১৯ মার্চ, ১৯১৫ তারিখে ইয়র্কশায়ারের গবার এলাকায় জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার, লেখক ও প্রশাসক ছিলেন। মূলতঃ ব্যাটসম্যান হিসেবে দলে ভূমিকা রেখে গেছেন। ডানহাতে ব্যাটিং করতেন। এছাড়াও, ডানহাতে মিডিয়াম বোলিংয়ে পারদর্শী ছিলেন। ইংল্যান্ড দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
খুব ছোটবেলা থেকেই তাঁর মাঝে প্রতিশ্রুতিশীলতার স্বাক্ষর দৃশ্যমান ছিল। তবে, পরিবারের মাঝে ক্রিকেটে কোন ঐতিহ্য ছিল না। তবে, ইয়র্কের সেন্ট পিটার্স স্কুলে অধ্যয়নকালীন খুব দ্রুত তাঁর দক্ষতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে সচেষ্ট ছিলেন। পাঁচ বছর প্রথম একাদশের নিয়মিত সদস্য ছিলেন। তন্মধ্যে, শেষ দুই বছর অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৩৩ সালে বিদ্যালয় দলের নেতৃত্বে থাকাকালীন ব্যক্তিগতভাবে অসাধারণ খেলা উপহার দেন। ৮৮.৪৫ গড়ে ৯৭৩ রান তুলেন। তন্মধ্যে, উপর্যুপরী তিন ইনিংসে ১২৭, ১৭১ ও অপরাজিত ১৬৭ রান তুলেছিলেন। এছাড়াও, বোলিং গড়ে শীর্ষস্থান দখল করেন। ১১.৯০ গড়ে ৪০ উইকেট দখল করেন। এ ধরনের সুন্দর ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শনের স্বীকৃতিস্বরূপ লর্ডসে ইয়ং অ্যামেচার্সের সদস্যরূপে ইয়ং প্রফেসনালসের বিপক্ষে খেলার জন্যে মনোনীত হন।
১৯৩৫ থেকে ১৯৫৫ সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন অতিবাহিত করেছিলেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর ইংরেজ কাউন্টি ক্রিকেটে ইয়র্কশায়ারের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়াও, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে খেলেছেন। ১৯৪৬ সালে এমসিসি বনাম কেমব্রিজের মধ্যকার খেলায় ব্যক্তিগত সেরা ৬/২৯ লাভ করেন। ১৯৫১ সালে হেডিংলিতে হ্যাম্পশায়ারের বিপক্ষে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ১৮৩ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেছিলেন।
১৯৩৮ থেকে ১৯৫০ সময়কালে ইংল্যান্ডের পক্ষে সর্বমোট ২০ টেস্টে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৩৮-৩৯ মৌসুমে ওয়ালি হ্যামন্ডের নেতৃত্বাধীন এমসিসি দলের সাথে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যান। ২৪ ডিসেম্বর, ১৯৩৮ তারিখে জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। পল গিব ও লেন উইলকিনসনের সাথে তাঁর একযোগে টেস্ট অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ৭ রান সংগ্রহ করেছিলেন। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬-৪৭ মৌসুমে প্রথম সফর হিসেবে ওয়ালি হ্যামন্ডের সহকারী অধিনায়কের দায়িত্ব নিয়ে অস্ট্রেলিয়া সফরে যান। উপর্যুপরী তিন ইনিংসে ডন ব্র্যাডম্যানকে এলবিডব্লিউ, বোল্ড ও কট এন্ড বোল্ডে ফেরৎ পাঠিয়ে বেশ সুনাম অর্জন করেন। সিডনিতে অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক ২৩৪ রান তুলে বিদেয় করেন। মেলবোর্নে দুইবার করেন। এ টেস্টে তিনি পাঁচ-উইকেট লাভের পাশাপাশি ৬১ ও ৫৩ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেছিলেন। এরফলে, প্রথম ইংরেজ খেলোয়াড় হিসেবে একই টেস্টে জোড়া অর্ধ-শতক ও পাঁচ-উইকেট লাভের কৃতিত্বের অধিকারী হন।
সিরিজের বাদ-বাকী টেস্টগুলোয় আর তেমন উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাননি। তবে, সিডনিতে চূড়ান্ত টেস্টের পূর্বে ওয়ালি হ্যামন্ড শারীরিক অসুস্থতার কবলে পড়লে তিনি ইংল্যান্ড দলের অধিনায়কের মর্যাদাপ্রাপ্ত হন।
১৯৪৬-৪৭ মৌসুমে ওয়ালি হ্যামন্ডের নেতৃত্বাধীন এমসিসি দলের সদস্যরূপে প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ড সফরে যান। ২১ মার্চ, ১৯৪৭ তারিখে ক্রাইস্টচার্চে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের একমাত্র টেস্টে অংশ নেন। বৃষ্টিবিঘ্নিত খেলায় দলের একমাত্র ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে ২২ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, ১/১২ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ায়।
এরপর নিজ দেশে ১৯৪৭ সালে দুইটি সিরিজেও দলের নেতৃত্বে ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানে জয় পেলেও ১৯৪৮ সালে ‘অপরাজেয়’ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪-০ ব্যবধানে পরাজয়বরণ করে তাঁর দল।
১৯৪৭ সালে নিজ দেশে প্রথমবারের মতো টেস্ট খেলেন। ঐ বছর অ্যালান মেলভিলের নেতৃত্বাধীন স্প্রিংবকের মুখোমুখি হন। ৭ জুন, ১৯৪৭ তারিখে নটিংহামের ট্রেন্ট ব্রিজে অনুষ্ঠিত সফররত দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগতভাবে সফল ছিলেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যক্তিগত পূর্বতন সর্বোচ্চ ৬১ রান অতিক্রম করেন। খেলায় তিনি ২২ ও ৯৯ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।
একই সফরের ১৬ আগস্ট, ১৯৪৭ তারিখে লন্ডনের কেনিংটন ওভালে অনুষ্ঠিত সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। অধিনায়কের দায়িত্বে থেকে ব্যক্তিগতভাবে সফল ছিলেন। প্রথম ইনিংসে ১৬ রানে পৌঁছানোকালে টেস্টে ৫০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। খেলায় তিনি ৫৯ ও ১১ রান সংগ্রহ করে উভয় ক্ষেত্রে টাফটি মানের শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। পাশাপাশি, একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/১ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে স্বাগতিকরা পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে জয়লাভ করে।
১৯৪৮ সালে নিজ দেশে অ্যাশেজ সিরিজে অংশ নিতে ডন ব্র্যাডম্যানের নেতৃত্বাধীন ‘অপরাজেয়’ নামধারী অজি দলের মুখোমুখি হন। ২৪ জুন, ১৯৪৮ তারিখে লন্ডনের লর্ডসে অনুষ্ঠিত অ্যাশেজ সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অংশ নেন। অধিনায়কের দায়িত্বে থেকে খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ২/৩৫ ও ২/৩৬ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, ব্যাট হাতে নিয়ে ৪৪ ও ১১ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। সফরকারীরা ৪০৯ রানের বিশাল জয় পেলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
একই সফরের ২২ জুলাই, ১৯৪৮ তারিখে লিডসে অনুষ্ঠিত সিরিজের চতুর্থ টেস্ট খেলেন। অধিনায়কের দায়িত্বে থেকে খেলায় তিনি ২৫ ও ৭ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ২/৩৮ ও ১/৪৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। ৭ উইকেটে জয় পেলে সফরকারীরা পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
এরপর, ১৪ আগস্ট, ১৯৪৮ তারিখে লন্ডনের ওভালে অনুষ্ঠিত সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। অধিনায়কের দায়িত্বে থেকে খেলায় তিনি ৭ ও ৯ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, ০/৭ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। স্বাগতিকরা ইনিংস ও ১৪৯ রানে পরাজয়বরণ করলে ৪-০ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়।
১৯৫০ সালে নিজ দেশে জন গডার্ডের নেতৃত্বাধীন ক্যারিবীয় দলের মুখোমুখি হন। ৮ জুন, ১৯৫০ তারিখে ম্যানচেস্টারে অনুষ্ঠিত সফররত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। অধিনায়কের দায়িত্বে থেকে খেলায় তিনি ০ ও ২৫ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। আল্ফ ভ্যালেন্টাইনের অসাধারণ বোলিংশৈলী প্রদর্শন সত্ত্বেও ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার কারণে সফরকারীরা ২০২ রানে পরাভূত হলে চার-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে পিছিয়ে পড়ে।
একই সফরের ২০ জুলাই, ১৯৫০ তারিখে নটিংহামে অনুষ্ঠিত সফররত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় টেস্টে অংশ নেন। অধিনায়কের দায়িত্বে থেকে খেলায় তিনি ৩১ ও ৭ রান সংগ্রহসহ দুইটি ক্যাচ তালুবন্দীকরণে অগ্রসর হয়েছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ১/৮২ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। ১০ উইকেটে পরাজিত হলে স্বাগতিকরা চার-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-১ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।
সবগুলো প্রথম-শ্রেণীর খেলায় অংশ নিয়ে ২৭ শতক সহযোগে ৩১.১৭ গড়ে ১৮১৭৩ রান তুলেছেন। এছাড়াও, ৩০.৪৯ গড়ে ২৭৯ উইকেট দখল করেছিলেন।
১৯৪৮ সালে উইজডেন কর্তৃক অন্যতম বর্ষসেরা ক্রিকেটারের সম্মাননায় ভূষিত হন। ১৯৫০ সালে ‘ক্রিকেট ক্যাম্পেইন্স’ শিরোনামের আত্মজীবনী প্রকাশ করেন। এছাড়াও, ১৯৫২ সালে জে. এম. কিলবার্নের সাথে ‘হোমস অব স্পোর্ট: ক্রিকেট ইন ১৯৫২’ যৌথভাবে রচনা করেন। ৩ অক্টোবর, ১৯৮৯ তারিখে ইয়র্কশায়ারের লজ মুর এলাকায় ৭৪ বছর ১৯৮ দিন বয়সে তাঁর দেহাবসান ঘটে।
