জুন, ১৯৩৭ তারিখে নরফোকের ব্লোফিল্ড এলাকায় জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার, কোচ ও প্রশাসক ছিলেন। মূলতঃ ব্যাটসম্যান হিসেবে দলে ভূমিকা রেখে গেছেন। বামহাতে ব্যাটিংয়ে দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। এছাড়াও, ডানহাতে মিডিয়াম বোলিং করতেন। অবিচলিত, অটল ও ভীতিহীন চিত্তে বিশ্বের সেরা বোলারদের মুখোমুখি হয়েছেন। ইংল্যান্ডের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছিলেন।
সুপরিচিত পরিবারে তাঁর জন্ম। ‘রানস ইন দ্য ফ্যামিলি’ শীর্ষক ভৌতিক গ্রন্থ প্রকাশ করেন। নরফোক ক্রিকেট পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন। সন্দেহাতীতভাবে ক্রিকেটের সাথে জড়িত বেশ কয়েকজন এডরিচের মধ্যে তিনি সর্বাধিক দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। গুটিয়ে রাখা বামহাতি উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান ছিলেন। তাঁর খেলার ধরন তেমন দর্শনীয় ছিল না। তবে, প্রায়শঃই স্কোরবোর্ডে নিজেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপিত করতেন। তন্মধ্যে, লিডসে সফরকারী নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৫২টি চার ও ৫টি ছক্কায় ৩১০ রানের অপূর্ব ইনিংস উপহার দিয়েছিলেন।
ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর ইংরেজ কাউন্টি ক্রিকেটে সারে দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ১৯৫৬ থেকে ১৯৭৮ সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন অতিবাহিত করেছেন। প্রায়শঃই ইংল্যান্ড দলের পক্ষে ব্যাটিং উদ্বোধনে নামতেন। ইংল্যান্ডের অন্যতম সাহসী ক্রিকেটারের মর্যাদাপ্রাপ্ত হয়েছেন। সারে দলের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজেকে কখনো পিছনে ফিরে নিয়ে যাননি। লড়াকু মানসিকতা নিয়ে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে ৩৯৭৯০ রান তুলেছেন।
১৯৬৩ থেকে ১৯৭৬ সময়কালে ইংল্যান্ডের পক্ষে ৭৭ টেস্ট ও সাতটিমাত্র ওডিআইয়ে অংশ নিয়েছেন। ১৯৬৩ সালে নিজ দেশে ফ্রাঙ্ক ওরেলের নেতৃত্বাধীন ক্যারিবীয় দলের মুখোমুখি হন। ৬ জুন, ১৯৬৩ তারিখে ম্যানচেস্টারে অনুষ্ঠিত সফররত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে তাঁর অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। খেলায় তিনি ২০ ও ১৫ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দীকরণে অগ্রসর হন। ১০ উইকেটে পরাভূত হলে স্বাগতিকরা পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে পিছিয়ে পড়ে।
১৯৬৪ সালে নিজ দেশে বব সিম্পসনের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ২৩ জুলাই, ১৯৬৪ তারিখে ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ডে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের চতুর্থ টেস্টে অংশগ্রহণ করেন। খেলায় তিনি একবার ব্যাট হাতে নিয়ে ৬ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। প্রতিপক্ষীয় অধিনায়ক বব সিম্পসনের ৩১১ রানের বদৌলতে সফরকারীরা ৬৫৬/৮ তুলে ইনিংস ঘোষণা করে। খেলাটি ড্রয়ে পরিণত হলে স্বাগতিকরা পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে।
১৯৬৫ সালে নিজ দেশে জন রিডের নেতৃত্বাধীন কিউই দলের মুখোমুখি হন। ৮ জুলাই, ১৯৬৫ তারিখে লিডসে অনুষ্ঠিত সফররত নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। কয়েকটি ব্যক্তিগত সাফল্যের সন্ধান পান। প্রথম ইনিংসে ব্যক্তিগত পূর্বতন সর্বোচ্চ ১২০ রান অতিক্রম করেন। এ পর্যায়ে ১৬০ রানে পৌঁছানোকালে টেস্টে ৫০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। খেলায় তিনি দলের একমাত্র ইনিংসে ৩১০* রান সংগ্রহ করেছেন। দ্বিতীয় উইকেটে কেন ব্যারিংটনের (১৬৩) সাথে ৩৬৯ রানের জুটি গড়েন। স্বাগতিকরা ইনিংস ও ১৮৭ রানে জয় পেলে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজে জয়লাভ করে।
একই বছর নিজ দেশে পিটার ফন ডার মারউই’র নেতৃত্বাধীন স্প্রিংবকের মুখোমুখি হন। ২২ জুলাই, ১৯৬৫ তারিখে লর্ডসে অনুষ্ঠিত সফররত দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ঘটনাবহুল এ টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যক্তিগত ৭ ও দলীয় সংগ্রহ ৩৭/১ থাকাকালে আঘাতের কবলে পড়েন। খেলায় তিনি লাভ করেন। এছাড়াও, ব্যাট হাতে নিয়ে ৩ ও ০* রান সংগ্রহ করেছিলেন। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি ফলাফলবিহীন অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।
১৯৬৫-৬৬ মৌসুমে মাইক স্মিথের নেতৃত্বাধীন এমসিসি দলের সদস্যরূপে অস্ট্রেলিয়া গমন করেন। ১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৬ তারিখে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্ট খেলেন। খেলায় তিনি ৮৫ ও ৩ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। ‘বব কাউপারের টেস্ট’ নামে পরিচিত খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে সিরিজটি ১-১ ব্যবধানে শেষ হয়।
একই মৌসুমে প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট খেলেন। ঐ মৌসুমে মাইক স্মিথের নেতৃত্বাধীন এমসিসি দলের সদস্যরূপে নিউজিল্যান্ড সফরে যান। ২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৬ তারিখে ক্রাইস্টচার্চে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি উভয় ইনিংসে ২ রান করে সংগ্রহ করেছিলেন। খেলাটি ড্রয়ে পরিণত হলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।
১৯৬৭ সালে নিজ দেশে মনসুর আলী খান পতৌদি’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের মুখোমুখি হন। ৮ জুন, ১৯৬৭ তারিখে লিডসে অনুষ্ঠিত সফররত ভারতের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ১ ও ২২ রান সংগ্রহ করেছিলেন। ৬ উইকেটে জয়লাভ করলে স্বাগতিকরা তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।
১৯৬৯ সালে নিজ দেশে গ্রাহাম ডাউলিংয়ের নেতৃত্বাধীন কিউই দলের মুখোমুখি হন। ২৪ জুলাই, ১৯৬৯ তারিখে লন্ডনের লর্ডসে অনুষ্ঠিত সফররত নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ১৬ ও ১১৫ রান সংগ্রহ করেছিলেন। স্বাগতিকরা ২৩০ রানে জয় পেলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।
উচ্চতর স্তরের ক্রিকেটে ৪৩.৫৪ গড়ে পাঁচ সহস্রাধিক রান তুলেছেন। বিশেষতঃ অফ-সাইডে স্কয়ার অঞ্চলে খেলতেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। ক্রিজে আক্রমণাত্মক ধাঁচে অসীম সাহসিকতা নিয়ে ভূমিকা রাখতেন। একাধিকবার বিপজ্জ্বনকভাবে আহত হয়েছেন। লর্ডসে পিটার পোলকের বলে মাথায় আঘাত পান। কপালে আঘাত পেয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়েন। নয় বছর পর এসসিজিতে ডেনিস লিলি’র বলে দুই পাঁজর ভেঙ্গে যায়। এমনকি, ৩৯ বছর বয়সে নিজের শেষ টেস্টেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বডিলাইন বোলিংয়ের প্রায় কাছাকাছিমানের মাইকেল হোল্ডিং ও তাঁর সহযোগীদের বোলিংয়ের বিপক্ষে ওল্ড ট্রাফোর্ডে ইনিংস উদ্বোধনে নামেন। ব্যর্থ হননি। কার্যকর ও ফলপ্রসূতার সাথে অত্যন্ত সতকর্তার সাথে খেলেছিলেন।
অ্যাশেজের প্রাচীন প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে খেলতেই অধিক পছন্দ করতেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চমৎকার রেকর্ড গড়েছেন। ১৯৭০-৭১ মৌসুমের অ্যাশেজ সফরে বিজয়ী দলের সদস্যরূপে ৭২.০০ গড়ে ৬৪৮ রান সংগ্রহ করেছিলেন।
১৯৭২ সালে নিজ দেশে ইয়ান চ্যাপেলের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ১৩ জুলাই, ১৯৭২ তারিখে নটিংহামে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় টেস্ট খেলেন। খেলায় তিনি ৩৭ ও ১৫ রান সংগ্রহ করেছিলেন। খেলাটি ড্রয়ে পরিণত হলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি ১-১ ব্যবধানে অগ্রসর হতে থাকে।
১৯৭৪-৭৫ মৌসুমে মাইক ডেনিসের নেতৃত্বাধীন এমসিসি দলের অন্যতম সদস্যরূপে নিউজিল্যান্ড গমন করেন। ২০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৫ তারিখে অকল্যান্ডে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সফলতার ছাঁপ রাখেন। প্রথম ইনিংসে ১০ রানে পৌঁছানোকালে টেস্টে ৪৫০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। খেলায় তিনি দলের একমাত্র ইনিংসে ৬৪ রান সংগ্রহসহ দুইটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। সফরকারীরা ইনিংস ও ৮৩ রানে জয় পেলে দুই-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।
১৯৭৫ সালে নিজ দেশে ইয়ান চ্যাপেলের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ৩১ জুলাই, ১৯৭৫ তারিখে লন্ডনের লর্ডসে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ৯ ও ১৭৫ রান সংগ্রহ করেছিলেন। খেলাটি ড্রয়ে পরিণত হলে স্বাগতিকরা চার-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে।
১৯৭৬ সালে নিজ দেশে ক্লাইভ লয়েডের নেতৃত্বাধীন ক্যারিবীয় দলের মুখোমুখি হন। ৮ জুলাই, ১৯৭৬ তারিখে ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ডে অনুষ্ঠিত সফররত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ব্যাট হাতে নিয়ে ৮ ও ২৪ রান সংগ্রহ করেছিলেন। খেলায় সফরকারীরা ৪২৫ রানে জয় পেলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। পরবর্তীতে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।
প্রায় ১৫ বছর সারে দলের পক্ষে খেলেছেন। ১০৩টি শতরানের ইনিংস খেলে শততম শতকধারীদের অভিজাত তালিকায় নিজেকে যুক্ত করেন। একবার রান খরার কবলে পড়লে ‘বিশ হাজার’ রান সংগ্রহের কথা শুনে তিনি ‘তেমন বাজে খেলোয়াড় নন’ বলে মন্তব্য করেন। খেলোয়াড়ী জীবন শেষে এ সংখ্যাকে ৪৫.৪৭ গড়ে প্রায় দ্বিগুণ ৩৯৭৪০ রানে নিয়ে যান।
ক্রিকেট খেলা থেকে অবসর গ্রহণের পর প্রশাসনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ১৯৮১ সালে ইসিবি’র দল নির্বাচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ১৯৯৫ সালে ইংল্যান্ড দলের ব্যাটিং কোচ হিসেবে মনোনীত হন। পরবর্তীতে, ২০০৬-০৭ মৌসুমে সারে ক্রিকেট ক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালে ক্রিকেটে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এমবিই উপাধীতে ভূষিত করা হয়। তাঁর সম্মানার্থে ওভালের একটি প্রবেশদ্বারের নামকরণ করা হয় ও তিনি তা উন্মোচন করেন। ২৩ ডিসেম্বর, ২০২০ তারিখে নর্থ স্কটল্যান্ডে ৮৩ বছর ১৮৫ দিন বয়সে তাঁর দেহাবসান ঘটে।
