| |

জর্জ ইউলিট

২১ অক্টোবর, ১৮৫১ তারিখে ইয়র্কশায়ারের ক্রাবট্রি এলাকায় জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার ও আম্পায়ার ছিলেন। মূলতঃ বোলার হিসেবে দলে ভূমিকা রাখতেন। ডানহাতে ফাস্ট বোলিংয়ের পাশাপাশি নিচেরসারিতে ডানহাতে কার্যকর ব্যাটিংশৈলী প্রদর্শন করেছেন। ইংল্যান্ডের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।

‘হ্যাপি জ্যাক’ ডাকনামে পরিচিতি লাভ করেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর ইংরেজ কাউন্টি ক্রিকেটে ইয়র্কশায়ারের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ১৮৭৩ থেকে ১৮৯৩ সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন অতিবাহিত করেছেন। ১৮৮০-এর দশকে ইয়র্কশায়ার প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হন ও ঊনবিংশ শতকে দলের প্রধান ব্যাটসম্যান ছিলেন। তাঁর তুলনায় আরও সেরা ক্রিকেটার থাকলেও তাঁর ন্যায় অন্য কেউ এতো অধিক জনপ্রিয়তা পাননি। প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে কাউন্টির পক্ষে দশ সহস্রাধিক রানের মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন। বলে পর্যাপ্ত পেস আনয়ণ করতে পারতেন ও বলকে নিখুঁত ভঙ্গীমায় সপাটে আঘাত করতেন।

১৮৭৭ থেকে ১৮৯০ সাল পর্যন্ত সময়কালে ইংল্যান্ডের পক্ষে সব মিলিয়ে ২৫টি টেস্টে অংশ নিয়েছিলেন। ১৮৭৬-৭৭ মৌসুমে জেমস লিলিহোয়াইট জুনিয়রের নেতৃত্বাধীন দলের সাথে অস্ট্রেলিয়া গমন করেন। ঐ সফরে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসের প্রথম টেস্টে অংশ নেয়ার গৌরব অর্জন করেন। ১৫ মার্চ, ১৮৭৭ তারিখে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অন্য সকলের সাথে তাঁর একযোগে টেস্ট অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। ঘটনাবহুল এ টেস্টে তাঁর বল থেকে শতকধারী চার্লস ব্যানারম্যান তর্জনীতে আঘাত পেলে ২৪০/৭ থাকা অবস্থায় মাঠ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। খেলায় তিনি ০/৩৬ ও ৩/৩৯ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, ব্যাট হাতে নিয়ে ১০ ও ২৪ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। স্বাগতিকরা ৪৫ রানে জয় পেলে দুই-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।

১৮৭৮-৭৯ মৌসুমে লর্ড হ্যারিসের নেতৃত্বাধীন শৌখিন দলের সাথে অস্ট্রেলিয়া সফর করেন। ২ জানুয়ারি, ১৮৭৯ তারিখে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের একমাত্র টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ব্যাট হাতে নিয়ে ০ ও ১৪ রান সংগ্রহ করে উভয় ইনিংসে ফ্রেড স্পফোর্থের শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ১/৯৩ ও ০/৯ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। সফরকারীরা ১০ উইকেটে পরাজয়বরণ করেছিল।

১৮৮১-৮২ মৌসুমে আলফ্রেড শ’য়ের নেতৃত্বাধীন দলের সদস্যরূপে অস্ট্রেলিয়া গমন করেন। ১০ মার্চ, ১৮৮২ তারিখে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের চতুর্থ ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। ঘটনাবহুল এ টেস্টে প্রথম ইংরেজ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট শতক হাঁকানোর গৌরব অর্জন করেন। পাশাপাশি, ১৯৬৫-৬৬ মৌসুমে আরডব্লিউ বারবারের অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টের প্রথম দিনে সংগৃহীত ১৮৫ রানের পূর্ব পর্যন্ত এটিই যে-কোন ইংরেজের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ ছিল। খেলায় তিনি ১৪৯ ও ৬৪ রান সংগ্রহসহ দুইটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ১/৪০ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে সফরকারীরা ২-০ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়। উল্লেখ্য, ১৯৪৬-৪৭ মৌসুম পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটিই সর্বশেষ ড্র টেস্ট ছিল।

১৮৮৪ সালে নিজ দেশে বিলি মারডকের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ২১ জুলাই, ১৮৮৪ তারিখে লর্ড হ্যারিসের নেতৃত্বাধীন দলের সদস্য হিসেবে লন্ডনের লর্ডসে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট খেলেন। ৭/৩৬ লাভ করে লর্ডস অনার্স বোর্ডে নিজেকে ঠাঁই করে নেন। দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর এ সাফল্যটি পরবর্তীতে ব্যক্তিগত সেরা বোলিংয়ে পরিণত হয়। দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে চার উইকেট ও পরদিন সফরকারীদেরকে ১৪৩ রানে গুটিয়ে দিতে ভূমিকা রাখেন। এক পর্যায়ে ছয় উইকেট তুলেছিলেন। প্রথমটি প্রতিপক্ষীয় অধিনায়ক বিলি মারডকের ছিল। এরফলে, প্রথমবারের মতো টেস্ট খেলায় ইংল্যান্ড দল জয় পায়। তবে, প্রথম ইনিংসে তিনি ০/২১ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, খেলায় তিনি দলের একমাত্র ইনিংসে ৩২ রান সংগ্রহ করেছিলেন। ঐ খেলায় ইংল্যান্ড দল ইনিংস ও ৫ রানের ব্যবধানে জয় পেলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।

১৮৮৪-৮৫ মৌসুমে আর্থার শ্রিউসবারি’র নেতৃত্বাধীন এমসিসি দলের সাথে অস্ট্রেলিয়া গমন করেন। ১২ ডিসেম্বর, ১৮৮৪ তারিখে অ্যাডিলেডে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ৬৮ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/২৩ ও ০/৩ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। স্বাগতিকরা ৮ উইকেটে পরাজয়বরণ করলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে পিছিয়ে পড়ে।

একই সফরের ২১ মার্চ, ১৮৮৫ তারিখে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। রাবার নিষ্পত্তির খেলায় দলের একমাত্র ইনিংসে তিনি ১ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ৪/৫২ ও ৩/২৫ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। খেলায় তাঁর দল ইনিংস ও ৯৮ রানে জয় পেলে ৩-২ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়।

১৮৮৬ সালে নিজ দেশে টাপ স্কটের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ১২ আগস্ট, ১৮৮৬ তারিখে লন্ডনের ওভালে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি দলের একমাত্র ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে টম গারেটের বলে শূন্য রানে বিদেয় নিয়েছিলেন। এছাড়াও, একটি ক্যাচ গ্লাভসবন্দীকরণে অগ্রসর হন। স্বাগতিকরা ইনিংস ও ২১৭ রানে জয় পেলে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়।

১৮৮৮ সালে নিজ দেশে পার্সি ম্যাকডোনেলের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ৩০ আগস্ট, ১৮৮৮ তারিখে ম্যানচেস্টারে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ও চূড়ান্ত টেস্ট খেলেন। খেলায় তিনি দলের একমাত্র ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে চার্লি টার্নারের বলে শূন্য রানে বিদেয় করেছিলেন। ইনিংস ও ২১ রানে জয় পেয়ে স্বাগতিকরা ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জয় করে নেয়।

মেজর হোয়ার্টনের ব্যবস্থাপনায় ১৮৮৮-৮৯ মৌসুমে দক্ষিণ আফ্রিকায় এমসিসি দলের প্রথম সফরে যান। প্রথমবারের মতো দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্ট খেলেন। ১২ মার্চ, ১৮৮৯ তারিখে পোর্ট এলিজাবেথের জিকিবার্হায় অনুষ্ঠিত দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ৪ ও ২২ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/১ ও ২/২৭ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। ৮ উইকেটে জয়লাভ করলে তাঁর দল দুই-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।

এরপর, ২৫ মার্চ, ১৮৮৯ তারিখে কেপটাউনে অনুষ্ঠিত সিরিজের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি দলের একমাত্র ইনিংসে ২২ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, ০/০ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। জনি ব্রিগস ২৮ রান খরচায় ১৫ উইকেট দখল করলে দুইদিনেই শেষ হয়ে যায়। ইনিংস ও ২০২ রানে জয়লাভ করে সফরকারীরা ২-০ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়।

১৮৯০ সালে নিজ দেশে বিলি মারডকের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ২১ জুলাই, ১৮৯০ তারিখে লন্ডনের লর্ডসে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ৭৪ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ১/০ ও ০/১১ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। স্বাগতিকরা ৭ উইকেটে জয়লাভ করলে সিরিজে এগিয়ে যায়। পরবর্তীকালে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।

টেস্টগুলো থেকে ২৪.৩৩ গড়ে ৯৪৯ রান ও ২০.৪০ গড়ে ৫০ উইকেট দখলসহ ১৯ ক্যাচ মুঠোয় পুড়েছিলেন। সব মিলিয়ে ৫৩৭টি প্রথম-শ্রেণীর খেলায় অংশ নিয়ে ২৩.৪৪ গড়ে ২০৮২৩ রান ও ২০.১৪ গড়ে ৬৫৩ উইকেট দখল করেছিলেন। এছাড়াও, ৩৬৮ ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। ২১ মৌসুম খেলে দশবার সহস্র রান সংগ্রহের মাইলফলক স্পর্শক করেছিলেন।

ক্রিকেটের পাশাপাশি ফুটবল খেলায় অংশ নিতেন। শেফিল্ড ওয়েনসডে প্রতিযোগিতায় গোলরক্ষক হিসেবে খেলতেন। ক্রিকেট খেলা থেকে অবসর গ্রহণের পর আম্পায়ারিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েন। দুইটি প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেট খেলা পরিচালনা করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত ছিলেন। এমা নাম্নী এক রমণীর পাণিগ্রহণ করেন। এ দম্পতির ফ্রেড নামীয় পুত্র এবং কেট, লরা ও জো নাম্নী তিন কন্যা সন্তান ছিল। দূর্ভাগ্যবশতঃ ফ্রেড নয় মাস বয়সে মৃত্যুবরণ করে। ১৮ জুন, ১৮৯৮ তারিখে ইয়র্কশায়ারের পিটসমুর এলাকায় মাত্র ৪৬ বছর ২৪০ দিন বয়সে তাঁর দেহাবসান ঘটে। শেফিল্ডের বার্নগ্রিভ সিমেট্রিতে তাঁকে সমাহিত করা হয় ও চার সহস্রাধিক লোকের সমাগম ঘটে।

সম্পৃক্ত পোস্ট