৪ রান তুলেছিলেন। উভয় ক্ষেত্রেই মুত্তিয়া মুরালিধরনের শিকারে পরিণত হন। এছাড়াও, প্রথম ইনিংসে ৬৮ রান খরচায় মাহেলা জয়াবর্ধনকে বিদেয় করে একটি উইকেটের সন্ধান পেয়েছিলেন। ঘটনাবহুল এ টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে প্রতিপক্ষীয় অধিনায়ক হাসান তিলকরত্নেকে কট আউট করে শেন ওয়ার্নের ৫০০ উইকেট লাভের মাইলফলকের সাথে নিজেকে যুক্ত করেন। তবে, ম্যাথু হেইডেনের অসাধারণ অল-রাউন্ড ক্রীড়াশৈলীর কল্যাণে স্বাগতিকরা ১৯৭ রানে পরাভূত হলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে পিছিয়ে পড়ে।

২০০৫-০৬ মৌসুমে নিজ দেশে গ্রায়েম স্মিথের নেতৃত্বাধীন স্প্রিংবকের মুখোমুখি হন। ১৬ ডিসেম্বর, ২০০৫ তারিখে পার্থে অনুষ্ঠিত সফররত দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সফলতার সন্ধান পান। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যক্তিগত পূর্বতন সর্বোচ্চ ২৪ রান অতিক্রম করেন। খেলায় তিনি ১৩ ও ২৫ রান সংগ্রহ করেন। এছাড়াও, ০/৬ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। ব্রাড হজের দূর্দান্ত প্রয়াস সত্ত্বেও খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অগ্রসর হতে থাকে।

একই সফরের ২ জানুয়ারি, ২০০৬ তারিখে সিডনিতে অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ১/৬৯ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, একবার ব্যাট হাতে নিয়ে ১২ রান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে,দলীয় অধিনায়ক রিকি পন্টিংয়ের জোড়া শতকের কল্যাণে সফরকারীরা ৮ উইকেটে পরাভূত হলে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়।

একই মৌসুমে রিকি পন্টিংয়ের নেতৃত্বাধীন অজি দলের সদস্যরূপে দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরতি সফরে যান। ৩১ মার্চ, ২০০৬ তারিখে জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ১/২৬ ও ০/১৮ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, ব্যাট হাতে নিয়ে ৪ ও ২৯ রান সংগ্রহসহ দুইটি ক্যাচ তালুবন্দীকরণে অগ্রসর হন। তবে, ব্রেট লি’র দূর্দান্ত অল-রাউন্ড সাফল্যে স্বাগতিকরা নাটকীয়ভাবে ২ উইকেটে পরাজয়বরণ করলে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়।

২০০৭-০৮ মৌসুমে নিজ দেশে অনিল কুম্বলে’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের মুখোমুখি হন। ১৬ জানুয়ারি, ২০০৮ তারিখে পার্থে অনুষ্ঠিত সফররত ভারতের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় টেস্টে অংশ নেন। ব্যাট হাতে নিয়ে ৬৬ ও ১২ রান সংগ্রহ করে উভয় ক্ষেত্রে অনিল কুম্বলে’র শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। এছাড়াও, ১/৩৬ ও ২/৩৬ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। ইরফান পাঠানের অল-রাউন্ড ক্রীড়াশৈলীর কল্যাণে সফরকারীরা ৭২ রানে জয় পেলেও চার-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-১ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকে।

২০০৮ সালে রিকি পন্টিংয়ের নেতৃত্বাধীন অজি দলের সাথে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ সফরে যান। ৩০ মে, ২০০৮ তারিখে নর্থ সাউন্ডে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট খেলেন। খেলায় তিনি ১৮ ও ৪৩* রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। এছাড়াও, ০/২৫ ও ০/১০ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। শিবনারায়ণ চন্দরপলের অসাধারণ ব্যাটিং দৃঢ়তায় খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালেও তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে স্বাগতিকরা ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে।

এরপর, ১২ জুন, ২০০৮ তারিখে ব্রিজটাউনে অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ব্যাটিংয়ে নেমে ৫২ ও ২ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, ১/১৭ ও ০/৬ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তবে, সায়মন ক্যাটিচের অসাধারণ ব্যাটিংশৈলীর কল্যাণে সফরকারীরা ৮৭ রানে জয় পেলে ২-০ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়।

২০০৮-০৯ মৌসুমে নিজ দেশে গ্রায়েম স্মিথের নেতৃত্বাধীন স্প্রিংবকের মুখোমুখি হন। ২৬ ডিসেম্বর, ২০০৮ তারিখে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত সফররত দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট খেলেন। খেলায় তিনি ব্যাটিংয়ে নেমে ২৭ ও ০ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/১৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তবে, ডেল স্টেইনের অসাধারণ অল-রাউন্ড ক্রীড়াশৈলীর কল্যাণে স্বাগতিকরা ৯ উইকেটে পরাজিত হলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-০ ব্যবধানে সিরিজে পিছিয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।

২০০০-এর দশকে অস্ট্রেলিয়ার উত্থানে অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছিলেন। ইংল্যান্ড কিংবা অস্ট্রেলিয়া যে-কোন একটি দলকে বেছে নেয়ার প্রশ্নে অজি দলকেই বেছে নেন তিনি। ২০১২ সালে ক্রিকেট খেলা থেকে অবসর গ্রহণের পর ধারাভাষ্য কর্মের সাথে জড়িয়ে পড়েন। ফক্স ক্রিকেটে শেন ওয়ার্নের সাথে সদস্য হিসেবে যুক্ত হন। কেন সায়মন্ডস ও বারবারা সায়মন্ডস দম্পতির সন্তান ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত ছিলেন। ২০০৫ সালে ব্রুক মার্শালের সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হলেও পরের বছরেই বিবাহ-বিচ্ছেদে পরিণত হয়। এরপর, লরা ভিডমারকে বিয়ে করেন। এ দম্পতির ক্লো সায়মন্ডস নাম্নী এক কন্যা ও বিলি নামীয় পুত্র সন্তান রয়েছে। গাড়ী দূর্ঘটনার কবলে পড়ে ১৪ মে, ২০২২ তারিখে মাত্র ৪৬ বছর ৩৩৯ দিন বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। মুম্বইয়ে তাঁর স্মরণে চিত্রকর্ম প্রদর্শন করা হয়। তাঁর সম্মানার্থে সারে ও কেন্ট দলের খেলোয়াড়েরা এক মিনিট নীরবতা পালন করে। টাউন্সভিলের রিভারওয়ে স্টেডিয়ামের একটি ছাউনি তাঁর নামানুসারে রাখা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *