এমজেকে স্মিথ

৩০ জুন, ১৯৩৩ তারিখে লিচেস্টারের ওয়েস্টকোটস এলাকায় জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত ক্রিকেটার, প্রশাসক ও রেফারি ছিলেন। মূলতঃ শীর্ষসারির ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলতেন। ডানহাতে ব্যাটিং কর্মে মনোনিবেশ ঘটাতেন। এছাড়াও, শর্ট-লেগ অঞ্চলে ফিল্ডিং করতেন। ইংল্যান্ড দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

স্ট্যামফোর্ড স্কুলে অধ্যয়ন শেষে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল বিষয়ে পড়াশুনো করেছেন। অ্যাথলেট হিসেবে অক্সফোর্ডে সুনাম কুড়ালেও তেমন স্বীকৃতি পাননি। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬ সময়কালে কেমব্রিজের বিপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলায় তিনবার অংশ নিয়ে শতরানের ইনিংস খেলেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে ক্রিকেট ও রাগবি দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। শেষবর্ষে থাকাকালে ওয়েলসের বিপক্ষে আউটসাইড সেন্টার অবস্থানে একমাত্র আন্তর্জাতিক রাগবি খেলায় অংশ নেন। খেলায় সাধারণমানের ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শন করেছিলেন। আর তাঁকে জাতীয় দলে রাখা হয়নি। ইংল্যান্ডের পক্ষে খেলা সর্বশেষ দ্বৈত আন্তর্জাতিকে অংশ নিয়েছিলেন।

ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর ইংরেজ কাউন্টি ক্রিকেটে লিচেস্টারশায়ার ও ওয়ারউইকশায়ারের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়াও, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে খেলেছেন। বৈশ্বিকভাবে ‘এমজেকে’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। ওয়ারউইকশায়ারের সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন। নিজের সময়কালে সোজা-সাপ্টা গড়নের নিঃস্বার্থ অধিনায়ক ছিলেন। ১৯৫১ থেকে ১৯৭৫ সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন অতিবাহিত করেছেন।

১৯৫৮ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের পক্ষে ৫০ টেস্টে অংশগ্রহণ করেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পূর্বে সর্বশেষ অধিনায়ক হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তাঁর দল সিরিজ জয় করেছিল। ১৯৫৮ সালে নিজ দেশে জন রিডের নেতৃত্বাধীন কিউই দলের মুখোমুখি হন। ৫ জুন, ১৯৫৮ তারিখে বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত সফররত নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে তাঁর অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। খেলায় তিনি ০ ও ৭ রান তুলে উভয় ক্ষেত্রে টনি ম্যাকগিবনের শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। এছাড়াও, একটি ক্যাচ তালুবন্দীকরণে অগ্রসর হন। সফরকারীরা ২০৫ রানে পরাজিত হলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে পিছিয়ে পড়ে।

১৯৬১-৬২ মৌসুমে টেড ডেক্সটারের নেতৃত্বাধীন এমসিসি দলের সাথে ভারত গমন করেন। ১ ডিসেম্বর, ১৯৬১ তারিখে কানপুরে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি উভয় ইনিংসে সুভাষ গুপ্তে’র বলে শূন্য রানে বিদেয় নিয়েছিলেন। তবে, খেলাটি ড্রয়ে পরিণত হলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।

১৯৬৪-৬৫ মৌসুমে এমসিসি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যান। ২২ জানুয়ারি, ১৯৬৫ তারিখে জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের চতুর্থ টেস্টে অংশ নেন। অধিনায়কের দায়িত্বে থেকে খেলায় তিনি ৪২ ও ৮ রান সংগ্রহ করেছিলেন। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে সফরকারীরা ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।

১৯৬৫ সালে নিজ দেশে পিটার ফন ডার মারউই’র নেতৃত্বাধীন স্প্রিংবকের মুখোমুখি হন। ৫ আগস্ট, ১৯৬৫ তারিখে নটিংহামে অনুষ্ঠিত সফররত দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট খেলেন। অধিনায়কের দায়িত্বে থেকে খেলায় তিনি ব্যাট হাতে নিয়ে ৩২ ও ২৪ রান সংগ্রহ করেছিলেন। খেলায় তাঁর দল ৯৪ রানে পরাজিত হলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে।

এরপর, ২৬ আগস্ট, ১৯৬৫ তারিখে লন্ডনের ওভালে অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় ও চূড়ান্ত টেস্ট খেলেন। খেলায় তিনি অধিনায়কের দায়িত্বে থেকে ব্যাটিংয়ে নেমে ৭ ও ১০* রান সংগ্রহসহ দুইটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। খেলাটি ড্রয়ে পরিণত হলে স্বাগতিকরা ১-০ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়।

ইংল্যান্ড দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন ও ২৫ টেস্টে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে পর্যাপ্ত সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। ইংল্যান্ডের অন্যতম জনপ্রিয় ও সম্মানীয় অধিনায়কের মর্যাদা পেয়েছেন। ১৯৬৫-৬৬ মৌসুমে এমসিসি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে অস্ট্রেলিয়া গমন করেন। ৭ জানুয়ারি, ১৯৬৬ তারিখে সিডনিতে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় টেস্ট খেলেন। অধিনায়কের দায়িত্বে থেকে খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ৬ রান সংগ্রহসহ তিনটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। সফরকারীরা ইনিংস ও ৯৩ রানে জয় পেলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।

একই সফরের ১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৬ তারিখে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্ট খেলেন। অধিনায়কের দায়িত্বে থেকে খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ডগ ওয়াল্টার্সের বলে শূন্য রানে বিদেয় নিয়েছিলেন। ‘বব কাউপারের টেস্ট’ নামে পরিচিত খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে সিরিজটি ১-১ ব্যবধানে শেষ হয়।

একই মৌসুমে প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ড সফরে যান। ইংরেজ দলকে নেতৃত্ব দিয়ে ২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৬ তারিখে ক্রাইস্টচার্চে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সফলতার সন্ধান পান। অধিনায়কের দায়িত্বে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ২৮ রানে পৌঁছানোকালে টেস্টে ২০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। খেলায় তিনি ৫৪ ও ৮৭ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, তিনটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। খেলাটি ড্রয়ে পরিণত হলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।

এরপর, ৪ মার্চ, ১৯৬৬ তারিখে ডুনেডিনে অনুষ্ঠিত সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট খেলেন। অধিনায়কের দায়িত্বে থেকে ব্যাট হাতে নিয়ে ২০ রান সংগ্রহসহ দুইটি ক্যাচ তালুবন্দী করেন। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে ফলাফলবিহীন অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।

১৯৬৬ সালে নিজ দেশে গ্যারি সোবার্সের নেতৃত্বাধীন ক্যারিবীয় দলের মুখোমুখি হন। ২ জুন, ১৯৬৬ তারিখে ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ডে অনুষ্ঠিত সফররত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। অধিনায়কের দায়িত্বে থেকে খেলায় তিনি ৫ ও ৬ রান সংগ্রহ করে উভয় ইনিংসে ল্যান্স গিবসের শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। এছাড়াও, দুইটি ক্যাচ তালুবন্দীকরণে অগ্রসর হন। সফরকারীরা ইনিংস ও ৪০ রানে জয় পেলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।

১৯৭২ সালে নিজ দেশে ইয়ান চ্যাপেলের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ১৩ জুলাই, ১৯৭২ তারিখে নটিংহামে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় টেস্ট খেলেন। খেলায় তিনি ১৭ ও ১৫ রান সংগ্রহ করে উভয় ইনিংসে ডেনিস লিলি’র শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। খেলাটি ড্রয়ে পরিণত হলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি ১-১ ব্যবধানে অগ্রসর হতে থাকে। পরবর্তীকালে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।

ক্রিকেটের পাশাপাশি রাগবি খেলায় সিদ্ধহস্তের অধিকারী ছিলেন। ইংল্যান্ডের পক্ষে উভয় খেলায় অংশ নিয়েছেন। ১৯৬০ সালে উইজডেন কর্তৃক অন্যতম বর্ষসেরা ক্রিকেটারের সম্মাননাপ্রাপ্ত হন। ১৯৬৫ সালে সাউথ আফ্রিকান ক্রিকেট অ্যানুয়েল কর্তৃক বর্ষসেরা ক্রিকেটার হিসেবে মনোনীত হন। ১৯৭৬ সালে ক্রিকেটে অনবদ্য ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ওবিই পদবীতে ভূষিত হন।

অবসর গ্রহণের পর প্রশাসনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ১৯৯১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ওয়ারউইকশায়ারের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত আইসিসি ম্যাচ রেফারির দায়িত্বে ছিলেন। ৪টি টেস্ট ও ১৭টি ওডিআই পরিচালনা করেছেন। ক্রিকেট খেলা থেকে অবসর নেয়ার পর রেফারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত ছিলেন। নীল স্মিথ নামীয় পুত্র ইংল্যান্ডের পক্ষে একদিনের খেলায় অংশ নিয়েছে ও ওয়ারউইকশায়ারের অধিনায়কত্ব করেছে। কন্যা ক্যারলকে ইংরেজ মাঝারিপাল্লার দৌঁড়বিদ ও সংসদ সদস্য সেবাস্টিয়ান কো’র সাথে বিয়ে দেন। সামুদ্রিক ভ্রমণ করতে বেশ ভালোবাসেন। ৯২ বছর ৩২২ দিন বয়সে ১৮ মে, ২০২৬ তারিখে তাঁর দেহাবসান ঘটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *