|

বিল বোজ

২৫ জুলাই, ১৯০৮ তারিখে ইয়র্কশায়ারের ইল্যান্ড এলাকায় জন্মগ্রহণকারী পেশাদার ক্রিকেটার ছিলেন। দলে মূলতঃ বোলার হিসেবে ভূমিকা রেখেছিলেন। ডানহাতে ফাস্ট-মিডিয়াম কিংবা ডানহাতে মিডিয়াম বোলিং করতেন। এছাড়াও, ডানহাতে নিচেরসারিতে ব্যাটিংয়ে নামতেন। ইংল্যান্ডের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছিলেন।

সন্দেহাতীতভাবে নিজের সময়কালে ইংল্যান্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পেসারের মর্যাদাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। ইচ্ছেমাফিক দ্রুতগতিসম্পন্ন পেস বোলিং করতে পারতেন। এছাড়াও, নিখুঁতভাব বজায় রেখে সমীহের পাত্রে পরিণত করতেন নিজেকে। দ্রুতগতিতে বোলিংয়ের ফলে ব্যাটসম্যানদেরকে প্রায়শঃই অফের দিকে খেলতে বাধ্য করাতেন। দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও মনেপ্রাণে ঘণ্টাকাল অনুশীলন করতেন। বয়সের সাথে সাথে তাঁর পেস কমে গেলেও পেসার হিসেবে তাঁর দক্ষতার কোন কমতি ছিল না। দীর্ঘদেহের অধিকারী হলেও শারীরিক ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারায় মাঠে গতির ঝড় তুলতে পারেননি।

৬ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার শক্ত মজবুত গড়নের অধিকারী ছিলেন। চশমা পরিধান করে খেলতেন। পর্বতসম দক্ষতা সহকারে ফাস্ট-মিডিয়াম বোলিং কর্মে অগ্রসর হতেন। ওয়াল্টার ব্রিয়ার্লি’র কাছ থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। শুরুতে ফাস্ট বোলিং করলেও পরবর্তীতে মিডিয়াম-ফাস্ট বোলিংয়ে ঝুঁকে পড়েন। দশ গজ দূর থেকে দৌঁড়ে ব্যাটসম্যানকে ব্যতিব্যস্ত করে ফেলতেন। ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ১৯২৯ থেকে ১৯৪৭ সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন অতিবাহিত করেছেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর ইংরেজ কাউন্টি ক্রিকেটে ইয়র্কশায়ারের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ১৯৩১ সালে দেশের অন্যতম সেরা বোলারে পরিণত হন।

১৯৩২ থেকে ১৯৪৬ সময়কালে ইংল্যান্ডের পক্ষে সর্বমোট ১৫ টেস্টে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৩২ সালে নিজ দেশে সি.কে. নায়ড়ু’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের মুখোমুখি হন। ২৫ জুন, ১৯৩২ তারিখে লর্ডসে অনুষ্ঠিত সফররত ভারতের বিপক্ষে সিরিজের একমাত্র টেস্টে তাঁর অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। ৪/৪৯ ও ২/৩০ লাভ করেন। এছাড়াও, একবার ব্যাট হাতে নিয়ে ৭ রান সংগ্রহ করেছিলেন। ঐ টেস্টে স্বাগতিকরা ১৫৮ রানে জয়লাভ করেছিল।

১৯৩২-৩৩ মৌসুমে ডগলাস জার্ডিনের নেতৃত্বাধীন এমসিসি দলের সদস্যরূপে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড সফর করেন। বডিলাইন সিরিজের সাথে যুক্ত রেখে নিজেকে স্মরণীয় করে রাখেন। এ সফরেই বডিলাইন সিরিজে অংশ নেন। চারজন ফাস্ট বোলারের অন্যতম ছিলেন। এ সফরে একটিমাত্র টেস্টে অংশ নেন। ৩০ নভেম্বর, ১৯৩২ তারিখে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত সফররত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অংশ নেন। ডন ব্র্যাডম্যানকে প্রথম বলে শূন্য রানে বিদেয় করেছিলেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ১/৫০ ও ০/২০ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, ৪* ও ০* রান সংগ্রহ করেছিলেন। ১১১ রানে জয় পেয়ে স্বাগতিকরা পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে সমতায় আসে।

বিতর্কিত অ্যাশেজ সিরিজের পর ট্রান্সমান সাগর পাড়ি দিয়ে ১৯৩২-৩৩ মৌসুমে বব ওয়াটের নেতৃত্বাধীন এমসিসি দলের সদস্যরূপে প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ড সফরে যান। ৩১ মার্চ, ১৯৩৩ তারিখে অকল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সিরিজের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। এ টেস্টে সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। কয়েকটি ব্যক্তিগত সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। নিউজিল্যান্ডের প্রথম ইনিংসে কেসি জেমসকে বিদেয় করে ব্যক্তিগত সেরা বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তাঁর পূর্বতন সেরা ছিল ৪/৪৯। এ পর্যায়ে প্রথমবারের মতো টেস্টে পাঁচ-উইকেট লাভ করেন। প্রথম ইনিংসে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং তছনছ করে ফেলেন। খেলায় তিনি ৬/৩৪ ও ০/৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। ‘ওয়ালি হ্যামন্ডের টেস্ট’ নামে পরিচিত খেলাটি ড্রয়ে পরিণত হলে সিরিজটি ফলাফলবিহীন অবস্থায় শেষ হয়।

১৯৩৪ সালে নিজ দেশে বিল উডফুলের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ২২ জুন, ১৯৩৪ তারিখে লন্ডনের লর্ডসে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট খেলেন। খেলায় তিনি দলের একমাত্র ইনিংসে ১০* রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ৩/৯৮ ও ১/২৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। হ্যাডলি ভেরিটি’র স্মরণীয় বোলিং সাফল্যে স্বাগতিকরা ইনিংস ও ৩৮ রানে জয় পেলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে সমতায় ফেরে।

একই সফরের ২০ জুলাই, ১৯৩৪ তারিখে লিডসে অনুষ্ঠিত সিরিজের চতুর্থ টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি একবার ব্যাট হাতে নিয়ে ক্ল্যারি গ্রিমেটের বলে শূন্য রানে বিদেয় নিলেও বল হাতে অপূর্ব খেলেন। ৬/১৪২ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।

এরপর, ১৮ আগস্ট, ১৯৩৪ তারিখে লন্ডনের ওভালে অনুষ্ঠিত সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। ঘটনাবহুল ঐ টেস্টের প্রথম ইনিংসে আঘাতের কারণে ব্যাট হাতে নামতে পারেননি। দ্বিতীয় ইনিংসে ২ রান সংগ্রহ করেছিলেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ৪/১৬৪ ও ৫/৫৫ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। সফরকারীরা ৫৬২ রানের বিশাল ব্যবধানে জয় পেলে ২-১ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়।

১৯৩৫ সালে নিজ দেশে হার্বি ওয়েডের নেতৃত্বাধীন স্প্রিংবকের মুখোমুখি হন। ১৫ জুন, ১৯৩৫ তারিখে নটিংহামে অনুষ্ঠিত সফররত দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ০/৩১ ও ০/২ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তবে, দলের একমাত্র ইনিংসে তাঁকে ব্যাট হাতে নিয়ে মাঠে নামতে হয়নি। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।

একই সফরের ১৩ জুলাই, ১৯৩৫ তারিখে লিডসে অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ২/৬২ ও ২/৩১ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, একবার ব্যাটিংয়ে নেমে শূন্য রানে অপরাজিত অবস্থায় মাঠ ত্যাগ করেছিলেন। খেলাটি ড্রয়ে পরিণত হলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে স্বাগতিকরা ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।

এরপর, ২৭ জুলাই, ১৯৩৫ তারিখে ম্যানচেস্টারে অনুষ্ঠিত সিরিজের চতুর্থ টেস্ট খেলেন। খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে শূন্য রানে অপরাজিত ছিলেন ও একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ৫/১০০ ও ০/৩৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালেও পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে স্বাগতিকরা ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে।

১৯৩৮ সালে নিজ দেশে ডন ব্র্যাডম্যানের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ২২ জুলাই, ১৯৩৮ তারিখে লিডসে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের চতুর্থ টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ৩/৭৯ ও ০/৩৫ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, ব্যাটিংয়ে নেমে ৩ ও ০ রান সংগ্রহ করে উভয় ক্ষেত্রে বিল ও’রিলি’র শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। ৫ উইকেটে জয়লাভ করে সফরকারীরা ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।

এরপর, ২০ আগস্ট, ১৯৩৮ তারিখে লন্ডনের ওভালে অনুষ্ঠিত সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ৫/৪৯ ও ২/২৫ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তবে, দলের খুবই বড়ো একমাত্র ইনিংসে তাঁকে ব্যাট হাতে নামতে হয়। স্বাগতিকরা ইনিংস ও ৫৭৯ রানে জয়লাভ করলে সিরিজটি ১-১ ব্যবধানে শেষ হয়।

১৯৩৯ সালে নিজ দেশে রল্ফ গ্র্যান্টের নেতৃত্বাধীন ক্যারিবীয় দলের মুখোমুখি হন। ২৪ জুন, ১৯৩৯ তারিখে লন্ডনের লর্ডসে অনুষ্ঠিত সফররত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ব্যাট হাতে মাঠে নামার সুযোগ না পেলেও একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। এছাড়াও, ৩/৮৬ ও ১/৪৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। স্বাগতিকরা ৮ উইকেটে জয় পেলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।

এরপর, ২২ জুলাই, ১৯৩৯ তারিখে ম্যানচেস্টারে অনুষ্ঠিত সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট খেলেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ৬/৩৩ ও ১/১৩ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তবে, কোন ইনিংসেই তাঁকে ব্যাটিংয়ে নামতে হয়নি। বৃষ্টিবিঘ্নিত ঐ টেস্ট ড্রয়ে পরিণত হলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে সফরকারীরা ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে।

১৯৪৬ সালে নিজ দেশে ইফতিখার আলী খান পতৌদি’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের মুখোমুখি হন। ২২ জুন, ১৯৪৬ তারিখে লন্ডনের লর্ডসে অনুষ্ঠিত সফররত ভারতের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ২ রান তুলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ১/৬৪ ও ০/৯ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। ১০ উইকেটে জয়লাভ করে স্বাগতিকরা তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়। পরবর্তীকালে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।

সর্বমোট ৩৭২টি প্রথম-শ্রেণীর খেলায় অংশ নিয়ে ১৬.৭৬ গড়ে ১৬৩৯ উইকেট দখল করেন। তন্মধ্যে, অংশগ্রহণকৃত টেস্টগুলোয় ২২.৩৩ গড়ে ৬৮ উইকেট পেয়েছেন। এ পর্যায়ে তিনি ১৫৩০ রান সংগ্রহ করেছিলেন। অর্থাৎ, রান সংখ্যার চেয়ে তাঁর উইকেট সংখ্যা বেশী। ব্যাট হাতে মোটেই সুবিধে করতে পারেননি। এছাড়াও, ফিল্ডিংয়ে বেশ নির্জীবতার পরিচয় দিতেন।

খেলা থেকে অবসর গ্রহণের পর মুদ্রণ শিল্পে কাজ করেন ও দক্ষ লেখক ছিলেন। পরবর্তীকালে ১৯৪৯ সালে ‘এক্সপ্রেস ডেলিভারিজ’ শীর্ষক আত্মজীবনী প্রকাশ করে বেশ আলোচিত হন। সম্ভবতঃ যে-কোন পেশাদার ক্রিকেটারের মধ্যে এটি সর্বাধিক বিক্রিত গ্রন্থের মর্যাদা পায়। নিশ্চিতভাবেই আলবার্ট নাইটসের ‘দ্য কমপ্লিট ক্রিকেটারের’ চেয়ে সেরা ছিল। ৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৭ তারিখে ইয়র্কশায়ারের অটলি এলাকার হাসপাতালে ৭৯ বছর ৪১ দিন বয়সে তাঁর দেহাবসান ঘটে।

সম্পৃক্ত পোস্ট