২৮ জুলাই, ১৯৭৮ তারিখে মানাওয়াতুর পালমারস্টোন নর্থ এলাকায় জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার ও কোচ। মূলতঃ অল-রাউন্ডার হিসেবে দলে ভূমিকা রেখে গেছেন। বামহাতে ব্যাটিং করতেন। এছাড়াও, ডানহাতে ফাস্ট-মিডিয়াম বোলিংশৈলী প্রদর্শন করতেন। নিউজিল্যান্ডের পক্ষে সকল স্তরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।
৬ ফুট ৬ ইঞ্চি (১.৯৮ মিটার) উচ্চতার অধিকারী তিনি। অল-রাউন্ডার হিসেবে খেলতেন। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বোলিংয়েও দক্ষতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। নিউজিল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের পক্ষে খেলেছেন।
খেলোয়াড়ী জীবনের শুরুতে ক্রিকেট খেলাকে প্রাধান্য দেননি। কিশোর অবস্থায় ফুটবল খেলতেন ও গোল-রক্ষক ছিলেন। পরবর্তীতে, ১৯৯৭ সালে সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্টসের সাথে তাঁর অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। ১৯৯৭-৯৮ মৌসুম থেকে ২০০৯ সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন চলমান রাখেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর নিউজিল্যান্ডীয় ক্রিকেটে সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্টসের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়াও, চেন্নাই সুপার কিংস, মুম্বই ইন্ডিয়ান্স, রাজস্থান রয়্যালস, চিটাগং কিংস, গাজী ট্যাঙ্ক ক্রিকেটার্স ও ইউভা নেক্সটের পক্ষে খেলেছেন।
২০০১ থেকে ২০১২ সময়কালে নিউজিল্যান্ডের পক্ষে সর্বমোট ৩৩ টেস্ট, ১৬০টি ওডিআই ও ৩৬টি টি২০আইয়ে অংশ নিয়েছিলেন। ২০০০-০১ মৌসুমে নিজ দেশে জিম্বাবুয়ের মুখোমুখি হন। ৪ জানুয়ারি, ২০০১ তারিখে ওয়েলিংটনে অনুষ্ঠিত সফররত জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওডিআইয়ে অংশ নেয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রবেশ করেন।
২০০১-০২ মৌসুমে গ্রীষ্মে পায়ের সমস্যার কারণে অস্ট্রেলিয়া গমন করা থেকে বঞ্চিত হন। ২০০২-০৩ মৌসুমে পুণরায় দলে ফিরে আসেন। ওডিআই ও টেস্ট দলে নিজেকে ঠাঁই করে নেন। ঐ মৌসুমে নিজ দেশে সৌরভ গাঙ্গুলী’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের মুখোমুখি হন। ১২ ডিসেম্বর, ২০০২ তারিখে একই মাঠে সফররত ভারতের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে তাঁর অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। ২/৩১ ও ৩/৩৬ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, একবার ব্যাটিংয়ে নেমে হরভজন সিংয়ের বলে শূন্য রানে বিদেয় নেন। তবে, মার্ক রিচার্ডসনের অসাধারণ ব্যাটিংশৈলীর কল্যাণে স্বাগতিকরা ১০ উইকেটে জয় পেলে দুই-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়। ভারতের বিপক্ষে এ সিরিজ থেকে ১১ উইকেট পেয়েছিলেন।
২০০৩-০৪ মৌসুমে নিজ দেশে ইনজামাম-উল-হকের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানী দলের মুখোমুখি হন। ২৬ ডিসেম্বর, ২০০৩ তারিখে ওয়েলিংটনে অনুষ্ঠিত সিরিজের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে স্বাগতিক পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের ছাঁপ রাখেন। প্রথম ইনিংসে ব্যক্তিগত পূর্বতন সর্বোচ্চ ৭৪ রান অতিক্রম করেন। খেলায় তিনি ৯৭ ও ৩ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, ২/৪৯ ও ১/৩৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করানোসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। শোয়েব আখতারের অসাধারণ বোলিং নৈপুণ্যের কল্যাণে সফরকারীরা ৭ উইকেটে জয়লাভ করলে ১-০ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়।
২০০৪ সালে দারুণ খেলেন। ২০০৩-০৪ মৌসুমে নিজ দেশে গ্রায়েম স্মিথের নেতৃত্বাধীন স্প্রিংবকের মুখোমুখি হন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তিন টেস্ট থেকে ৯১ গড়ে ২৭৩ রান তুলেন। একই সিরিজে হ্যামিল্টন টেস্টে নিজস্ব প্রথম টেস্ট শতক হাঁকান। ১০ মার্চ, ২০০৪ তারিখে সফররত দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। প্রথম ইনিংসে ব্যক্তিগত পূর্বতন সর্বোচ্চ ৯৭ রান অতিক্রম করেন। একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ১১৯* রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। এছাড়াও, ২/৭৬ ও ০/২৯ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। জ্যাক ক্যালিসের অল-রাউন্ড ক্রীড়া নৈপুণ্যের কল্যাণে খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।
এরপর, ১৮ মার্চ, ২০০৪ তারিখ থেকে অকল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সফলতার ছাঁপ রাখেন। প্রথম ইনিংসে ৬৯ রানে পৌঁছানোকালে টেস্টে ৫০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। ঘটনাবহুল এ টেস্টে খেলার তৃতীয় দিন ক্রিস কেয়ার্নসকে (১৫৮) সাথে নিয়ে সপ্তম উইকেটে ২২৫ রান সংগ্রহ করে দ্বি-পক্ষীয় নতুন রেকর্ড গড়েন। পাশাপাশি, নিউজিল্যান্ডের পক্ষে সপ্তম উইকেটে সর্বকালের সেরাদের তালিকায় যুক্ত হয়। খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ৯০ রান সংগ্রহ করেন। এছাড়াও, ২/৬০ ও ১/৪৭ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তবে, ক্রিস মার্টিনের দূর্দান্ত বোলিংশৈলীর কল্যাণে স্বাগতিকরা ৯ উইকেটে জয় পায়। এরফলে, নিউজিল্যান্ডের মাটিতে প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ড দল দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট জয় করে। তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
২০০৪-০৫ মৌসুমে বাংলাদেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো টেস্ট খেলেন। এ মৌসুমে স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের নেতৃত্বাধীন কিউই দলের সদস্যরূপে বাংলাদেশ সফরে যান। ১৯ অক্টোবর, ২০০৪ তারিখে ঢাকায় অনুষ্ঠিত স্বাগতিক বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। বল হাতে নিয়ে ৩/৩৬ ও ০/৬ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। পাশাপাশি, দলের একমাত্র ইনিংসে ২৩ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। ব্রেন্ডন ম্যাককালামের অসাধারণ ব্যাটিং নৈপুণ্যে সফরকারীরা ইনিংস ও ৯৯ রানে জয় পেলে দুই-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।
২০০৫ সালে পিঠের আঘাতের কারণে অস্ট্রেলিয়া সফরে যেতে পারেননি। জানুয়ারি, ২০০৭ সালে কমনওয়েলথ ব্যাংক সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৭১ বলে তিন অঙ্কের কোটা স্পর্শ করেন। এ পর্যায়ে যে-কোন নিউজিল্যান্ডীয় ব্যাটসম্যানের ওডিআইয়ে দ্রুততম শতক ছিল।
২০০৫-০৬ মৌসুমে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্ট খেলেন। স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের নেতৃত্বাধীন কিউই দলের অন্যতম সদস্যরূপে দক্ষিণ আফ্রিকা গমন করেন। ১৫ এপ্রিল, ২০০৬ তারিখে সেঞ্চুরিয়নে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের সন্ধান পান। প্রথম ইনিংসে ব্যক্তিগত পূর্বতন সর্বোচ্চ ১২৬ রান অতিক্রম করেন। খেলায় তিনি ১৩৩ ও ২ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/২৭ ও ২/৪৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। মাখায়া এনটিনি’র অসাধারণ বোলিং নৈপুণ্যের কল্যাণে সফরকারীরা ১২৮ রানে পরাজিত হলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে পিছিয়ে পড়ে।
২০০৭ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতার পূর্বে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বি-পক্ষীয় সিরিজে ফিল্ডিংকালে আঙ্গুলে চোট পান। এরফলে, বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতায় তাঁর অন্তর্ভুক্তিতে প্রশ্নবোধকের পরিবেশ সৃষ্টি করে। তাসত্ত্বেও, ব্যাট হাতে ৩৩ গড়ে রান ও বল হাতে ২৫ গড়ে উইকেট পান। এ প্রতিযোগিতায় তাঁর দল সেমি-ফাইনাল অবদি পৌঁছে।
২০০৮ সালে ড্যানিয়েল ভেট্টোরি’র নেতৃত্বাধীন কিউই দলের অন্যতম সদস্যরূপে ইংল্যান্ড সফরে যান। ১৫ মে, ২০০৮ তারিখে লর্ডসে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের ছাঁপ রাখেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৪ রানে পৌঁছানোকালে টেস্টে ১৫০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। খেলায় তিনি ২৮ ও ১০১ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ২/৪৫ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। দলীয় অধিনায়কের অল-রাউন্ড নৈপুণ্যে খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।
ক্রমাগত আঘাতের কবলে পড়তে থাকলে ২০০৯ সালে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ২০০৯ সালে ড্যানিয়েল ভেট্টোরি’র নেতৃত্বাধীন কিউই দলের সদস্যরূপে শ্রীলঙ্কা গমন করেন। ২৬ আগস্ট, ২০০৯ তারিখে কলম্বোয় সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অংশ নেন। ০/৫৬ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, ২৪ ও ৫৬ রান সংগ্রহের পাশাপাশি একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। তবে, মাহেলা জয়াবর্ধনে’র অসাধারণ ব্যাটিংশৈলীর কল্যাণে স্বাগতিকরা ৯৬ রানে জয় পেলে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জয় করে নেয়। পরবর্তীতে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।
একই বছরের ২ সেপ্টেম্বর তারিখে স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টি২০আইয়ে ব্রেট লি’র পর দ্বিতীয় হ্যাট্রিক লাভ করেন। আর. প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ঐ খেলায় অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজ, মালিঙ্গা বান্দারা ও নুয়ান কুলাসেকারা তাঁর শিকারে পরিণত হন। খেলায় তাঁর দল জয়লাভ করে। ২০১১ সালে ওডিআইয়ে রস টেলরের সাথে ২২ বলে ৮৫ রানের জুটি গড়েন।
২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগে চেন্নাই সুপার কিংসের সদস্য ছিলেন। ২০১১ সালে রাজস্থান রয়্যালসের পক্ষে খেলার জন্যে চুক্তিবদ্ধ হন। ২০১৩ সালে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের পক্ষে খেলেন। ২০১২ সালে শ্রীলঙ্কা প্রিমিয়ার লীগের উদ্বোধনী আসরে ইউভা নেক্সটের প্রতিনিধিত্ব করে দলের শিরোপা বিজয়ে ভূমিকা রাখেন।
ক্রিকেট খেলা থেকে অবসর গ্রহণের পর কোচিং জগতের দিকে ধাবিত হন। নিউজিল্যান্ড মহিলা ক্রিকেট দলের বোলিং কোচের দায়িত্বে ছিলেন। ৪০ বছর বয়সে এসে নিউজিল্যান্ডের উদীয়মান খেলোয়াড় অ্যাডাম মিলেনের পরামর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এছাড়াও, ম্যাসি ইউনিভার্সিটির উদ্যোগে ‘লিডিং এজ’ শীর্ষক ক্রিকেট প্রকল্পে যুক্ত রয়েছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত তিনি। মারা টেইট-জেমিসন নাম্নী এক রমণীর সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন ও দুই সন্তানের জনক। মার্চ, ২০২২ সালে তাঁর পরিবার কোভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়।
