|

স্টিভ হার্মিসন

২৩ অক্টোবর, ১৯৭৮ তারিখে নর্দাম্বারল্যান্ডের অ্যাশিংটন এলাকায় জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত ক্রিকেটার। মূলতঃ বোলার হিসেবে দলে ভূমিকা রেখেছিলেন। ডানহাতে ফাস্ট-মিডিয়াম বোলিং করতেন। এছাড়াও, নিচেরসারিতে ডানহাতে ব্যাটিংয়ে নামতেন। ২০০০-এর দশকে ইংল্যান্ডের পক্ষে সকল স্তরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।

‘হার্মি’ ডাকনামে ভূষিত স্টিভ হার্মিসন ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার অধিকারী। অ্যাশিংটন হাই স্কুলে অধ্যয়ন করেছেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর ইংরেজ কাউন্টি ক্রিকেটে ডারহামের পক্ষাবলম্বন করেছেন। এছাড়াও, আইসিসি বিশ্ব একাদশ ও লায়ন্সের পক্ষে খেলেছেন। ১৯৯৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন চলমান রেখেছেন। ১৯৯৬ সালে ১৮ বছর বয়সে ডারহামের পক্ষে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেকের দুই বছর পর লিস্ট-এ ক্রিকেটে প্রথম খেলেন। ২০০১-০২ মৌসুমে ইসিবি ন্যাশনাল একাডেমি দলের সদস্যরূপে অস্ট্রেলিয়া গমন করে স্বীয় যোগ্যতা ও সফলতার স্বাক্ষর রাখেন।

২০০২ থেকে ২০০৯ সময়কালে ইংল্যান্ডের পক্ষে সর্বমোট ৬৩ টেস্ট, ৫৮টি ওডিআই ও দুইটিমাত্র টি২০আইয়ে অংশ নিয়েছিলেন। মে, ২০০০ সালে জিম্বাবুয়ে সফরের জন্যে মনোনীত হন। তবে, তাঁকে কোন খেলায় রাখা হয়নি। ২০০২ সালে নিজ দেশে সৌরভ গাঙ্গুলী’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের মুখোমুখি হন। ৮ আগস্ট, ২০০২ তারিখে নটিংহামে অনুষ্ঠিত সফররত ভারতের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অংশ নেন। রব কী’র সাথে তাঁর একযোগে অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। আঘাতপ্রাপ্ত সায়মন জোন্সের পরিবর্তে খেলার সুযোগ পান। ঐ খেলায় পাঁচ উইকেট দখল করেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ৩/৫৭ ও ২/৬৩ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, দলের একমাত্র ইনিংসে ৩ রান সংগ্রহ করেছিলেন। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে চার-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে সফরকারীরা ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে।

১৭ ডিসেম্বর, ২০০২ তারিখে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওডিআইয়ে প্রথমবারের মতো খেলেন। ব্রিসবেনে অনুষ্ঠিত ঐ খেলায় ২/৩৯ পান। কুমার সাঙ্গাকারাকে প্রথম বিদেয় করেন। অস্ট্রেলিয়া সফরে দারুণ খেলার সুবাদে ২০০৩ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় তাঁকে ইংরেজ দলে রাখা হয়। কিন্তু, কোন খেলায় অংশ নেয়ার সুযোগ পাননি।

২০০৩ সালে নিজ দেশে গ্রায়েম স্মিথের নেতৃত্বাধীন স্প্রিংবকের মুখোমুখি হন। ৩১ জুলাই, ২০০৩ তারিখে লন্ডনের লর্ডসে অনুষ্ঠিত সফররত দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট খেলেন। খেলায় তিনি ০ ও ৭ রান সংগ্রহ করে উভয় ইনিংসে মাখায়া এনটিনি’র বলে বিদেয় নিয়েছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ১/১০৩ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। মাখায়া এনটিনি ও গ্রায়েম স্মিথের দূর্দান্ত সাফল্যে স্বাগতিকরা ইনিংস ও ৯২ রানে পরাভূত হলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে।

একই সফরের ৪ সেপ্টেম্বর, ২০০৩ তারিখে ওভালে অনুষ্ঠিত সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্ট খেলেন। খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ৬* রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/৭৩ ও ৪/৩৩ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তবে, মার্কাস ট্রেস্কোথিকের অসাধারণ ব্যাটিংয়ের কল্যাণে স্বাগতিকরা ৯ উইকেটে জয় পেলে সিরিজটি ২-২ ব্যবধানে শেষ করতে সক্ষম হয়।

২০০৩-০৪ মৌসুমে মাইকেল ভনের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ দলের সাথে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ সফরে যান। পুরো সিরিজে অসাধারণত্বের পরিচয় দেন। ১০ এপ্রিল, ২০০৪ তারিখে সেন্ট জোন্সে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের চতুর্থ ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ১/৯২ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ৫ রান সংগ্রহ করেছিলেন। প্রতিপক্ষীয় অধিনায়ক ব্রায়ান লারা’র অপরাজিত চতুর্শতকের কল্যাণে খ্যাতি পাওয়া ঐ টেস্টটি ড্রয়ে পরিণত হলে সফরকারীরা ৩-০ ব্যবধানে সিরিজে জয়লাভ করে। এ সিরিজে ২১ রান সংগ্রহসহ ২৩ উইকেট দখল করে ম্যান অব দ্য সিরিজের পুরস্কার পান।

২০০৪ সালে নিজ দেশে স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের নেতৃত্বাধীন কিউই দলের মুখোমুখি হন। ২০ মে, ২০০৪ তারিখে লন্ডনের লর্ডসে অনুষ্ঠিত সফররত নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ৪/১২৬ ও ৪/৭৬ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। পাশাপাশি, একবার ব্যাটিংয়ে নেমে শূন্য রানে অপরাজিত ছিলেন। এছাড়াও, একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেন। অভিষেকধারী অ্যান্ড্রু স্ট্রসের অনবদ্য ব্যাটিং সাফল্যে সফরকারীরা ৭ উইকেটে পরাভূত হলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে পিছিয়ে পড়ে।

একই বছর নিজ দেশে ব্রায়ান লারা’র নেতৃত্বাধীন ক্যারিবীয় দলের মুখোমুখি হন। ১৯ আগস্ট, ২০০৪ তারিখে লন্ডনের ওভালে অনুষ্ঠিত সফররত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের চতুর্থ ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। দূর্দান্ত ক্রীড়া নৈপুণ্য প্রদর্শনে অগ্রসর হন। খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ৩৬* রান সংগ্রহ করেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ৬/৪৬ ও ৩/৭৫ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তাঁর অনবদ্য অল-রাউন্ড সাফল্যে স্বাগতিকরা ১০ উইকেটে জয় পেলে ৪-০ ব্যবধানে সিরিজে জয়লাভ করে। খেলায় তিনি ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার লাভ করেন।

টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসের সপ্তম খেলোয়াড় হিসেবে ১১ নম্বর ব্যাটসম্যান হিসেবে মাঠে নেমে দলের সংগ্রহ ৩০৪ রানে হলেও তিনি ৪২ রান তুলে শীর্ষ রান সংগ্রাহকে পরিণত হয়েছিলেন। ২০০৪-০৫ মৌসুমের কেপটাউন টেস্টে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা দলের বিপক্ষে এ কৃতিত্বের পরিচয় দেন।

ঐ মৌসুমে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্ট খেলেন। মাইকেল ভনের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ দলের সদস্যরূপে দক্ষিণ আফ্রিকা গমন করেন। ১৭ ডিসেম্বর, ২০০৪ তারিখে জিকিবার্হায় অনুষ্ঠিত স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ১/৮৮ ও ০/৫৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ১৫* রান সংগ্রহ করেন। অ্যান্ড্রু স্ট্রসের অসাধারণ ব্যাটিং নৈপুণ্যে সফরকারীরা ৭ উইকেটে জয়লাভ করলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।

একই সফরের ২ জানুয়ারি, ২০০৫ তারিখে কেপটাউনে অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ০/৮২ ও ১/৫৫ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, ব্যাট হাতে নিয়ে ০ ও ৪২ রান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে, জ্যাক ক্যালিসের অনবদ্য ব্যাটিং দৃঢ়তায় স্বাগতিকরা ১৯৬ রানে জয় পেলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে সমতা আনয়ণে সক্ষমতা দেখায়।

২০০৫ সালে নিজ দেশে হাবিবুল বাশারের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশী দলের মুখোমুখি হন। ৩ জুন, ২০০৫ তারিখে চেস্টার-লি-স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত সফররত বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ৫/৩৮ ও ১/৮৬ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তবে, দলের একমাত্র ইনিংসে ব্যাট হাতে নিয়ে মাঠে নামার সুযোগ পাননি। ম্যাথু হগার্ডের দূর্দান্ত বোলিংয়ের কল্যাণে সফরকারীরা ইনিংস ও ২৭ রানে পরাভূত হলে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়।

একই বছর নিজ দেশে রিকি পন্টিংয়ের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ২১ জুলাই, ২০০৫ তারিখে লর্ডসে শুরু হওয়া অ্যাশেজ সিরিজের প্রথম টেস্টে অপূর্ব খেলেন। প্রথম ইনিংসে ৫/৪৩ লাভ করে লর্ডস অনার্স বোর্ডে নিজেকে ঠাঁই করে নেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ৩/৫৪ পেলেও গ্লেন ম্যাকগ্রা’র বোলিং সাফল্যে ম্লান হয়ে পড়েন। ঐ টেস্টে স্বাগতিক দল ২৩৯ রানে পরাজিত হলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে।

২০০৭ সালে নিজ দেশে রামনরেশ সারওয়ানের নেতৃত্বাধীন ক্যারিবীয় দলের মুখোমুখি হন। ৭ জুন, ২০০৭ তারিখে ম্যানচেস্টারে অনুষ্ঠিত সফররত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ২/৫৩ ও ৪/৯৫ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, ১৮ ও ১৬ রান তুলেছিলেন। তবে, মন্টি পানেসরের অসাধারণ বোলিংয়ের কল্যাণে স্বাগতিকরা ৬০ রানে জয় পেলে চার-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।

২০০৮ সালে নিজ দেশে গ্রায়েম স্মিথের নেতৃত্বাধীন স্প্রিংবকের মুখোমুখি হন। ৭ আগস্ট, ২০০৮ তারিখে ওভালে অনুষ্ঠিত সফররত দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের চতুর্থ ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সফলতার সন্ধান পান। প্রথম ইনিংসে ব্যক্তিগত পূর্বতন সর্বোচ্চ ৪২ রান অতিক্রম করেন। খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ৪৯* রান সংগ্রহ করেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ২/৪৯ ও ২/৮৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। দলীয় অধিনায়কের অসাধারণ শতকের কল্যাণে স্বাগতিকরা ৬ উইকেটে জয়লাভ করলেও ২-১ ব্যবধানে সিরিজে পরাজিত হয়।

২০০৯ সালে নিজ দেশে রিকি পন্টিংয়ের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ২০ আগস্ট, ২০০৯ তারিখে লন্ডনের ওভালে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে টেস্ট খেলেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ০/১৫ ও ৩/৫৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, একবার ব্যাট হাতে নিয়ে ১২* রান সংগ্রহ করেছিলেন। স্টুয়ার্ট ব্রডের অসাধারণ অল-রাউন্ড নৈপুণ্যে স্বাগতিকরা ১৯৭ রান জয়ে পেলে ২-১ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়। পরবর্তীকালে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।

২০০৯ সালে ক্রিকেট খেলা থেকে অবসর গ্রহণের কথা ঘোষণা করেন। এরপর, ২০১৫ থেকে ২০১৭ সময়কালে ইংরেজ ফুটবল ক্লাবের দল অ্যাশিংটনের ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করেন।

শতাব্দীর সেরা বলের তালিকায় তিনি অষ্টাদশ স্থান অধিকার করেন। মাইকেল ক্লার্কের বিপক্ষে ঐ বলটি করেছিলেন। ২০১৭ সালে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘স্পিড ডেমন্স’ প্রকাশ করেন। ১৯৯৮ সালে এনবিসি ডেনিস কম্পটন পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৫ সালে উইজডেন কর্তৃক অন্যতম বর্ষসেরা ক্রিকেটারের সম্মাননাপ্রাপ্ত হন। ৩১ ডিসেম্বর, ২০০৫ তারিখে এমবিই উপাধীতে ভূষিত হন।

সম্পৃক্ত পোস্ট