|

আব্দুর রাজ্জাক

১৫ জুন, ১৯৮২ তারিখে খুলনায় জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার। মূলতঃ বোলার হিসেবে দলে ভূমিকা রেখেছিলেন। স্লো লেফট-আর্ম অর্থোডক্স বোলিং করতেন। এছাড়াও, বামহাতে নিচেরসারিতে ব্যাটিংয়ে নামতেন। বাংলাদেশের পক্ষে সকল স্তরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।

দীর্ঘদেহের অধিকারী তিনি। ‘রাজ’ ডাকনামে পরিচিতি পান। সহজাত প্রকৃতির বামহাতি স্পিনার হিসেবে উপমহাদেশের পিচে ব্যাটসম্যানদের সমীহের পাত্রে পরিণত হতেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর বাংলাদেশী ক্রিকেটে খুলনা বিভাগ ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়াও, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব, রংপুর রাইডার্স ও রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের পক্ষে খেলেছেন।

২০০১-০২ মৌসুমে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেকের পর থেকে নিজেকে সর্বদাই মেলে ধরতে সচেষ্ট ছিলেন। ঐ মৌসুমে খুলনা বিভাগের প্রথমবারের মতো এনসিএলের শিরোপা বিজয়ে সহায়তার হাত প্রশস্ত করেন। পরের মৌসুমে ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের সদস্য হন ও বিস্ময়করভাবে ঢাকা প্রিমিয়ার লীগের শিরোপা বিজয়ে ভূমিকা রাখেন। ধারাবাহিক ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শনের কারণে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের সদস্যরূপে ঠাঁই পান। ২০০৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পাঁচ-খেলা নিয়ে গড়া ওডিআই সিরিজে দলের বিজয়ে বিরাট ভূমিকা রাখেন। এ সিরিজ থেকে ১৫ উইকেট দখল করেন। তন্মধ্যে, ঢাকায় একটি খেলায় ৭/১৭ পান।

২০০৪ থেকে ২০১৮ সময়কালে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বমোট ১৩ টেস্ট, ১৫৩টি ওডিআই ও ৩৪টি টি২০আইয়ে অংশ নিয়েছিলেন। ২০০৫-০৬ মৌসুমে নিজ দেশে রিকি পন্টিংয়ের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ১৬ এপ্রিল, ২০০৬ তারিখে তাঁর টেস্ট অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টটিতে তেমন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেননি। জেসন গিলেস্পি’র অসাধারণ দ্বি-শতকের কল্যাণে স্বাগতিক দল ইনিংস ও ৮০ রানে পরাজয়বরণ করলে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়। ১৫ ও ০ রান সংগ্রহ করেন। এছাড়াও, বল হাতে ৯৯ রান খরচ করলেও কোন উইকেটের সন্ধান পাননি।

আট বছরে মাত্র ১২ টেস্টে অংশ নিয়েছিলেন ও ২০১৪ সালে সকল স্তরের ক্রিকেট থেকে বাদ পড়েন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে উপেক্ষিত হলেও ঘরোয়া পর্যায়ের ক্রিকেটে ঠিকই নিয়মিতভাবে শীর্ষ বোলারের মর্যাদাপ্রাপ্ত হয়েছেন। ২০১৮ সালে সাকিব আল হাসানের আঘাতের কারণে শূন্যতা পূরণে আকস্মিকভাবে বাংলাদেশের টেস্ট দলে খেলার জন্যে আমন্ত্রণ পান।

২০১৭-১৮ মৌসুমে নিজ দেশে দিনেশ চণ্ডীমলের নেতৃত্বাধীন শ্রীলঙ্কান দলের মুখোমুখি হন। ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ তারিখে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সফররত শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত টেস্ট খেলেন। ৪/৬৩ ও ১/৬০ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। ব্যাট হাতে ১ ও ২ রান সংগ্রহ করেন। রোশন সিলভা’র ব্যাটিং সাফল্যে সফরকারীরা ২১৫ রানে জয় পেলে ১-০ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়। পরবর্তীকালে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে অংশগ্রহণ ছিল।

টেস্টের তুলনায় ওডিআই অভিষেকেই অধিক সফলতা পেয়েছিলেন। ২০০৪ সালে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে তাঁকে বাংলাদেশ দলে রাখা হয়। ১৬ জুলাই, ২০০৪ তারিখে কলম্বোর এসএসসিতে হংকংয়ের বিপক্ষে ঐ খেলায় ৩/১৭ লাভ করেছিলেন। খেলায় তাঁর দল ১১৬ রানে জয়লাভ করে। প্রসঙ্গতঃ এ খেলার মাধ্যমেই তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম অংশগ্রহণ করেন। তবে, ঐ বছরেই নিজস্ব দ্বিতীয় ওডিআইয়ে অংশ নেয়ার পর বিরূপ প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। বোলিংয়ের ধরন পরিবর্তন করে পরের বছর খেলার জগতে ফিরে আসেন।

২৮ নভেম্বর, ২০০৬ তারিখে খুলনায় অনুষ্ঠিত সফররত জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তাঁর টি২০আইয়ে অভিষেক ঘটে। প্রসঙ্গতঃ এটিই বাংলাদেশ দলের উদ্বোধনী টি২০আইয়ে অংশগ্রহণ ছিল। টেস্ট ও ওডিআইয়ে বাংলাদেশ দলকে প্রথম জয়ের জন্যে দীর্ঘদিন অপেক্ষার প্রহর গুণতে হলেও এ পর্যায়ে ব্যতিক্রম ছিল। বাংলাদেশ দল জয় পায়। মাশরাফি মর্তুজার ঝড়োগতিতে ৩৫ রান সংগ্রহের পর তিনি নির্ধারিত চার ওভারে ৩/১৭ নিয়ে দলকে ৪৩ রানের জয় এনে দেন।

২০০৬ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে দারুণ খেলেন। দুই মাস পর ডিসেম্বর, ২০১৬ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৫/৩৩ পান। ২০০৭ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ দলের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিলেন। সব মিলিয়ে তেরোটি উইকেট দখল করেছিলেন। কিন্তু, পরের বছরেই অবৈধ বোলিং ভঙ্গীমার কারণে আইসিসি কর্তৃক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েন। তাঁর বোলিং ভঙ্গীমা নিয়ে কিছুটা সন্দেহের সৃষ্টি হয়। ২০০৮ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলাকালীন তাঁর কনুঁই ২৮ ডিগ্রী বাঁকানো ছিল। বোলিংয়ে নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েন। কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দীনের নিবিড় তত্ত্বাবধানে খুলনায় কঠোর অনুশীলন করেন। এরফলে, তিন মাসের মধ্যেই পুণরায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার পথ সুগম হয়।

২০০৮-০৯ মৌসুমে নিজ দেশে ড্যানিয়েল ভেট্টোরি’র নেতৃত্বাধীন কিউই দলের মুখোমুখি হন। ১৭ অক্টোবর, ২০০৮ তারিখে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত সফররত নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের সন্ধান পান। নিউজিল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসে বিবি ম্যাককালামকে বিদেয় করে ব্যক্তিগত সেরা বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তাঁর পূর্বেকার সেরা ছিল ১/৫১। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ১/৫১ ও ৩/৯৩ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, ব্যাট হাতে নিয়ে ১১ ও ১৮ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। প্রতিপক্ষীয় অধিনায়কের অল-রাউন্ড ক্রীড়াশৈলীর কল্যাণে স্বাগতিকরা ৩ উইকেটে পরাজয়বরণ করলে দুই-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে পিছিয়ে পড়ে।

২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই খেলা থেকে ৭ উইকেট দখল করেন। এরপর, সফররত জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পাঁচ-খেলা নিয়ে গড়া সিরিজে ১৫ উইকেট লাভ করে ম্যান অব দ্য সিরিজের পুরস্কার পান। বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতার পূর্বেকার খেলাগুলোয়ও এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। এ পর্যায়ে অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের সাথে দূর্দান্ত জুটি গড়েন।

বাংলাদেশের প্রথম খেলোয়াড় ও বৈশ্বিকভাবে পঞ্চম খেলোয়াড় হিসেবে যৌথভাবে একদিনের আন্তর্জাতিকে উপর্যুপরী তিনবার খেলায় চার-উইকেট লাভের কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। ২০১০-১১ মৌসুমে বাংলাদেশে সফররত জিম্বাবুয়ে দলের বিপক্ষে ঢাকায় অনুষ্ঠিত খেলাগুলোয় ৪/৪১, ৫/৩০ ও ৪/১৪ বোলিং পরিসংখ্যান গড়েছিলেন।

নিজস্ব ১৪১তম ওডিআইয়ে প্রথম বাংলাদেশী ক্রিকেটার হিসেবে ২০০তম উইকেট লাভ করেন। ২৮ মার্চ, ২০১৩ তারিখে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তৃতীয় ওডিআইয়ে এ সফলতা পান। কয়েক সপ্তাহ পর ৫ মে, ২০১৩ তারিখে বুলাওয়েতে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দ্রুততম অর্ধ-শতক হাঁকান। এরফলে, মোহাম্মদ আশরাফুলের ২১ বলে দ্রুততম অর্ধ-শতকের রেকর্ডের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন।

২০১৪ সালের এশিয়া কাপে দলের সদস্য ছিলেন। আফগানিস্তানের বিপক্ষে অংশ নেন। ঐ খেলাসহ প্রতিযোগিতার কোন খেলায় জয়লাভ করতে ব্যর্থ হয় তাঁর দল। ২০১৪ সালের পর থেকে তাঁকে আর কোন আন্তর্জাতিক খেলায় অংশ নিতে দেখা যায়নি। তবে, তিনিও হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র ছিলেন না। ঘরোয়া ক্রিকেটে শীর্ষ উইকেট শিকারীতে পরিণত হলে তাঁকে জানুয়ারি, ২০১৮ সালে পুণরায় দলে ফিরিয়ে আনা হয় ও নিজ দেশে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলেন।

বাংলাদেশে বামহাতি স্পিনারদের বেশ প্রাচুর্য্যতা থাকলেও খুব কমসংখ্যক বোলারই তাঁর সমকক্ষ হয়েছেন। প্রথম বাংলাদেশী বোলার হিসেবে ওডিআইয়ে ২০০ উইকেট ও জানুয়ারি, ২০১৮ সালে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে ৫০০ উইকেট লাভের কৃতিত্বের সাথে জড়িত রয়েছেন। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা বোলারের মর্যাদাপ্রাপ্ত হয়েছেন। তবে, এ সকল কৃতিত্বের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রাখলেও টেস্ট পর্যায়ে এ ধারা অব্যাহত রাখতে পারেননি।

২০০৮ সালের ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগের উদ্বোধনী আসরে বাংলাদেশের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে অংশ নেন। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের প্রতিনিধিত্ব করেন। তবে, ঐ আসরে কেবলমাত্র একটি খেলায় তাঁকে খেলানো হয়।

সম্পৃক্ত পোস্ট