|

আফতাব আহমেদ

১০ নভেম্বর, ১৯৮৫ তারিখে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার। মূলতঃ ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলতেন। ডানহাতে ব্যাটিং করতেন। এছাড়াও, ডানহাতে মিডিয়াম বোলিংয়ে পারদর্শী ছিলেন। বাংলাদেশের পক্ষে সকল স্তরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।

সীমাহীন প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। কিশোর অবস্থাতে তাঁর অভিষেক হয়, ছন্দহীনতার বাইরে অবস্থানের পূর্বে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটান ও এক পর্যায়ে দল নির্বাচকমণ্ডলীর উপেক্ষার পাত্রে পরিণত হন। বাংলাদেশের সেরা ফিল্ডারদের অন্যতম ছিলেন। ২০০১-০২ মৌসুম থেকে ২০১৪ সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন চলমান রাখেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর বাংলাদেশী ক্রিকেটে চট্টগ্রাম বিভাগ ও পূর্ব অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়াও, চিটাগং কিংস ও ঢাকা ওয়ারিয়র্সের পক্ষে খেলেছেন।

দুইবার আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। তন্মধ্যে, ২০০২ সালের আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মনোরম ৭৯ রানের ইনিংস উপহার দেয়ার মাধ্যমে জাতীয় দল নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে প্রথমবারের মতো দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হন।

পরের বছর প্রস্তুতিমূলক খেলাগুলোয় তেমন ভালো না করলেও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ খেলার উদ্দেশ্যে দলে রাখা হয়। দলে অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে জাতীয় গণমাধ্যমে সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। একদিনের খেলার উপযোগী হিসেবে চিত্রিত করা হয়। তাসত্ত্বেও মাঝে-মধ্যেই বোলিংয়ের মাধ্যমে ব্যাটিংয়ের ঘাটতি পুষিয়ে দিতেন।

২০০৪ থেকে ২০১০ সময়কালে বাংলাদেশের পক্ষে সব মিলিয়ে ১৬ টেস্ট, ৮৫টি ওডিআই ও ১১টি টি২০আইয়ে অংশ নিয়েছিলেন। ১২ সেপ্টেম্বর, ২০০৪ তারিখে বার্মিংহামে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওডিআইয়ে অংশ নেয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে প্রবেশ করেন। একই বছর ২০০৪-০৫ মৌসুমে নিজ দেশে স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের নেতৃত্বাধীন নিউজিল্যান্ডীয় দলের মুখোমুখি হন। ২৬ অক্টোবর, ২০০৪ তারিখে চট্টগ্রামের এম.এ. আজিজ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সফররত নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে তাঁর অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। খেলায় তিনি ২০ ও ২৮ রান সংগ্রহ করেছিলেন। উভয় ইনিংসেই তিনি ড্যানিয়েল ভেট্টোরি’র শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। প্রতিপক্ষীয় অধিনায়ক স্টিফেন ফ্ল্যামিংয়ের অনবদ্য দ্বি-শতকের কল্যাণে ঐ টেস্টে তাঁর দল ইনিংস ও ১০১ রানের ব্যবধানে পরাভূত হলে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়।

২০০৫ সালের শুরুতে ইংল্যান্ড সফরে নিজের সম্ভাবনাকে তুলে ধরতে দল নির্বাচকমণ্ডলীর আস্থা অর্জনে সচেষ্ট হন। চেস্টার-লি-স্ট্রিটে নির্ভিকচিত্তে ৮২ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন। গোটা সফরে অনুষ্ঠিত টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশীদের মধ্যে এ ইনিংসটিই পরবর্তীতে সর্বোচ্চরূপে চিহ্নিত হয়। এছাড়াও, কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একদিনের খেলায় জয়সূচক রান বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম স্বর্ণালী মুহূর্ত উদযাপন করেন। জেসন গিলেস্পি’র বলে চার ও ছক্কা মেরে দলের জয় নিশ্চিত করেন। পাশাপাশি মিডিয়াম পেস বোলার হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ প্রথম বিজয়ের প্রাক্কালে ওডিআইয়ে নিজস্ব প্রথম অর্ধ-শতক হাঁকান। একমাস পর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের ওডিআই সিরিজ নির্ধারণী খেলায় মোহাম্মদ রফিককে সাথে নিয়ে বিরাট ভূমিকা রাখেন। পরিসংখ্যানগতভাবে ২০০৬ সালে নিজের সেরা সময় অতিবাহিত করেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ২০০৭ সালের বিশ্ব টি২০ প্রতিযোগিতায় মোহাম্মদ আশরাফুলকে (৬১) সাথে নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দলকে দুই ওভার বাকী থাকতে ছয় উইকেটে জয় এনে দেন। জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত ঐ খেলায় সাকিব আল হাসানের চার উইকেট লাভের পর তিনি ৬২ রানে অপরাজিত ছিলেন।

৫ নভেম্বর, ২০০৪ তারিখে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে একদিনের আন্তর্জাতিকে বিস্ময়সূচক ৫/৩১ বোলিং পরিসংখ্যান দাঁড় করান। ঢাকায় অনুষ্ঠিত ঐ খেলায় ১৮ বছর ৩৬১ দিন বয়স নিয়ে বৈশ্বিকভাবে পঞ্চম ও বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ বোলার হিসেবে এ কৃতিত্বের অধিকারী হন। বল হাতে নিয়ে এটিই তাঁর প্রথম অংশগ্রহণ ছিল। এরপর থেকে নিয়মিতভাবে বোলিংয়ের সুযোগ পেলেও তেমন সফল হননি।

জানুয়ারি, ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের ৩-২ ব্যবধানে সিরিজ বিজয়ে দূর্দান্ত ভূমিকা রাখেন। সিরিজের চূড়ান্ত খেলায় ৮১* রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেছিলেন। এরপর, রিভারসাইডে অনুষ্ঠিত খেলায় বল প্রতি ৮২ রান সংগ্রহ করেন।

২০০৫-০৬ মৌসুমে নিজ দেশে রিকি পন্টিংয়ের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ১৬ এপ্রিল, ২০০৬ তারিখে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। উভয় ইনিংসে ১৮ রান করে সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ১/২৮ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। জেসন গিলেস্পি’র অসাধারণ দ্বি-শতকের কল্যাণে স্বাগতিক দল ইনিংস ও ৮০ রানে পরাজয়বরণ করলে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়।

২০০৬ সালের শুরুতে কেনিয়ার বিপক্ষে উপর্যুপরী অর্ধ-শতরানের ইনিংস খেলেন। কিন্তু, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নিজেকে মেলে ধরতে ব্যর্থতার পরিচয় দেন। আগস্টে জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়া গমনকালে সকলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলেও নিজেকে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ করতে পারেননি। অক্টোবরে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে জিম্বাবুয়ে ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে এগারো ইনিংসে পাঁচটি অর্ধ-শতক উপহার দেন। ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ব্যক্তিগত সেরা ৯২ রান করেন। তবে, ছন্দহীনতার কবলে পড়লে অস্ট্রেলিয়া সফর থেকে বঞ্চিত হন। পাকিস্তানের বিপক্ষে ০, ০ ও ৩ রান সংগ্রহ করেন। এরপর ২০০৮ সালে অনুমোদনবিহীন ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লীগে অংশ নেয়ার কারণে আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়ী জীবন বেশ হুমকির সম্মুখীন হয় ও দশ বছরের নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েন। অবশ্য এক মৌসুম পর আইসিএল থেকে নিজেকে সরিয়ে আনেন। ফলশ্রুতিতে পুণরায় জাতীয় দলে ফেরার পথ সুগম হয়।

জানুয়ারি, ২০১০ সালে নিজ দেশে ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ত্রি-দেশীয় প্রতিযোগিতায় নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী প্রথম খেলেন। তবে, ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেননি। তাসত্ত্বেও, ২০১০ সালের বিশ্ব টি২০ প্রতিযোগিতায় তাঁকে বাংলাদেশ দলে রাখা হয়। ২০১১ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতার প্রাথমিক তালিকার বাইরে থাকেন।

২০০৯-১০ মৌসুমে নিজ দেশে অ্যালাস্টার কুকের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ দলের মুখোমুখি হন। ১২ মার্চ, ২০১০ তারিখে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত সফররত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ব্যাট হাতে নিয়ে ১ ও ২৬ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/২ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। গ্রায়েম সোয়ানের অল-রাউন্ড নৈপুণ্যে স্বাগতিকরা ১৮১ রানে পরাভূত হলে দুই-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে পিছিয়ে পড়ে। পরবর্তীতে, এটিই তাঁর টেস্টে সর্বশেষ অংশগ্রহণ ছিল।

২৯ বছর পূর্তির পূর্বেই ২৭ আগস্ট, ২০১৪ তারিখে সকল স্তরের ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণের কথা ঘোষণা করেন। এরপর, বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে ক্রিকেট একাডেমি পরিচালনায় অগ্রসর হন। হাবিবুল বাশার সতীর্থ খেলোয়াড়দেরকে নিয়ে সর্বকালের সেরা বাংলাদেশী টেস্ট একাদশ গঠন করেন। তন্মধ্যে, তাঁকেও এ তালিকায় ঠাঁই দিয়েছেন।

সম্পৃক্ত পোস্ট