২ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৮ তারিখে দিল্লিতে জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার। মূলতঃ বোলার হিসেবে দলে ভূমিকা রেখেছিলেন। ডানহাতে ফাস্ট-মিডিয়াম বোলিং করতেন। এছাড়াও, ডানহাতে ব্যাটিংয়ে নামতেন। ভারতের পক্ষে সকল স্তরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।
বিজয় শর্মা ও গ্রীশা শর্মা দম্পতির সন্তান ছিলেন। ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি (১.৯৩ মিটার) উচ্চতা ও লিকলিকে গড়নের কারণে দলীয় সঙ্গীদের কাছ থেকে ‘লম্বু’ ডাকনামে পরিচিতি পান। চৌদ্দ বছর বয়সে পিচের সাথে একাত্মতা পোষণের মাধ্যমে ভদ্রলোকের খেলা নামে পরিচিত ক্রিকেটের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলেন। ভারতীয় ক্রিকেট দলের অনেকের ন্যায় তিনিও রঞ্জী ট্রফি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে খেলোয়াড়ী জীবনের সূত্রপাত ঘটান। ১৮ বছর বয়সে দিল্লি দলের পক্ষে প্রথমবারের মতো অংশ নেন।
২০০৬-০৭ মৌসুম থেকে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন চলমান রাখছেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর ভারতীয় ক্রিকেটে দিল্লি, উত্তরাঞ্চল এবং ইংরেজ কাউন্টি ক্রিকেটে সাসেক্সের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়াও, ডেকান চার্জার্স, দিল্লি ক্যাপিটালস, কিংস ইলাভেন পাঞ্জাব, কলকাতা নাইট রাইডার্স, অয়েল এন্ড ন্যাচারেল গ্যাস কর্পোরেশন, রাইজিং পুনে সুপারজায়ান্টস ও সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের পক্ষে খেলেছেন। ২৩ নভেম্বর, ২০০৬ তারিখে দিল্লিতে তামিলনাড়ু বনাম দিল্লির মধ্যকার খেলায় অংশ নেয়ার মাধ্যমে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবনের সূত্রপাত ঘটান।
২০০৭ সাল থেকে ভারতের পক্ষে টেস্ট, ওডিআই ও টি২০আইয়ে অংশ নিচ্ছেন। ২০০৭ সালে রাহুল দ্রাবিড়ের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের সদস্যরূপে বাংলাদেশ সফরে যান। মুনাফ প্যাটেলের আঘাতের কারণে ২৫ মে, ২০০৭ তারিখে মিরপুরে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে তাঁর অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। ১/১৯ ও ০/৩০ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তবে, দলের একমাত্র ইনিংসে ব্যাটিং করার সুযোগ পাননি। জহির খানের অসামান্য বোলিংশৈলীর কল্যাণে খেলায় সফরকারীরা ইনিংস ও ২৩৯ রানে জয় পায় ও ১-০ ব্যবধানে সিরিজ জয় করে।
এছাড়াও, পাকিস্তানের বিপক্ষে একটি টেস্টে ৫/১৪০ নিয়ে স্বীয় প্রতিভা বিকাশে সোচ্চার হন। ২০০৭ সালের শেষদিকে অংশগ্রহণকৃত ঐ টেস্টটি তাঁর খেলোয়াড়ী জীবনের দ্বিতীয় ছিল।
২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে অংশ নিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে তাঁর আবির্ভাবের কথা তুলে ধরেন। বিশেষতঃ অজি অধিনায়ক ও বিখ্যাত ক্রিকেটার রিকি পন্টিংয়ের বিপক্ষে তাঁর ভূমিকা ছিল দুর্নিবার। একই সফরে অ্যাডিলেড ওভালে দ্রুততম বোলিং করেন। প্রথম ভারতীয় বোলার হিসেবে ১৫০-এর গণ্ডি অতিবাহিত করেন। এ পর্যায়ে তিনি ঘণ্টায় ১৫২.৬ কিলোমিটার গতিবেগে বোলিং করেছিলেন। পরবর্তীতে অবশ্য এই মাঠে জসপ্রীত বুমরা ঘণ্টায় ১৫৩.০ কিলোমিটার গতিবেগে বোলিং করে রেকর্ডটি নিজের করে নেন।
এরপর, সিবি সিরিজ থেকে ১৪ উইকেট লাভ করেন ও সিরিজে সর্বাধিক উইকেট সংগ্রাহকে পরিণত হন। তাঁর দূর্দান্ত ক্রীড়াশৈলীর কারণে ইন্ডিয়ান টি২০ লীগের উদ্বোধনী আসরে কলকাতার দৃষ্টি গোচরীভূত হয় ও তাঁকে ঐ লীগের অন্যতম সর্বোচ্চ দামী খেলোয়াড়ে পরিণত করে।
২০০৮-০৯ মৌসুমে নিজ দেশে রিকি পন্টিংয়ের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। পুরো সিরিজে অসাধারণত্বের পরিচয় দেন। ৬ নভেম্বর, ২০০৮ তারিখে নাগপুরে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের চতুর্থ ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের বিদায়ী টেস্টে ৩৩ ও ৪১ রান তুলেছিলেন। জেসন ক্রেজা’র অনবদ্য বোলিং সত্ত্বেও স্বাগতিক দল ১৭২ রানে জয় পায় ও ২-০ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়। ১৫ উইকেট লাভ করে ম্যান অব দ্য সিরিজের পুরস্কার লাভ করেন।
একই মৌসুমে এমএস ধোনি’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের সদস্যরূপে প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ড গমন করেন। ৮ মার্চ, ২০০৯ তারিখে হ্যামিল্টনে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ৪/৭৩ ও ০/৬২ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, একবার ব্যাট হাতে নিয়ে ৬ রান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে, শচীন তেন্ডুলকরের অসামান্য ব্যাটিং দৃঢ়তায় সফরকারীরা ১০ উইকেটে জয়লাভ করলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।
২০০৮-০৯ মৌসুমে নিজ দেশে রিকি পন্টিংয়ের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ২০০৮ সালের শেষদিকে অস্ট্রেলিয়া দল ভারত সফরে আসলে জহির খানকে সাথে নিয়ে সফরকারীদেরকে নাস্তানুবাদ করে ছাড়েন। এ পর্যায়ে রিভার্স-সুইংয়েও পারঙ্গমতা প্রকাশ করেছিলেন। ঐ সিরিজে ১৫ উইকেট দখল করে ম্যান অব দ্য সিরিজের পুরস্কার লাভ করেন। স্বাগতিক দল চার-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে।
২০০৯ সালে তাঁর খেলার মান পড়তির দিকে যেতে থাকে ও পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসও হারিয়ে ফেলেন। পূর্বেকার বছরের ন্যায় ইন্ডিয়ান টি২০ লীগে সাড়া জাগাতে পারেননি। ব্যাটসম্যানদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন ও কলকাতা দ্বিতীয় মৌসুমে সর্বশেষ স্থানে অবস্থান করে। ফলশ্রুতিতে, ২০০৯ সালের আইসিসি টি২০ বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায়ও তাঁকে ভারত দলে রাখা হয়নি।
২০১১ সালে এমএস ধোনি’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের সদস্যরূপে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ সফরে যান। এ সিরিজে দূর্দান্ত ক্রীড়াশৈলীর স্বাক্ষর রাখেন। ২৮ জুন, ২০১১ তারিখে ব্রিজটাউনে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অংশ নেন। ৬/৫৫ ও ৪/৫৩ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তাঁর অনবদ্য বোলিংয়ের কল্যাণে খেলাটি ড্রয়ের দিকে চলে যায়। খেলায় তিনি ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার লাভ করেন।
এরপর, ৬ জুলাই, ২০১১ তারিখে সিরিজের তৃতীয় টেস্টে অংশ নেন। ৫/৭৭ ও ১/৭৬ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তবে, এ খেলাটিও ড্রয়ের দিকে গড়ায় ও তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে সফরকারীরা ১-০ ব্যবধানে জয়লাভ করেছিল। সিরিজে ২২ উইকেট লাভ করে তিনি প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ পুরস্কার লাভ করেন।
২০১২ সালে গোড়ালীর অস্ত্রোপচার করা হলে কয়েক মাস কোন ধরনের খেলায় অংশ নিতে পারেননি। দল নির্বাচকমণ্ডলী তাঁকে টেস্ট দলে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেও ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া সফরসহ ভারত সফরে আসা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আট টেস্ট থেকে মাত্র ১৬ উইকেটের সন্ধান পেয়েছিলেন।
২০১৩ সালে পুণরায় নিজেকে মেলে ধরতে সচেষ্ট হন। ২০১৩ সালের আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি থেকে ১০ উইকেট লাভ করেন। তন্মধ্যে, স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চূড়ান্ত খেলায় অংশ নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট পান। ওডিআইয়ের উত্থান-পতনে ঘেরা খেলোয়াড়ী জীবনে সম্ভবতঃ এটিই তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। এছাড়াও, ২০১৪ সালের এশিয়া কাপে তাঁকে দলের বাইরে রাখা হয়।
২০১৩-১৪ মৌসুমে এমএস ধোনি’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের সদস্যরূপে নিউজিল্যান্ড গমন করেন। ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ তারিখে ওয়েলিংটনে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের সন্ধান পান। নিউজিল্যান্ডের প্রথম ইনিংসে ব্যক্তিগত সেরা বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তাঁর পূর্বেকার সেরা ছিল ৬/৫৫। খেলায় তিনি ৬/৫১ ও ০/১৬৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, একবার ব্যাট হাতে নিয়ে ২৬ রান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে, প্রতিপক্ষীয় অধিনায়ক ব্রেন্ডন ম্যাককালামের অসাধারণ ত্রি-শতক স্বত্ত্বেও খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে সফরকারীরা ১-০ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়।
২০১৫ সালে বিরাট কোহলি’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের সদস্যরূপে শ্রীলঙ্কা গমন করেন। ২৮ আগস্ট, ২০১৫ তারিখে কলম্বোয় অনুষ্ঠিত স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। ৬ ও ২* রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, ৫/৫৪ ও ৩/৩২ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তবে, চেতেশ্বর পুজারা’র অসাধারণ শতকের কল্যাণে সফরকারীরা ১১৭ রানে জয় পেলে ২-১ ব্যবধানে সিরিজে জয়লাভ করে।
২০১৮ সালে বিরাট কোহলি’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের সদস্যরূপে ইংল্যান্ড গমন করেন। ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ তারিখে লন্ডনের ওভালে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্ট খেলেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ৩/৬২ ও ০/১৩ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। ৪ ও ৫ রান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে, অ্যালাস্টার কুকের অসাধারণ ব্যাটিং দাপটে ১১৮ রানে জয়লাভ করলে স্বাগতিকরা ৪-১ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়।
২০১৮-১৯ মৌসুমে বিরাট কোহলি’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের সদস্যরূপে অস্ট্রেলিয়া গমন করেন। ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ তারিখে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি কোন ইনিংসে ব্যাটিং করার সুযোগ না পেলেও একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ১/৪১ ও ২/৪০ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তবে, জসপ্রীত বুমরা’র অসাধারণ বোলিংশৈলীর কল্যাণে সফরকারীরা ১৩৭ রানে জয় তুলে নেয় ও চার-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
২০২১-২২ মৌসুমে নিজ দেশে কেন উইলিয়ামসনের নেতৃত্বাধীন কিউই দলের মুখোমুখি হন। ২৫ নভেম্বর, ২০২১ তারিখে কানপুরে অনুষ্ঠিত সফররত নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে অংশ নেন। ০/৩৫ ও ০/২০ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, একবার ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেয়ে শূন্য রানে বিদেয় নিয়েছিলেন। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ায় ও দুই-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে। পরবর্তীকালে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।
ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত ছিলেন। প্রতিমা সিং নাম্নী ভারতীয় বাস্কেটবল মহিলা তারকার পাণিগ্রহণ করেন। ২০২০ সালে অর্জুনা পদক লাভ করেন।
