৯ আগস্ট, ১৯৮৩ তারিখে হারারেতে জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার ও প্রশাসক। মূলতঃ শীর্ষসারির ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলেছেন। ডানহাতে ব্যাটিং করতেন। পাশাপাশি, ডানহাতে মিডিয়াম বোলিংয়ে পারদর্শী ছিলেন। জিম্বাবুয়ের পক্ষে সকল স্তরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন। এছাড়াও, দলের অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলেন।
১৯৯৯-২০০০ মৌসুম থেকে ২০১৮-১৯ মৌসুম পর্যন্ত সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন চলমান রাখেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর জিম্বাবুয়ীয় ক্রিকেটে ইস্টার্নস, মনিকাল্যান্ড, ম্যাশোনাল্যান্ড ও মাউন্টেনিয়ার্সের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়াও, কলাবাগান ক্রিকেট একাডেমি ও সিলেট রয়্যালসের পক্ষে খেলেছেন।
২০০১ থেকে ২০১৯ সময়কালে জিম্বাবুয়ের পক্ষে সর্বমোট ৩৮ টেস্ট, ২০৯টি ওডিআই ও ৬৬টি টি২০আইয়ে অংশ নিয়েছেন। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে অভিষেকে শতরান করার অনন্য নজির গড়েছিলেন। ২০০১ সালে নিজ দেশে কার্ল হুপারের নেতৃত্বাধীন ক্যারিবীয় দলের মুখোমুখি হন। হারারেতে অনুষ্ঠিত সফররত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে তাঁর অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। তিন নম্বর অবস্থানে ব্যাটিংয়ে নেমে ১১৯ রানের দূর্দান্ত ইনিংস খেলেন। ২৭ জুলাই, ২০০১ তারিখে এ রান সংগ্রহকালীন তাঁর বয়স ছিল ১৭ বছর ২৫৪ দিন। এ ইনিংসের কল্যাণে জিম্বাবুয়ে দল ২১৬ রানে এগিয়ে যায় ও পরবর্তীতে টেস্টটি ড্রয়ে পরিণত হয়। তবে, স্বাগতিকরা ১-০ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়। প্রথম ইনিংসে অবশ্য ৯ রান সংগ্রহসহ একটি রান-আউটের সাথে নিজেকে জড়ান। খেলায় তিনি ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার লাভ করেন।
এরপর থেকেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনায় জিম্বাবুয়ীয় ক্রিকেটার হিসেবে সকলের ভাবনায় চলে আসেন। তবে, এক মাসের অল্প বেশীদিনের ব্যবধানে ২০০১ সালে বাংলাদেশের মোহাম্মদ আশরাফুল এ রেকর্ডটি নিজের করে নেন। এছাড়াও, জিম্বাবুয়ের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় হিসেবে এ কীর্তিগাথায় নিজেকে জড়িয়ে রাখেন। এরপর, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০০১ তারিখে বুলাওয়েতে অনুষ্ঠিত সফররত দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওডিআইয়ে প্রথমবারের মতো অংশ নেন।
২০০১-০২ মৌসুমে নিজ দেশে শন পোলকের নেতৃত্বে স্প্রিংবকের মুখোমুখি হন। ৭ সেপ্টেম্বর, ২০০১ তারিখে হারারেতে অনুষ্ঠিত সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে সফররত দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অংশ নেন। খেলার চতুর্থ দিন অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারকে নিয়ে চতুর্থ উইকেটে ১৮৬ রানের দ্বি-পক্ষীয় রেকর্ড গড়েন। খেলায় তিনি ব্যাট হাতে নিয়ে ১৩ ও ৮৫ রান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে, অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের বীরোচিত ব্যাটিংশৈলী প্রদর্শন সত্ত্বেও সফরকারীরা ৯ উইকেটে জয়লাভ করলে দুই-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।
ঐ সময়ে হারারেভিত্তিক চার্চিল হাই স্কুলে ছাত্র ছিলেন। তবে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশগ্রহণের মাত্র এক বছর পরই দক্ষিণ আফ্রিকার ফ্রি স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছর মেয়াদে পড়াশুনোর জন্যে খেলার জগৎ থেকে দূরে সড়েছিলেন। পারস্পরিক সমঝোতায় জিম্বাবুয়ে দলে প্রয়োজনে খেলার সিদ্ধান্ত হয়। পড়াশুনো ও ক্রিকেট খেলায় অংশগ্রহণের সম্মিলিত চাপে খেলায় বিরূপ প্রভাব ফেলে। ঘরোয়া ক্রিকেটে দূর্বল ক্রীড়া নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন। ফলশ্রুতিতে, দল নির্বাচকমণ্ডলী তাঁর পড়াশুনো শেষে জিম্বাবুয়ে ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু, ২০০৪ সালে বিদ্রোহী খেলোয়াড়দের ধর্মঘটের কারণে সৃষ্ট সঙ্কট উত্তরণে তড়িৎগতিতে জাতীয় দলের সদস্যরূপে মনোনীত হন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শুরুতে বেশ হিমশিম খান। তবে, ওডিআই সিরিজের শেষ খেলায় মনোরম অর্ধ-শতক হাঁকিয়ে নিজের পরিচিতি ঘটাতে সচেষ্ট হন।
২০০৫ সালে নিজ দেশে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের মুখোমুখি হন। ২০ সেপ্টেম্বর, ২০০৫ তারিখে হারারেতে অনুষ্ঠিত সফররত ভারতের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ব্যাট হাতে নিয়ে ২৭ ও ৭১ রান সংগ্রহ করে উভয় ক্ষেত্রে ইরফান পাঠানের বলে বিদেয় নিয়েছিলেন। সিরিজ সেরা ইরফান পাঠানের অসাধারণ অল-রাউন্ড ক্রীড়াশৈলীর কল্যাণে সফরকারীরা ১০ উইকেটে জয় পায় ও ২-০ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়।
টেস্ট ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তন একই ধরনের ছিল না। ধারাবাহিকতা না থাকলেও দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে খুব সহজেই জিম্বাবুয়ের সেরা ব্যাটসম্যানের মর্যাদা পেয়েছিলেন। সঠিক সময়ে বলকে ঠেলে দিয়ে রান সংগ্রহে তৎপরতা দেখান যা দলীয় সঙ্গীদের অনেকের মাঝেই অনুপস্থিত ছিল। ২০০৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ভুসি সিবান্দা’র সাথে রেকর্ডসংখ্যক ১৬৭ রানের জুটি গড়ে স্বীয় খেলার ধারা অব্যাহত রাখেন। তবে, ঐ খেলায় জিম্বাবুয়ে দল পরাজয়বরণ করেছিল। ২০০৮-০৯ মৌসুমে দূর্বলতর ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শনের অভিজ্ঞতা পান ও অনেক ক্রিকেট বিশ্লেষকদের চোখে খুবই ধীরলয়ে খেলার কারণে সমালোচিত হন।
২০০৯ সালে ওডিআইয়ে স্বর্ণালী সময় অতিবাহিত করেন। এক পঞ্জিকাবর্ষে ৪৩.৪৮ গড়ে ও ৮৮.০৮ স্ট্রাইক রেটে সহস্রাধিক রান তুলতে সক্ষম হন। এ পর্যায়ে প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে থাকেন ও কেনিয়ার বিপক্ষে সিরিজে স্বীয় অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধকরণে প্রয়াস চালান। একমাত্র জিম্বাবুয়ীয় খেলোয়াড় হিসেবে ওডিআইয়ে দুইবার দেড় শতাধিক রানের ব্যক্তিগত ইনিংস খেলেন। কেনীয় বোলারদের তুনোধুনো করে ১৭৮ ও ১৫৬ রান তুলেন। এছাড়াও একই ওডিআই সিরিজে দুইবার দেড় শতাধিক রান সংগ্রহকারী ব্যাটসম্যানের মর্যাদা পান। ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে গড়া ২০১০ সালের ত্রি-দেশীয় সিরিজেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলে পুরনো ছন্দে ফিরে আসেন।
স্বেচ্ছা নির্বাসন থেকে আগস্ট, ২০১১ সালে টেস্ট ক্রিকেটে জিম্বাবুয়ে দলের প্রত্যাবর্তনের পর তিনিও সদর্পে খেলার জগতে ফিরে আসেন। প্রথম শতরানের ইনিংস খেলার এক দশক পর বাংলাদেশের বিপক্ষে নিজস্ব দ্বিতীয় টেস্ট শতক হাঁকান। তাসত্ত্বেও, দলের ১৪৩ রানের পরাজয় দেখতে হয়। তবে, বাংলাদেশী বোলিং আক্রমণে একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজেকে চিত্রিত করেছিলেন।
টি২০ খেলায়ও বেশ ভালো করেন ও অনেকগুলো উল্লেখযোগ্য অবদানের সাথে জড়িত ছিলেন। সহজাত ব্যাটসম্যান হিসেবে সীমিত-ওভারের খেলায় জিম্বাবুয়ের অন্যতম উদ্যমী উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানসহ টেস্টে শীর্ষসারির ব্যাটসম্যানের পরিচিতি পেয়ে আসছেন। জিম্বাবুয়ে দলের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হন। ব্রেন্ডন টেলর ও এল্টন চিগুম্বুরাকে সাথে নিয়ে দলের ভিত গড়তে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন।
দল নির্বাচকমণ্ডলী তাঁকে টেস্ট ও ওডিআইয়ে দলের সহঃঅধিনায়ক হিসেবে মনোনীত করেন। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ সফরে টেস্টে দলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন। তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ৩৫৬ রান তুলেন। এছাড়াও, পরবর্তীতে ওডিআই সিরিজেও দলের অন্যতম তারকা ছিলেন। তবে, জিম্বাবুয়ে দল ৫-০ ব্যবধানে সিরিজে পরাজিত হয়েছিল।
২০১১ সালে দূর্বল ক্রীড়াশৈলীর কারণে বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেননি। ৩০ বছর বয়সে নিজের স্বর্ণালী সময়ে অবস্থান করেন। ফলশ্রুতিতে, ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় ১৫-সদস্যবিশিষ্ট জিম্বাবুয়ে দলে ঠাঁই পান।
বিশ্ব টি২০ প্রতিযোগিতায় দূর্বলমানের ফলাফলের কারণে জিম্বাবুয়ের অধিনায়কের মর্যাদা হারান। ২০১৮ সালে পুণরায় অধিনায়ক হিসেবে নিযুক্তি পান। ২০১৮-১৯ মৌসুমে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশ সফরে যান। ৩ নভেম্বর, ২০১৮ তারিখে সিলেটে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। অধিনায়কের দায়িত্বে থেকে ৫২ ও ৪৮ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। দলের ১৫১ রানের বিজয়ে ভূমিকা রাখেন। এরফলে, ১৭ বছরের মধ্যে প্রথম বিদেশের মাটিতে জয়লাভ করতে সমর্থ হয় ও দুই-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়। ঐ খেলায় তাঁর সহোদর কনিষ্ঠ ভ্রাতা ওয়েলিংটন মাসাকাদজা’র টেস্ট অভিষেক ঘটে।
এরপর, ১১ নভেম্বর, ২০১৮ তারিখে মিরপুরে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। অধিনায়কের দায়িত্বে থেকে ১৪ ও ২৫ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/৭ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। ঐ টেস্টে মুশফিকুর রহিমের ২১৯ রানের অপরাজিত ইনিংসের কল্যাণে স্বাগতিকরা ২১৮ রানের ব্যবধানে জয় পায় ও ১-১ ব্যবধানে সিরিজ ড্র করতে সমর্থ হয়। পরবর্তীকালে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে অংশগ্রহণ ছিল। দীর্ঘ ১৯ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নেয়ার পর অবসর গ্রহণ করেন।
২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ তারিখে চট্টগ্রামে নিজস্ব শেষ খেলায় ৪২ বলে ৭১ রান তুলে দলকে নাটকীয়ভাবে দলকে জয় এনে দেন। বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ত্রি-দেশীয় টি২০আই সিরিজে দলের প্রতিপক্ষ ছিল আফগানিস্তান। এ পর্যায়ে জিম্বাবুয়ের সকল স্তরের ক্রিকেটে অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলেন ও উত্তরসূরীর কাছে অধিনায়কের দায়িত্বভার অর্পণ করেন। বিদায়ী খেলায় গার্ড অব অনার লাভ করেন।
ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণের পর প্রশাসনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ৩০ অক্টোবর, ২০১৯ তারিখে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট পরিচালক হিসেবে মনোনীত হন।
