|

আর্থার মরিস

১৯ জানুয়ারি, ১৯২২ তারিখে নিউ সাউথ ওয়েলসের বন্ডি এলাকায় জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত ক্রিকেটার ছিলেন। মূলতঃ ব্যাটসম্যান হিসেবে দলে ভূমিকা রেখেছিলেন। বামহাতে ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বামহাতে রিস্ট-স্পিন বোলিং করতে পারতেন। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।

বন্ডিতে জন্মগ্রহণ করলেও শিক্ষক পিতার স্থানান্তরের ফলে খুব শীঘ্রই তাঁর পরিবার ডানগগে চলে যান। ইংরেজ মাতা বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটালে পিতার তত্ত্বাবধানে নিজেকে গড়ে তুলেন। সিডনিতে ফিরে আসার পর ক্যান্টারবারি বয়েজ হাই স্কুলে অধ্যয়ন করেন। বিদ্যালয়ে তিনি বামহাতি আনঅর্থোডক্স স্পিন বোলিংয়ে পারদর্শীতা দেখান। এছাড়াও, টেনিস ও রাগবি ইউনিয়নে দক্ষতা প্রদর্শন করেন।

১৯৪০-৪১ মৌসুম থেকে ১৯৫৪-৫৫ মৌসুম পর্যন্ত সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন অতিবাহিত করেছেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটে নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ১৮ বছর বয়সে ডিসেম্বর, ১৯৪০ সালে প্রথমবারের মতো প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে অংশ নেন। সিডনিতে কুইন্সল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম খেলায় ১৪৮ ও ১১ রান তুলেন। এরফলে, প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে প্রথম-শ্রেণীর অভিষেক খেলায় জোড়া শতক লাভের কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। ধার করা ব্যাট থেকে রান সংগ্রহের সংবাদ শুনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও অস্ট্রেলীয় লেবার পার্টির নেতা ডক এভাট তাঁকে সিডনিতে স্ট্যান ম্যাককাবে’র দোকান থেকে নতুন ব্যাট নিয়ে আসার জন্যে পাঠান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে তাঁর টেস্ট খেলোয়াড়ী জীবনের শুরতে বাঁধার প্রাচীর গড়ে তুলে। তিন বছর অস্ট্রেলীয় সেনাবাহিনীর সাথে পাপুয়া ও নিউগিনিতে অবস্থান করেন। ১৯৪৬-৪৭ মৌসুমে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে পুণরায় ফিরে আসেন। দূর্দান্ত খেলার সূচনা ঘটান। কেবলমাত্র ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম দুই টেস্ট বাদে মজার ছলে রান তুলতে থাকেন।

১৯৪৬ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত সময়কালে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে সর্বমোট ৪৬ টেস্টে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৪৬-৪৭ মৌসুমে নিজ দেশে লেন হাটনের নেতৃত্বাধীন এমসিসি দলের মুখোমুখি হন। ২৯ নভেম্বর, ১৯৪৬ তারিখে ব্রিসবেনে অনুষ্ঠিত সফররত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। জর্জ ট্রাইবের সাথে তাঁর একযোগে টেস্ট অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। খেলায় তিনি ২ ও ৫ রান তুলেন। ইনিংস ও ৩৩২ রানে জয়লাভ করে স্বাগতিকরা পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।

একই সফরের ১ জানুয়ারি, ১৯৪৭ তারিখে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে ২১ রান তুলেন। কিন্তু, দ্বিতীয় ইনিংসে কোন প্রশ্নবিদ্ধতার সুযোগ না দিয়ে ছয় ঘণ্টা মনোসংযোগ ঘটিয়ে পরম যত্নে ১৫৫ রান তুলে ইংরেজ দলের সংগ্রহকে পিছনে নিয়ে যান। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে স্বাগতিকরা ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকে।

অ্যাডিলেডের প্রচণ্ড উত্তাপ উপেক্ষা করে উভয় ইনিংসে তিন অঙ্কের রান তুলেন।

১৯৪৭-৪৮ মৌসুমে নিজ দেশে লালা অমরনাথের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের মুখোমুখি হন। ২৮ নভেম্বর, ১৯৪৭ তারিখে ব্রিসবেনের গাব্বায় অনুষ্ঠিত সফররত ভারতের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি দলের একমাত্র ইনিংসে ৪৭ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। স্বাগতিক দল ইনিংস ও ২২৬ রানে জয় পায় এবং পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।

ডন ব্র্যাডম্যানের নেতৃত্বাধীন ‘অপরাজেয় দলের’ উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৪৮ সালের অ্যাশেজ সিরিজ খেলতে ডন ব্র্যাডম্যানের নেতৃত্বাধীন ‘অপরাজেয়’ নামধারী অজি দলের সাথে ইংল্যান্ড গমন করেন। এ সিরিজে সর্বাধিক রান সংগ্রাহকে পরিণত হন।

২৪ জুন, ১৯৪৮ তারিখে লন্ডনের লর্ডসে অনুষ্ঠিত সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অংশ নেন। অসাধারণ ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শনে অগ্রসর হন। খেলায় তিনি ব্যাট হাতে নিয়ে ১০৫ ও ৬২ রান সংগ্রহ করেছিলেন। স্বাগতিকরা ৪০৯ রানের বিশাল ব্যবধানে পরাভূত হলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে।

একই সফরের ২২ জুলাই, ১৯৪৮ তারিখে লিডসে অনুষ্ঠিত সিরিজের চতুর্থ টেস্ট খেলেন। খেলায় তিনি ৬ ও ১৮২ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/৩০ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। ৭ উইকেটে জয় পেলে সফরকারীরা পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।

এরপর, ১৪ আগস্ট, ১৯৪৮ তারিখে লন্ডনের ওভালে অনুষ্ঠিত সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি দলের একমাত্র ইনিংসে ১৯৬ রান সংগ্রহসহ দুইটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। এ পর্যায়ে সিড বার্নসের (৬১) সাথে উদ্বোধনী জুটিতে ১১৭ ও তৃতীয় উইকেটে লিন্ডসে হ্যাসেটের (৩৭) সাথে ১০৯ রান সংগ্রহ করেছিলেন। স্বাগতিকরা ইনিংস ও ১৪৯ রানে পরাজয়বরণ করলে ৪-০ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়।

১৯৪৯-৫০ মৌসুমে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্ট খেলেন। ঐ মৌসুমে লিন্ডসে হ্যাসেটের নেতৃত্বাধীন অজি দলের সদস্যরূপে দক্ষিণ আফ্রিকা গমন করেন। ২৪ ডিসেম্বর, ১৯৪৯ তারিখে জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি দলের একমাত্র ইনিংসে কুয়ান ম্যাকার্থি’র বলে শূন্য রানে বিদেয় নিয়েছিলেন। সফরকারীরা ইনিংস ও ৮৫ রানে জয়লাভ করলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।

এরপর, ২০ জানুয়ারি, ১৯৫০ তারিখে ডারবানে অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় টেস্ট খেলেন। ব্যক্তিগতভাবে সফল ছিলেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ১ রানে পৌঁছানোকালে টেস্টে ১৫০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। খেলায় তিনি ২৫ ও ৪৪ রান সংগ্রহ করে উভয় ইনিংসে হিউ টেফিল্ডের শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। এছাড়াও, ৭/২৩ ও ২/১৪৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। স্বাগতিকরা ৫ উইকেটে পরাজয়বরণ করলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে পিছিয়ে পড়ে।

একই সফরের ১০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫০ তারিখে জোহানেসবার্গের এলিস পার্কে অনুষ্ঠিত সিরিজের চতুর্থ টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ১১১ ও ১৯ রান সংগ্রহ করে উভয় ইনিংসে কুয়ান ম্যাকার্থি’র শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালেও সফরকারীরা ৩-০ ব্যবধানে সিরিজে এগিয়ে যায়।

১৯৫০-৫১ মৌসুমে নিজ দেশে ফ্রেডি ব্রাউনের নেতৃত্বাধীন এমসিসি দলের মুখোমুখি হন। ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫১ তারিখে অ্যাডিলেডে অনুষ্ঠিত সফররত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের চতুর্থ টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ২০৬ ও ১৬ রান সংগ্রহসহ দুইটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। স্বাগতিকরা ২৭৪ রানে জয় পেলে ৪-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।

১৯৫১-৫২ মৌসুমে নিজ দেশে জন গডার্ডের নেতৃত্বাধীন ক্যারিবীয় দলের মুখোমুখি হন। ৩০ নভেম্বর, ১৯৫১ তারিখে সিডনিতে অনুষ্ঠিত সফররত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট খেলেন। খেলায় তিনি ব্যাট হাতে নিয়ে ১১ ও ৩০ রান সংগ্রহ করেছিলেন। ৭ উইকেটে জয় পেলে স্বাগতিকরা পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।

১৯৫৩ সালে লিন্ডসে হ্যাসেটের নেতৃত্বাধীন অজি দলের সাথে ইংল্যান্ড সফরে যান। ২৫ জুন, ১৯৫৩ তারিখে লন্ডনের লর্ডসে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট খেলেন। খেলায় তিনি ৩০ ও ৮৯ রান সংগ্রহ করেছিলেন। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।

১৯৫৫ সালে ইয়ান জনসনের নেতৃত্বাধীন অজি দলের সদস্যরূপে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ সফরে যান। ১১ জুন, ১৯৫৫ তারিখে কিংস্টনে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি দলের একমাত্র ইনিংসে ৭ রান সংগ্রহ করেছিলেন। সফরকারীরা ইনিংস ও ৮২ রানে জয় পেলে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়। পরবর্তীকালে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।

১৯৫৫ সালে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এ পর্যায়ে স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। এরপর, তিনি আর কোন খেলায় অংশ নেননি। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড ট্রাস্ট হিসেবে মনোনীত হন।

২৪ নভেম্বর, ২০১৬ তারিখে মুত্তিয়া মুরালিধরন, কারেন রোল্টন ও জর্জ লোহমানের সাথে আইসিসি ক্রিকেট হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত হন। শেন ওয়ার্ন, ইয়ান হিলি, অ্যালান বর্ডারনীল হার্ভে’র সাথে অস্ট্রেলিয়ার শতাব্দীর সেরা টেস্ট দলে ঠাঁই পেয়েছেন। শতবার্ষিকী টেস্টের তৃতীয় দিনে ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ও বর্তমান অধিনায়কদের অন্যতম হিসেবে মাঠে সাড়িবদ্ধভাবে দাঁড়ান।

ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত ছিলেন। ভ্যালেরি মরিস নাম্নী এক রমণীর পাণিগ্রহণ করেন। ২২ আগস্ট, ২০১৫ তারিখে নিউ সাউথ ওয়েলসের সিডনিতে ৯৩ বছর ২১৫ দিন বয়সে তাঁর দেহাবসান ঘটে।

সম্পৃক্ত পোস্ট