২ জুন, ১৮৬৫ তারিখে লন্ডনের কেনসিংটনে জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত ক্রিকেটার ছিলেন। দলে মূলতঃ বোলার হিসেবে খেলতেন। ডানহাতে মিডিয়াম-ফাস্ট বোলিংয়ের পাশাপাশি ডানহাতে নিচেরসারিতে ব্যাটিংয়ে নামতেন। ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম সেরা বোলার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন। ইংল্যান্ডের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছিলেন।
জর্জ স্টুয়ার্ট কান্ডেল লোহমান ও ফ্রান্সেস ওয়াটলিং দম্পতির তিন পুত্র ও দুই কন্যা সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন। দুই বছর বয়সে পরিবারের সাথে ক্ল্যাপহাম কমন এলাকায় চলে যায়। সেখানে তিনি চার্চ ইনস্টিটিউট ক্লাবের পক্ষে খেলতে শুরু করেন। ক্লাবের এগারো ও তেরো বছর বয়সীদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সেরা ব্যাটসম্যান ও বোলার হিসেবে বিবেচিত হন। ওয়ান্ডসওয়ার্থভিত্তিক ল্যুভেইন স্কুলে পড়াশুনো শেষে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে কাজ করেন। তবে, সারের ব্যাটসম্যান ডব্লিউ. ডব্লিউ. রিড ক্রিকেটার হিসেবে তাঁকে চিহ্নিত করেন। ১৮৮৪ সালে ওভালের মাঠকর্মী হিসেবে পেশাদারী পর্যায়ে যোগ দেন।
১৮৮৪ থেকে ১৮৯৬-৯৭ মৌসুম পর্যন্ত সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন অতিবাহিত করেছেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর ইংরেজ কাউন্টি ক্রিকেটে সারে ও দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটে ওয়েস্টার্ন প্রভিন্স দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ৩০ মে, ১৮৮৪ তারিখে সারের সদস্যরূপে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে তাঁর অভিষেক হয়। তবে, জুনের মাঝামাঝি সময়ে ইংল্যান্ডের প্রধান ব্যাটসম্যান ডব্লিউ. জি. গ্রেসকে বিদেয় করে নিজের প্রথম উইকেটের সন্ধান পান। ১৮৮৫ সালে সারের প্রথম খেলার জন্যে মনোনীত হন। এরপর থেকে ১৮৯২ সাল পর্যন্ত দলের নিয়মিত সদস্যের মর্যাদা পান। এ আট বছরে সারে দল ছয়বার কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশীপের শিরোপা জয় করে। তন্মধ্যে, তিনি ১৪১৫ উইকেট দখল করেছিলেন। পেস পরিবর্তন করে ডানহাতে মিডিয়াম-পেস বোলারে পরিণত হন। স্লিপ অঞ্চলে দারুণ ফিল্ডিং করতেন। এছাড়াও, নিচেরসারিতে মারকুটে ব্যাটিংয়ে পারদর্শী ছিলেন।
সব মিলিয়ে ১৮৮৬ থেকে ১৮৯৬ সময়কালে ইংল্যান্ডের পক্ষে সর্বমোট আঠারো টেস্টে অংশ নিয়েছিলেন। প্রাপ্ত ১১২ উইকেট লাভে তিনি মাত্র ১০.৭৫ রান খরচ করেছিলেন। তন্মধ্যে, নয়বার ইনিংসে পাঁচ-উইকেট লাভ করেছেন। ব্যক্তিগত সেরা বোলিং করেন ৯/২৮ ও খেলায় ৪৫ রান খরচায় ১৫ উইকেট পেয়েছিলেন। ১৮৮৬ সালে নিজ দেশে টাপ স্কটের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ৫ জুলাই, ১৮৮৬ তারিখে ম্যানচেস্টারে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে তাঁর অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ৩২ রান সংগ্রহসহ তিনটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। এছাড়াও, ১/৪১ ও ০/১৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। স্বাগতিকরা ৪ উইকেটে জয় পেলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।
একই সফরের ১২ আগস্ট, ১৮৮৬ তারিখে লন্ডনের ওভালে অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। অসাধারণ ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শনে অগ্রসর হন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ৭/৩৬ ও ৫/৬৮ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ৭ রান সংগ্রহ করেছিলেন। স্বাগতিকরা ইনিংস ও ২১৭ রানে জয় পেলে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়।
১৮৮৬-৮৭ মৌসুমে আর্থার শ্রিউসবারি’র নেতৃত্বাধীন এমসিসি দলের সদস্যরূপে অস্ট্রেলিয়া গমন করেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৮৮৭ তারিখে সিডনিতে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত টেস্ট খেলেন। অসাধারণ ক্রীড়া নৈপুণ্যের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। ঘটনাবহুল ঐ টেস্টে ইতিহাসের প্রথম বোলার হিসেবে এক ইনিংসে আট-উইকেট লাভ করেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ৮/৩৫ ও ২/৫২ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, ২ ও ৬ রান সংগ্রহ করে উভয় ক্ষেত্রে জে.জে. ফেরিসের শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। সফরকারীরা ৭১ রানে জয় পেলে ২-০ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়।
১৮৮৭-৮৮ মৌসুমে আলফ্রেড শ’ ও আর্থার শ্রিউসবারি’র নেতৃত্বাধীন এমসিসি দলের সাথে অস্ট্রেলিয়া গমন করেন। ১০ ফেব্রুয়ারি, ১৮৮৮ তারিখে সিডনিতে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের একমাত্র টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ৫/১৭ ও ৪/৩৫ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, ১২ ও ০ রান সংগ্রহ করেছিলেন। স্বাগতিকরা ১২৬ রানে পরাভূত হয়।
১৮৯১-৯২ মৌসুমে ডব্লিউজি গ্রেসের নেতৃত্বাধীন এমসিসি দলের অন্যতম সদস্যরূপে অস্ট্রেলিয়া গমন করেন। ২৯ জানুয়ারি, ১৮৯২ তারিখে সিডনিতে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ১০ ও ১৫ রান সংগ্রহ করে উভয় ইনিংসে জর্জ গিফেনের শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ৮/৫৮ ও ২/৮৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। ৭২ রানে জয় পেলে স্বাগতিকরা তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
১৮৯৫-৯৬ মৌসুমে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্ট খেলেন। ঐ মৌসুমে লর্ড হকের নেতৃত্বাধীন এমসিসি দলের সদস্যরূপে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৬ তারিখে পোর্ট এলিজাবেথের জিকিবার্হায় অনুষ্ঠিত স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। কয়েকবার ব্যক্তিগত সফলতার ছাঁপ রাখেন। দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যক্তিগত সেরা বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এ পর্যায়ে কুক, মিডলটন ও যোসেফ উইলোবিকে উপর্যুপরী বিদেয় করে হ্যাট্রিক লাভ করেন। তাঁর পূর্বেকার সেরা ছিল ৮/৩৫। যোসেফ উইলোবিকে জোড়া শূন্য রানে বিদেয় করেন। খেলায় তিনি ৭/৩৮ ও ৮/৭ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, ব্যাট হাতে নিয়ে উভয় ইনিংসে যোসেফ উইলোবি’র বলে শূন্য রানে বিদেয় নিয়েছিলেন। পাশাপাশি, একটি ক্যাচ তালুবন্দীকরণে অগ্রসর হন। খেলায় তাঁর দল ২৮৮ রানে জয়লাভ করলে সিরিজে এগিয়ে যায়। স্মর্তব্য যে, ১৯৫৪-৫৫ মৌসুমে নিউজিল্যান্ড দলের সর্বনিম্ন ২৬ রান সংগ্রহের পূর্ব-পর্যন্ত দ্বিতীয় ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকা দল ৯৪ বলে মাত্র ৩০ রান সংগ্রহের রেকর্ড গড়ে।
এরপর, ২ মার্চ, ১৮৯৬ তারিখে জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা একাদশের বিপক্ষে খেলেন। পরবর্তীতে খেলাটি টেস্টের মর্যাদা পায়। বেশ কয়েকবার ব্যক্তিগত সাফল্যের সন্ধান পান। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম ইনিংসে সিবি লিউইলিনকে বিদেয় করে ব্যক্তিগত সেরা বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তাঁর পূর্বেকার সেরা ছিল ৮/৭। এ পর্যায়ে প্রথম বোলার হিসেবে টেস্টের এক ইনিংসে ৯ উইকেট লাভের কৃতিত্ব প্রদর্শনে করেন। এরপর, দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বিতীয় ইনিংসে জিএইচ শেপস্টোনের দ্বিতীয় উইকেট লাভ করে টেস্টে ১০০ উইকেট লাভের মাইলফলক স্পর্শ করেন। বল হাতে নিয়ে ৯/২৮ ও ৩/৪৩ পান। এছাড়াও, একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ২ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। সফরকারীরা ইনিংস ও ১৯৭ রানে জয়লাভ করলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
একই সফরের ২১ মার্চ, ১৮৯৬ তারিখে কেপটাউনে অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ৭/৪২ ও ১/৪৫ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, দলের একমাত্র ইনিংসে ব্যাট হাতে নিয়ে ৮ রান সংগ্রহ করেছিলেন। খেলায় তাঁর দল ইনিংস ও ৩৩ রানে জয়লাভ করলে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়। পুরো সিরিজে অসাধারণত্বের পরিচয় দেন। এ সিরিজে মাত্র ৫.৮ গড়ে ৩৫ উইকেট দখল করেছিলেন।
১৮৯৬ সালে নিজ দেশে হ্যারি ট্রটের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ২২ জুন, ১৮৯৬ তারিখে লন্ডনের লর্ডসে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ৩/১৩ ও ০/৩৯ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করেছিলেন। এছাড়াও, একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ১ রান সংগ্রহসহ সমসংখ্যক ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। স্বাগতিকরা ৬ উইকেটে জয়লাভ করলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়। পরবর্তীতে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়। এ পর্যায়ে নিজের শেষ টেস্ট শেষে ১৮ খেলায় ১০.৭৫ গড়ে ১১২ উইকেট দখল করেছিলেন। ২৫ বা এরচেয়ে অধিক উইকেট সংগ্রাহকের গড়ের দিক রেকর্ড গড়েন। পাশাপাশি, নিয়মিতভাবে উইকেট লাভকারীদের মধ্যে প্রতি ৩৪ বল থেকে উইকেট লাভের রেকর্ডের শীর্ষে রয়েছেন।
তবে, ১০ আগস্ট, ১৮৯৬ তারিখে লন্ডনের ওভালে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেননি। ঘটনাবহুল এ টেস্টে অংশগ্রহণের পূর্বে ম্যাচ ফি’র বিষয়ে আর্থিক মতানৈক্য ঘটায় পাঁচজন খেলোয়াড়ের অন্যতম হিসেবে খেলা থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দেন। ববি অ্যাবেল, টম হেওয়ার্ড ও টম রিচার্ডসন পরবর্তীতে খেলায় অংশ নিলেও বিলি গানের সাথে তিনি খেলতে অস্বীকৃতি জানান। ৬৬ রানে পরাভূত হলেও স্বাগতিকরা ২-১ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়।
সর্বশেষ টেস্ট খেলার পাঁচ বছরেরও কম সময়ে অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে ১ ডিসেম্বর, ১৯০১ তারিখে দক্ষিণ আফ্রিকার ওরচেস্টার এলাকায় মাত্র ৩৬ বছর ১৮২ দিন বয়সে তাঁর দেহাবসান ঘটে। ২০১৬ সালে কারেন রোল্টন, মুত্তিয়া মুরালিধরন ও আর্থার মরিসের সাথে তাঁকে আইসিসি ক্রিকেট হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
