৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৯০ তারিখে উত্তরপ্রদেশের আমরোহা এলাকায় জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার। মূলতঃ বোলার হিসেবে দলে ভূমিকা রাখছেন। ডানহাতে ফাস্ট বোলিং করেন। এছাড়াও, ডানহাতে নিচেরসারিতে ব্যাটিংয়ে নেমে থাকেন। ভারতের পক্ষে সকল স্তরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।
৫ ফুট ৮ ইঞ্চি (১.৭৩ মিটার) উচ্চতার অধিকারী। পিতা তৌসিফ আলী কৃষক ছিলেন ও যুবক বয়সে ফাস্ট বোলিং করতেন। পনেরো বছর বয়সে উত্তরপ্রদেশের মোরাদাবাদে বদরুদ্দীন সিদ্দীকের কাছ থেকে প্রারম্ভিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন। এ পর্যায়ে ফাস্ট বোলার হিসেবে তাঁর প্রতিভা বিকশিত হতে থাকে। তবে, উত্তরপ্রদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ দলে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি।
কয়েক বছরের মধ্যেই কলকাতায় চলে আসেন। সেখানে ডালহৌসি ক্রিকেট ক্লাবের পক্ষে খেলা শুরু করেন। এক পর্যায়ে বাংলা ক্রিকেট সংস্থার সাবেক সম্পাদক দেবব্রত দাসের নজরে পড়েন। বাংলার অনূর্ধ্ব-২২ দলের পক্ষে খেলার জন্যে মনোনীত হন। ক্রমাগত সাফল্যের সন্ধান পেতে থাকলে দ্রুত তাঁর অবস্থানের উত্তরণ ঘটে। তাঁর চার ভাই-বোন রয়েছে। শুরুর দিনগুলোয় তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁকে ফাস্ট বোলার হিসেবে উৎসাহিত করতো।
২০১০-১১ মৌসুম থেকে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন চলমান রাখছেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর ভারতীয় ক্রিকেটে বাংলার প্রতিনিধিত্ব করছেন। এছাড়াও, আইসিসি বিশ্ব একাদশ, দিল্লি ক্যাপিটালস, গুজরাত টাইটান্স, কিংস ইলাভেন পাঞ্জাব ও কলকাতা নাইট রাইডার্সের পক্ষে খেলেছেন। ১৭ নভেম্বর, ২০১০ তারিখে ইডেন গার্ডেন্সে বাংলা বনাম আসামের মধ্যকার খেলায় অংশ নেয়ার মাধ্যমে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবনের সূত্রপাত ঘটান।
২০১০ সালে বাংলা দলের পক্ষে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে ও রঞ্জী ট্রফিতে অংশ নেয়ার সুযোগ পান। এরপর থেকেই ঘরোয়া আসরের ক্রিকেটে অন্যতম অসাধারণ খেলোয়াড়ে পরিণত হন। ঘরোয়া ক্রিকেটের মাধ্যমে তাঁর উত্থান ঘটলেও ২০১০-১১ মৌসুমের অভিষেক পর্বে সাদামাটা খেলেন। ২০১২-১৩ মৌসুমে রঞ্জী ট্রফিতে বাংলা দলের সদস্যরূপে ২৮ উইকেট দখল করলে জাতীয় দল নির্বাচকমণ্ডলীর দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হন।
২০১৩ সাল থেকে ভারতের পক্ষে টেস্ট, ওডিআই ও টি২০আইয়ে অংশ নিচ্ছেন। ৬ জানুয়ারি, ২০১৩ তারিখে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সফররত পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো অংশ নিয়ে অসাধারণ ক্রীড়াশৈলী উপস্থাপন করেন। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ঘটার পর থেকে ফাস্ট বোলার হিসেবে ভারত দলে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করতে সচেষ্ট হন।
২০১৩ সালের শেষদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকেও নিজেকে স্মরণীয় করে রাখেন। ২০১৩-১৪ মৌসুমে নিজ দেশে ড্যারেন স্যামি’র নেতৃত্বাধীন ক্যারিবীয় দলের মুখোমুখি হন। ৬ নভেম্বর, ২০১৩ তারিখে ইডেন গার্ডেন্সে অনুষ্ঠিত সফররত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে অংশ নেন। রোহিত শর্মা’র সাথে তাঁর একযোগে টেস্ট অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। ঐ খেলায় নয় উইকেট দখল করেছিলেন তিনি। অভিষেক টেস্টে এটিই ভারতের যে-কোন পেসারের মধ্যে সর্বাধিক উইকেটপ্রাপ্তি ছিল। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ৪/৭১ ও ৫/৪৭ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, দলের একমাত্র ইনিংসে ১ রান সংগ্রহসহ একটি রান-আউটের সাথে নিজেকে জড়ান। তবে, অপর অভিষেকধারী রোহিত শর্মা’র অসামান্য ব্যাটিংশৈলীর কল্যাণে স্বাগতিকরা ইনিংস ও ৫১ রানে জয় পেয়ে দুই-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
এরফলে, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ড গমনের জন্যে মনোনীত হন। আশানুরূপ সফলতার স্বাক্ষর রাখতে পারলেও ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইংল্যান্ড সফরে কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়। তবে, ভারতের ওডিআই দলে স্থান ফিরে পেতে সমর্থ হন। ধীরে ধীরে ভারতের নিয়মিত খেলোয়াড়ে পরিণত হন। টেস্টসহ ওডিআইয়ে ভারতীয় পেস আক্রমণে অংশ নিতে থাকেন।
২১ মার্চ, ২০১৪ তারিখে মিরপুরে পাকিস্তানের বিপক্ষে টি২০আইয়ে প্রথমবারের মতো খেলতে নামেন। ২৩ জানুয়ারি, ২০১৯ তারিখে ভারতের দ্রুততম বোলার হিসেবে ১০০ ওডিআই উইকেট লাভের অধিকারী হন। ২২ জুন তারিখে দ্বিতীয় ভারতীয় বোলার হিসেবে বিশ্বকাপে দ্বিতীয় হ্যাট্রিক লাভের গৌরব অর্জন করেন।
২০১৪ সালে এমএস ধোনি’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের সদস্যরূপে ইংল্যান্ড গমন করেন। ২৭ জুলাই, ২০১৪ তারিখে সাউদাম্পটনে অনুষ্ঠিত পতৌদি ট্রফির তৃতীয় টেস্টে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেন। খেলায় তিনি ৫ ও ০ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ১/১২৩ ও ০/২৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। ঐ টেস্টে স্বাগতিকরা ২৬৬ রানে জয়লাভ করে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ১-১ ব্যবধানে সমতায় চলে আসে।
২০১৭-১৮ মৌসুমে বিরাট কোহলি’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের অন্যতম সদস্যরূপে দক্ষিণ আফ্রিকা গমন করেন। ১৩ জানুয়ারি, ২০১৮ তারিখে সেঞ্চুরিয়নে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সফলতার ছাঁপ রাখেন। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম ইনিংসে কেএ মহারাজের প্রথম উইকেট লাভ করে টেস্টে ১০০ উইকেট লাভের মাইলফলক স্পর্শ করেন। খেলায় তিনি ১/৫৮ ও ৪/৪৯ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, ব্যাট হাতে নিয়ে ১ ও ২৮ রান সংগ্রহ করেছিলেন। লুঙ্গি এনগিডি’র অসাধারণ বোলিং সাফল্যে স্বাগতিকরা ১৩৫ রানে জয়লাভ করলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
একই সফরের ২৪ জানুয়ারি, ২০১৮ তারিখে জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সফলতার সন্ধান পান। দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যক্তিগত সেরা বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তাঁর পূর্বেকার সেরা ছিল ৫/৪৭। খেলায় তিনি ১/৪৬ ও ৫/২৮ লাভ করেন। এছাড়াও, ব্যাট হাতে নিয়ে ৮ ও ২৭ রান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে, ভুবনেশ্বর কুমারের অসাধারণ অল-রাউন্ড কৃতিত্বে সফরকারীরা ৬৩ রানে জয়লাভ করলেও ২-১ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়।
২০১৮ সালে বিরাট কোহলি’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের সদস্যরূপে ইংল্যান্ড গমন করেন। ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ তারিখে লন্ডনের ওভালে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্ট খেলেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ০/৭২ ও ২/১১০ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, ১ ও ০ রান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে, অ্যালাস্টার কুকের অসাধারণ ব্যাটিং দাপটে সফরকারীরা ১১৮ রানে জয়লাভ করলে স্বাগতিকরা ৪-১ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়।
২০১৮-১৯ মৌসুমে বিরাট কোহলি’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের সদস্যরূপে অস্ট্রেলিয়া গমন করেন। ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ তারিখে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে শূন্য রানে অপরাজিত ছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ১/২৭ ও ২/৭১ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তবে, জসপ্রীত বুমরা’র অসাধারণ বোলিংশৈলীর কল্যাণে সফরকারীরা ১৩৭ রানে জয় তুলে নেয় ও চার-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
২০২১ সালে বিরাট কোহলি’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের সদস্যরূপে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশীপের চূড়ান্ত খেলায় অংশ নিতে ইংল্যান্ড গমন করেন। ১৮ জুন, ২০২১ তারিখে সাউদাম্পটনে অনুষ্ঠিত ঐ খেলায় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের সাথে নিজেকে জড়ান। প্রথম ইনিংসে ২ রানে পৌঁছানোকালে টেস্টে ৫০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। ৪* ও ১৩ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, ৪/৩৬ ও ০/৩১ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করানোসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। তবে, কাইল জেমিসনের অসাধারণ অল-রাউন্ড ক্রীড়াশৈলীর কল্যাণে নিউজিল্যান্ড দল ৮ উইকেটে জয়লাভ করে।
২০২১-২২ মৌসুমে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্ট খেলেন। ঐ মৌসুমে বিরাট কোহলি’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের সদস্যরূপে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যান। ২৬ ডিসেম্বর, ২০২১ তারিখে সেঞ্চুরিয়নে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগতভাবে সফল ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম ইনিংসে কে রাবাদা’র পঞ্চম উইকেট লাভ করে টেস্টে ২০০ উইকেট লাভের মাইলফলক স্পর্শ করেন। খেলায় তিনি ৫/৪৪ ও ৩/৬৩ লাভ করেন। এছাড়াও, ৮ ও ১ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। কেএল রাহুলের দূর্দান্ত ব্যাটিংয়ের সুবাদে সফরকারীরা ১১৩ রানে পরাভূত হলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।
২০২৩ সালের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশীপের চূড়ান্ত খেলায় অংশ নিতে রোহিত শর্মা’র নেতৃত্বে ইংল্যান্ড গমন করেন। ৭ জুন, ২০২৩ তারিখে লন্ডনে অপর প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সুবিধে করতে পারেননি। ২/১২২ ও ২/৩৯ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, ব্যাট হাতে নিয়ে ১৩ ও ১৩* রান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে, ট্রাভিস হেডের অসামান্য ব্যাটিং নৈপুণ্যে তাঁর দল অস্ট্রেলিয়ার কাছে ২০৯ রানে পরাভূত হয়।
মোহাম্মদ কাঈফ সম্পর্কে তাঁর ভ্রাতা।
