|

আল্ফ ভ্যালেন্টাইন

২৮ এপ্রিল, ১৯৩০ তারিখে জ্যামাইকার কিংস্টনে জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত ক্রিকেটার ছিলেন। মূলতঃ বোলার হিসেবে দলে ভূমিকা রেখে গেছেন। স্লো লেফট-আর্ম অর্থোডক্স বোলিং করতেন। এছাড়াও, ডানহাতে নিচেরসারিতে ব্যাটিংয়ে নামতেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।

শীর্ণকায় গড়নের অধিকারী ছিলেন ও চশমা পরিধান করতেন। দৃষ্টিশক্তি বেশ দূর্বলতর ছিল ও মুখশ্রী আকর্ষণীয় ছিল না। দৃশ্যতঃ ক্রীড়াবিদ হিসেবে তাঁকে চিত্রিত করা যায়নি। ১৭ বছরের পূর্ব-পর্যন্ত কোন পেশাদার কোচের দ্বারস্থ হননি। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় প্রত্যয়ী মনোভাবের কারণে শত বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে রহস্যময় স্পিনার সনি রামাদিনের সাথে সফলতম জুটি গড়েছিলেন। পরবর্তীতে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের খ্যাতনামা স্পিনারদ্বয়ের অন্যতম হিসেবে পরিগণিত হন। এক পর্যায়ে তাঁর ক্রিকেট বিশ্বে তুমুল ঝড় তুলেছিলেন। অসম্ভব দম ও দীর্ঘ সময় ধরে বোলিং করতে পারতেন। তাঁর বোলিংয়ের ধরন অনেকাংশেই চাতুর্য্যতাবিহীন ছিল। বিরাটভাবে বলকে বাঁক খাওয়াতে পারতেন।

ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেটে জ্যামাইকার প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ১৯৪৯-৫০ মৌসুম থেকে ১৯৬৪-৬৫ মৌসুম পর্যন্ত সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন অতিবাহিত করেছেন। মাত্র দুইটি প্রথম-শ্রেণীর খেলায় অংশ নেয়ার পরপরই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের সদস্যরূপে অন্তর্ভুক্ত হন। এ পর্যায়ে খেলাগুলো থেকে ৯৫ গড়ে মাত্র দুই উইকেট পেয়েছিলেন।

১৯৫০ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত সময়কালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পক্ষে সর্বমোট ৩৬ টেস্টে অংশ নিয়েছিলেন। বেশ মিতব্যয়ী বোলিং করেছেন। ওভারপ্রতি ১.৯৫ গড়ে রান খরচ করেন। ১৯৫০ সালে জন গডার্ডের নেতৃত্বাধীন ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের সদস্যরূপে ইংল্যান্ড গমন করেন। এ সফরে টেস্টগুলো থেকে সনি রামাদিনকে সাথে নিয়ে ৫৯ উইকেট ভাগাভাগি করে নেন। ফলশ্রুতিতে, ইংল্যান্ডের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল ৩-১ ব্যবধানে ঐতিহাসিক সিরিজ জয় করে।

৮ জুন, ১৯৫০ তারিখে ম্যানচেস্টারে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। সনি রামাদিনের সাথে তাঁর একযোগে টেস্ট অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। বিস্ময়করভাবে প্রথম ইনিংসে ৮/১০৪ পান। এরফলে, প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে এক ইনিংসে আট উইকেট লাভের কৃতিত্বের অধিকারী হন। লর্ডসে অনুষ্ঠিত খেলায় ১১৬-৭৫-১২৭-৭ লাভ করেন। ফলশ্রুতিতে, এক টেস্টে সর্বাধিকসংখ্যক মেইডেন ওভার লাভের রেকর্ড গড়েন। এছাড়াও, দ্বিতীয় ইনিংসে ৩/১০০ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তবে, শেষদিকে ব্যাটিংয়ে নেমে মোটেই সুবিধে করতে পারেননি। উভয় ইনিংসেই তাঁকে শূন্য রানে বিদেয় নিতে হয়েছিল। ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার কারণে তাঁর দল ২০২ রানে পরাভূত হলে চার-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে পিছিয়ে পড়ে।

১৯৫০-৫১ মৌসুমে জন গডার্ডের নেতৃত্বাধীন ক্যারিবীয় দলের সাথে অস্ট্রেলিয়া সফরে যান। প্রকৃত মানসম্পন্ন উইকেট থেকেও ক্রমাগত সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। ২৮.৭৯ গড়ে ২৪ উইকেটের সন্ধান পেয়েছিলেন। ৯ নভেম্বর, ১৯৫১ তারিখে ব্রিসবেনে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ৫/৯৯ ও ১/১১৭ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, ২ ও ১৩ রান সংগ্রহ করে উভয় ইনিংসে ডগ রিংয়ের শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। স্বাগতিকরা ৩ উইকেটে জয়লাভ করে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।

দেশে ফেরার পথে নিউজিল্যান্ড সফরে ও নিজ দেশে সফররত ভারতের বিপক্ষেও এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন। প্রথম ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান হিসেবে টেস্টে শততম উইকেট লাভের মাইলফলক স্পর্শ করেন। নিজস্ব ১৯তম টেস্টে জিম লেকারকে বোল্ড করে এ কৃতিত্বের অধিকারী হন। এ পর্যায়ে তিনি মাত্র তিন বছর আট মাস খেলেছিলেন।

১৯৫২-৫৩ মৌসুমে নিজ দেশে বিজয় হাজারে’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের মুখোমুখি হন। ২৮ মার্চ, ১৯৫৩ তারিখে কিংস্টনের সাবিনা পার্কে অনুষ্ঠিত সফররত ভারতের বিপক্ষে সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ৫/৬৪ ও ৪/১৪৯ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, একবার ব্যাট হাতে নিয়ে ৪* রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে সফরকারীরা ১-০ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়।

১৯৫৩-৫৪ মৌসুমে নিজ দেশে লেন হাটনের নেতৃত্বাধীন এমসিসি দলের মুখোমুখি হন। ১৫ জানুয়ারি, ১৯৫৪ তারিখে কিংস্টনের সাবিনা পার্কে অনুষ্ঠিত সফররত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ফ্রেড ট্রুম্যানের বলে শূন্য রানে বিদেয় নিয়েছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ৩/৫০ ও ০/৭১ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। ১৪০ রানে জয় পেলে সফরকারীরা পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে পিছিয়ে পড়ে।

এরপর, ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৪ তারিখে ব্রিজটাউনে অনুষ্ঠিত সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ৩/৬১ ও ০/৮৭ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, একবার ব্যাটিংয়ে নেমে শূন্য রানে অপরাজিত ছিলেন। তবে, ক্লাইড ওয়ালকটের মনোরম দ্বি-শতকের কল্যাণে স্বাগতিকরা ১৮১ রানে জয়লাভ করলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।

১৯৫৫-৫৬ মৌসুমে ডেনিস অ্যাটকিনসনের নেতৃত্বাধীন ক্যারিবীয় দলের অন্যতম সদস্যরূপে নিউজিল্যান্ড গমন করেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৬ তারিখে ক্রাইস্টচার্চে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি বল হাতে ২/৪৮ ও ৫/৩২ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, দলের একমাত্র ইনিংসে ব্যাট হাতে নিয়ে ১ রান সংগ্রহ করেছিলেন। সফরকারীরা ইনিংস ও ৬৪ রানে জয়লাভ করলে চার-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।

১৯৬১-৬২ মৌসুমে নিজ দেশে মনসুর আলী খান পতৌদি’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের মুখোমুখি হন। একই সফরের ১৩ এপ্রিল, ১৯৬২ তারিখে কিংস্টনে অনুষ্ঠিত সফররত ভারতের বিপক্ষে সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ১/৩২ ও ০/২৮ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, ব্যাট হাতে নিয়ে ৭* ও ৭ রান সংগ্রহ করেছিলেন। ১২৩ রানে জয় পেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল ৫-০ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়। পরবর্তীকালে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।

ক্রমাগত অতিরিক্ত বোলিংয়ের কারণে তাঁর দূর্বলতা ব্যাটসম্যানদের নজর কাড়ে। তাসত্ত্বেও শেষ ২০ টেস্ট থেকে ৪৬ উইকেট তুলে নিয়েছিলেন। ল্যান্স গিবসগ্যারি সোবার্সের আবির্ভাবে এক পর্যায়ে তাঁর পর্দার অন্তরালে চলে যেতে হয়।

১৯৫১ সালে উইজডেন কর্তৃক অন্যতম বর্ষসেরা ক্রিকেটারের সম্মাননাপ্রাপ্ত হন। এ অর্জনকে স্মরণীয় করে রাখতে জ্যামাইকায় একদিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। এমসিসি’র আজীবন সদস্যের মর্যাদা পান ও অর্ডার অব ডিস্টিংক্টশন লাভ করেন। ক্রিকেটে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জ্যামাইকা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন ২ জুলাই, ২০১৩ তারিখে কোলি স্মিথসহ তাঁকে সম্মানিত করে। সাবিনা পার্কের পূর্বাংশ আলফ্রেড ভ্যালেন্টাইন উইং ও পশ্চিমাংশ কোলি স্মিথ উইং হিসেবে নামাঙ্কিত করা হয়।

৩৫ বছর বয়সে এসে ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণের পর জ্যামাইকার কোচের দায়িত্ব পালন করেন। কয়েক মৌসুম বার্মিংহাম লীগ ক্রিকেটে যুক্ত থাকার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতে থাকেন। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত। ১৯৭৮ সালে জ্যাকি নাম্নী এক রমণীর পাণিগ্রহণ করেন ও তিনি ফ্লোরিডা স্টেটের সানল্যান্ড সেন্টারের নার্স হিসেবে কাজ করছেন। এরপূর্বে গিন্ডোলিন নাম্নী প্রথম পত্নী ছিল। এ দম্পতির চার কন্যা রয়েছে। সিডনিতে পরিচর্য্যা কেন্দ্র পরিদর্শনের পর তাঁরা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কল্যাণার্থে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন। ১১ মে, ২০০৪ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেটোনা বীচ এলাকায় অবস্থিত নিজ গৃহে ৭৪ বছর ১৩ দিন বয়সে তাঁর দেহাবসান ঘটে।

সম্পৃক্ত পোস্ট