২০ ডিসেম্বর, ১৯৮২ তারিখে পাঞ্জাবের শেখুপুরায় জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার। মূলতঃ বোলার হিসেবে দলে ভূমিকা রেখে গেছেন। ডানহাতে ফাস্ট-মিডিয়াম বোলিং করতেন। এছাড়াও, বামহাতে নিচেরসারিতে ব্যাটিংয়ে নামতেন। পাকিস্তানের পক্ষে সকল স্তরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।
খুব স্বল্পসংখ্যক পাকিস্তানী ফাস্ট বোলারদের অন্যতম হিসেবে তিনি বেশ দূরন্ত গতিবেগে ও চটপটে ভঙ্গীমায় বোলিং করতে পারতেন। পাশাপাশি মাঠের বাইরে কেলেঙ্কারী ও বিতর্কের সাথেও নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। কিন্তু, কোন ক্ষেত্রেই তাঁকে ক্রিকেট জগতে খুব সহজে সমৃদ্ধতর করতে পারেনি। ২০০০-০১ মৌসুম থেকে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন চলমান রাখেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর পাকিস্তানী ক্রিকেটে খান রিসার্চ ল্যাবরেটরিজ, লাহোর ডিভিশন, পাকিস্তান ন্যাশনাল ব্যাংক, শেখুপুরা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন ও শিয়ালকোট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন এবং ইংরেজ কাউন্টি ক্রিকেটে লিচেস্টারশায়ারের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়াও, এশিয়া একাদশ ও দিল্লি ডেয়ারডেভিলসের পক্ষে খেলেছেন।
কব্জির মোচড়ের যাদুকরী মহিমা, পেস তেমন প্রভাব ফেলতে না পারলেও বলে নিখুঁতভাব বজায় রাখাসহ কাট আনয়ণ নিয়মিতভাবে করতে পারতেন। দীর্ঘদেহী ও শীর্ণকায় গড়নের অধিকারী হিসেবে এসব গুণাবলীর সাথে বাউন্স যোগ করে সহজাত ভঙ্গীমায় দীর্ঘ সময় ধরে বোলিং করতে পারতেন। সহজ ভঙ্গীমায় ও সহজতর দৌঁড়ুনোয় ব্যাটসম্যানদের তেমন দুঃশ্চিন্তা করতে দেখা যায়নি।
ক্যান্ডি, করাচী, ওভাল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও সিডনিতে সবমিলিয়ে তেমন উচ্চমানসম্পন্ন না হলেও পাকিস্তানের সাফল্যে বিরাট ভূমিকা পালন করতো। তাসত্ত্বেও, চিরতরুণ, ছোট্ট শহর থেকে আসলেও বড় শহরের আলোর ঝলকানীতে খ্যাতি পেয়েছিলেন।
২০০৫ থেকে ২০১০ সময়কালে পাকিস্তানের পক্ষে সর্বমোট ২৩ টেস্ট, ৩৮টি ওডিআই ও ১১টি টি২০আইয়ে অংশ নিয়েছেন। ২০০৪-০৫ মৌসুমে মোহাম্মদ ইউসুফের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানী দলের সাথে অস্ট্রেলিয়া গমন করেন। ২ জানুয়ারি, ২০০৫ তারিখে ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া সিরিজে অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। সিডনিতে অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐ খেলায় তেমন সুবিধে পাননি। ০/৭২ ও ০/১৬ বোলিং পরিসংখ্যান গড়েন। তবে, স্টুয়ার্ট ম্যাকগিলের অসামান্য বোলিংশৈলীর কল্যাণে ঐ খেলায় সফরকারীরা নয় উইকেটে পরাভূত হয় ও ৩-০ ব্যবধানে সিরিজে পরাজয়বরণ করে। তবে, ডিসেম্বর পর্যন্ত দলের বাইরে ছিলেন।
নভেম্বর, ২০০৫ তারিখে এ স্তরের ক্রিকেটে অংশ নেন। প্রস্তুতিমূলক খেলায় পাকিস্তান ‘এ’ দলের সদস্যরূপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৭/৬২ ও ৩/৪৪ নিয়ে দলের বিজয়ে অংশ নেন। টেস্ট দলে তাঁকে রাখা হয়নি। তৃতীয় টেস্ট যুক্ত করা হলেও প্রথম একাদশের বাইরে ছিলেন। ৩০ নভেম্বর, ২০০৫ তারিখে লিচেস্টারশায়ারের পক্ষে ২০০৬ মৌসুমের খেলায় অংশগ্রহণকল্পে চুক্তিবদ্ধ হন।
২১ ডিসেম্বর, ২০০৫ তারিখে ওডিআই অভিষেক পর্বটি তুলনামূলকভাবে শ্রেয়তর ছিল। রাওয়ালপিন্ডিতে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের পঞ্চম ওডিআইয়ের প্রথম ওভারেই মার্কাস ট্রেসকোথিককে বিদেয় করেন। সাত ওভারে ২/১৪ বোলিং পরিসংখ্যান গড়লেও পাকিস্তান পরাজিত হয়
দ্বিতীয় দলে অংশগ্রহণের সুযোগ পান ও একই মানের ফলাফল করেন। ২১ জানুয়ারি, ২০০৬ তারিখে ফয়সালাবাদে অনুষ্ঠিত টেস্টে ভারতের মুখোমুখি হন। ১/১০৩ বোলিং পরিসংখ্যান গড়লে ভারতের সংগ্রহ ৬০৩ রানের বিপরীতে পাকিস্তান ৫৮৮ রান তুলেছিল। ২৯ জানুয়ারি, ২০০৬ তারিখে অনুষ্ঠিত করাচী টেস্টে ঘুরে দাঁড়ান। ইরফান পাঠানের হ্যাট্রিক সত্ত্বেও কামরান আকমলের যোগ্য সাহচর্য্যে ৪/৭৮ ও ৩/৪৮ বোলিং পরিসংখ্যান গড়ে দলকে ৩৪১ রানে জয়লাভ করতে ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে মন্তব্য করেন যে, রাহুল দ্রাবিড়ের ন্যায় ব্যাটসম্যানের বিপক্ষে বোলিং করতেই তিনি অধিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে থাকেন।
২০০৫-০৬ মৌসুমে ইনজামাম-উল-হকের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানী দলের সাথে শ্রীলঙ্কা গমন করেন। পুরো সিরিজে অসাধারণত্বের পরিচয় দেন। ৩ এপ্রিল, ২০০৬ তারিখে ক্যান্ডিতে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। ৬/৪৪ ও ৫/২৭ বোলিং পরিসংখ্যান গড়ে ১০৯ রানে পিছিয়ে থেকেও দলকে জয় এনে দেন। তাঁর দূরন্ত বোলিংশৈলীর কল্যাণে স্বাগতিক দল ৮ উইকেটে জয় পায় ও ১-০ ব্যবধানে সফরকারীরা সিরিজে বিজয়ী হয়। খেলায় তিনি ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার পান। এছাড়াও, এ সিরিজে ১৭ উইকেট নিয়ে ম্যান অব দ্য সিরিজের পুরস্কার লাভ করেন।
জুন, ২০০৬ সালে আঘাতের কবলে পড়েন। কনুইয়ের আঘাতে ইংল্যান্ড সফরে সিরিজের প্রথম তিন টেস্ট খেলতে পারেননি। ওভালের চতুর্থ টেস্টে খেলেন ও অন্যতম বিতর্কিত কুখ্যাত ঘটনার সাথে নিজেকে যুক্ত করেন।
দুইবার স্টেরয়েড পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হন। ১৬ অক্টোবর, ২০০৬ তারিখে শোয়েব আখতারের সাথে মাদক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। পিসিবি কর্তৃক অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় ন্যান্ড্রোলোন গ্রহণের দায়ে নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েন। তাঁদেরকে পাকিস্তানে ফেরৎ পাঠানোয় ভারতে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেননি। তবে, তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে মন্তব্য করেন যে কোন রকমের খেলায় প্রভাববিস্তারকারী মাদক গ্রহণ করেননি।
১১ জানুয়ারি, ২০০৭ তারিখে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে এসে দূর্দান্ত সূচনা ঘটান। সেঞ্চুরিয়নে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অনুষ্ঠিত টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৫/৮৩ বোলিং পরিসংখ্যান গড়েন। দ্বিতীয় ইনিংসে ২/৫৬ লাভ করলেও ১৯৯ রানের জয়ের লক্ষ্যমাত্রা খুব সহজেই প্রতিপক্ষ দল টপকে যায়। ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ তারিখে পুণরায় মাদক গ্রহণের পর্বে নাটকীয়তা যুক্ত হয়। বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় পাকিস্তান দলে যুক্ত হন। তবে, মাদক গ্রহণের বিষয়ে ধুয়াসার সৃষ্টি হয়।
১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ তারিখে পিসিবি আরও একবার অভ্যন্তরীণ মাদক গ্রহণের পরীক্ষায় অভিযুক্ত হন। ন্যান্ড্রোলোন গ্রহণের কারণে নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েন, পাশাপাশি আঘাত লাভও। ৪ আগস্ট, ২০০৭ তারিখে করাচীতে শারীরিক সুস্থতা ও প্রশিক্ষণ শিবিরে পরিচালিত মাদক পরীক্ষায় মুক্তি পান। ৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৭ তারিখে শোয়েব আখতার তাঁকে আঘাত করেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় আইসিসি বিশ্ব টি২০ প্রতিযোগিতায় অনুশীলনীকালে বাম উরুতে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে এ ঘটনা ঘটে। চারদিন পর তিনি জানান যে, খুবই ছোট্ট ঘটনায় ও কোন কারণ ছাড়াই শোয়েব আখতারকে ব্যাট দিয়ে আঘাত করেছিল। অক্টোবর, ২০০৭ সালে কনুইয়ের আঘাতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নিজ দেশে অনুষ্ঠিত পাঁচ-ওডিআই নিয়ে গড়া সিরিজের চার খেলায় অংশ নিতে পারেননি। পরের মাসে ভারত সফরে যাননি।
এরপর, ৩ জুন, ২০০৮ তারিখে দুবাই বিমানবন্দরে বিনোদনধর্মী মাদক বহনে ধরা পড়েন ও তিন সপ্তাহ কারাবন্দী হন। পরীক্ষার জন্যে মাদক পাঠানো হলেও পরবর্তীতে তা কি ধরনের পদার্থ ছিল তা জানা যায়নি।
২০০৯-১০ মৌসুমে মোহাম্মদ ইউসুফের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানী দলের সদস্যরূপে প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ড সফরে যান। ৩ ডিসেম্বর, ২০০৯ তারিখে ওয়েলিংটনের বেসিন রিজার্ভে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অংশ নেন। অসাধারণ ক্রীড়াশৈলীর স্বাক্ষর রাখেন। ৪/৪০ ও ৫/৬৭ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। ৪ ও ০* রান সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁর অনবদ্য বোলিংশৈলীর কল্যাণে স্বাগতিকরা ১৪১ রানে পরাজিত হলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে। খেলায় তিনি ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার লাভ করেন।
২০১০ সালে সালমান বাটের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানী দলের সাথে ইংল্যান্ড গমন করেন। ২৬ আগস্ট, ২০১০ তারিখে লন্ডনের লর্ডসে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের চতুর্থ টেস্টে অংশ নেন। ১/৯৭ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তবে, স্টুয়ার্ট ব্রডের অসামান্য অল-রাউন্ড নৈপুণ্যে স্বাগতিকরা ইনিংস ও ২২৫ রানে জয় পায়। পাশাপাশি, সফরকারীরা ৩-১ ব্যবধানে সিরিজে পরাজিত হয়।
২০১০ সালে পূর্বপরিকল্পনামাফিক নো-বল ছুঁড়ে পাতানো খেলায় সম্পৃক্ত হবার বিষয়ে অভিযোগের কবলে পড়েন। ফেব্রুয়ারি, ২০১১ সালে আইসিসি থেকে দুই বছরের সাময়িক নিষেধাজ্ঞাসহ সাত বছরের নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েন। এ সকলের অভিযোগের সাথে জড়িয়ে পড়ার সুবাদে অক্টোবরে লন্ডনভিত্তিক সাউদওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টে যেতে হয়। ১ নভেম্বর তারিখে প্রতারণা ও অবৈধ অর্থ গ্রহণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। অতঃপর এক বছর হাজতবাস করেন।
এপ্রিলে ক্রীড়া আদালতে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ কমানোর বিষয়ে আবেদন করলেও তা নাকচ হয়ে যায়। এ পর্যায়ে আগস্ট, ২০১৩ সালে পাতানো খেলায় সম্পৃক্ততায় যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করেন। ৮ নভেম্বর, ২০২০ তারিখে ঘোষিত শতাব্দীর সেরা বলের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকেন। ভিভিএস লক্ষ্মণের বিপক্ষে বলটি করেছিলেন।
