২১ নভেম্বর, ১৮৭০ তারিখে ইয়র্কশায়ারের অ্যালার্টন হল এলাকায় জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত ক্রিকেটার ও রাজনীতিবিদ ছিলেন। দলে মূলতঃ অল-রাউন্ডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ডানহাতে ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ডানহাতে ফাস্ট-মিডিয়াম বোলিং করতেন। ইংল্যান্ড দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন।
উইলিয়াম লয়িস জ্যাকসন ও গ্রেস দম্পতির সন্তান ছিলেন। শৈশবকাল থেকেই ক্রিকেটের প্রতি তাঁর দূর্নিবার আকর্ষণ জন্মায়। হ্যারোতে বিদ্যালয় জীবন শেষ করার পর ১৮৯৩ সালে কেমব্রিজের অধীন ট্রিনিটি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। দর্শনীয় ক্রিকেটার হিসেবে সুনাম কুড়ান। দূর্দান্ত ব্যাটিংয়ের সাথে সেরা বোলারের অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন নিজেকে। ‘জ্যাকার’ ডাকনামে পরিচিত ছিলেন। ইংল্যান্ডের পক্ষে বিশাল সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। তাঁর অসাধারণ ক্রীড়াশৈলীর উপর খেলার গুরুত্বতা নির্ভর করতো।
১৮৯০ থেকে ১৯০৭ সাল পর্যন্ত প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন অতিবাহিত করেছেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর ইংরেজ কাউন্টি ক্রিকেটে ইয়র্কশায়ারের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়াও, হ্যারো ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে খেলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলায় বিস্ময়কর খেলা উপহার দিয়েছিলেন। ১৮৮৮ সালে এটন-হ্যারোর খেলায় তাঁর মাঝে প্রথমবারের মতো প্রতিশ্রুতিশীলতার ছাঁপ লক্ষ্য করা যায়। ৮০ রান সংগ্রহের পাশাপাশি খেলায় ৬৮ রান খরচায় এগারো উইকেট দখল করেছিলেন। কেমব্রিজ থেকে ব্লু লাভ করেন। ১৮৯২ ও ১৮৯৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন।
১৮৯৩ থেকে ১৯০৫ সময়কালে ইংল্যান্ডের পক্ষে সর্বমোট ২০ টেস্টে অংশ নিয়েছিলেন। ৪৮ গড়ে ১৪১২ রান সংগ্রহ করেছিলেন। ১৮৯৩ সালে নিজ দেশে জ্যাক ব্ল্যাকহামের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ১৭ জুলাই, ১৮৯৩ তারিখে লন্ডনের লর্ডসে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্ট খেলেন। আর্থার মোল্ড, টেড ওয়েনরাইট ও বিল লকউডের সাথে তাঁর একযোগে টেস্ট অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। খেলায় তিনি ৯১ ও ৫ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/১০ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি ফলাফলবিহীন অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।
ওভাল টেস্টে নিজস্ব প্রথম শতক হাঁকান। তাঁর অধিনায়কত্বে ১৯০৫ সালে ইংল্যান্ড দল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জয় করে।
১৮৯৯ সালে নিজ দেশে জো ডার্লিংয়ের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ১৪ আগস্ট, ১৮৯৯ তারিখে লন্ডনের ওভালে অনুষ্ঠিত সফররত অজি দলের বিপক্ষে সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ১১৮ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। এছাড়াও, ০/৩৯ ও ০/৫৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালেও সফরকারীরা ১-০ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়।
১৯০২ সালে নিজ দেশে জো ডার্লিংয়ের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ২৪ জুলাই, ১৯০২ তারিখে ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ডে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের চতুর্থ টেস্টে অংশ নেন। খ্যাতনামা ঐ টেস্টে তাঁর দল অজিদের কাছে নাটকীয়ভাবে মাত্র ৩ রানে পরাজয়বরণ করলে স্বাগতিকরা পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে। খেলায় তিনি ১২৮ ও ৭ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/৫৮ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান।
১৯০৫ সালে নিজ দেশে জো ডার্লিংয়ের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ১৪ আগস্ট, ১৯০৫ তারিখে লন্ডনের ওভালে অনুষ্ঠিত সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। অধিনায়কের দায়িত্বে থেকে ৭৬ ও ৩১ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ১/২৭ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে সফরকারীরা ২-০ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়। পরবর্তীতে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।
তাঁর অধিনায়কত্বে ১৯০৬ সালে অস্ট্রেলিয়া কিংবা ১৯০৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ইংল্যান্ড দল কোন খেলায় পরাজয়বরণ করেনি। ১৯০৫ সালে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
১৮৯৪ সালে উইজডেন কর্তৃক অন্যতম বর্ষসেরা ক্রিকেটারের সম্মাননাপ্রাপ্ত হন। ক্রিকেট খেলা থেকে অবসর গ্রহণের পর ক্লাবের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯২১ সালে মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৪৩ সালে এমসিসি কর্তৃক বিশেষ কমিটির সভাপতির হিসেবে মনোনীত হন। এছাড়াও, খেলার নিয়ম পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।
রাজনীতিতে জড়িয়ে যাবার কারণে তাঁর ক্রিকেট খেলোয়াড়ী জীবন সংক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। লিডসের সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী পিতার সাহচর্য্যে রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯১৫ সালে ইয়র্কশায়ারের হাউডেনশায়ার নির্বাচনী এলাকা থেকে কমন্স সভায় কনজারভেটিভ হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯২৬ সাল পর্যন্ত এ আসনে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ১৯২২ থেকে ১৯২৩ সময়কালে ওয়ার অফিসে অর্থসচিব হিসেবে সংক্ষিপ্ত সময় দায়িত্ব পালন করেন।
পর্যাপ্ত সামরিক অভিজ্ঞতার অধিকারী ছিলেন। ১৯০০ থেকে ১৯০২ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ২য়/৭ম ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিম্যান্ট পরিচালনা করেন। ১৯২৩ সালে লর্ড ইয়ঙ্গার পদে স্থলাভিষিক্ত হন ও কনজারভেটিভ ও ইউনিয়নিস্ট পার্টির সভাপতি হন। হ্যারোতে অধ্যয়নকালীন সমসাময়িক প্রধানমন্ত্রী স্ট্যানলি বল্ডউইনের বিশ্বাসীপাত্রে পরিণত হয়েছিলেন।
১৯২৬ সালে প্রিভি কাউন্সিলর হন। ১৯২৭ সালে জিসিআইই হিসেবে মনোনীত হন। ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ও রাজনীতি বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে থাকা অবস্থায় ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির গভর্নর হিসেবে তাঁকে দায়িত্ব দেয়া হয়। নিজ দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণের অল্প কিছুদিন পূর্বে মার্চ, ১৯৩২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান চলাকালীন স্নাতকধারী বিনা দাস তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা চালান। তবে, সস্ত্রীক তিনি রক্ষা পান।
ভারত সাম্রাজ্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানিত হন। ১৯৩২ সালে অবসর গ্রহণকালে জিসিএসআই হিসেবে মনোনীত হন। এছাড়াও, জেরুসালেম সেন্ট জন থেকে নাইটপ্রাপ্ত হন। কলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিলিট এবং শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক এলএলডি লাভ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত ছিলেন। ৫ নভেম্বর, ১৯০২ তারিখে জুলিয়া হেনরিটা নাম্নী এক রমণীর পাণিগ্রহণ করেন। এ দম্পতির হেনরি নামীয় এক পুত্র ছিল। মর্মান্তিকভাবে তাঁর মৃত্যু হয়। লন্ডনে ট্যাক্সির ধাক্কায় আহত হন ও পরবর্তীতে আর আরোগ্য লাভ করেননি। অতঃপর, ৯ মার্চ, ১৯৪৭ তারিখে লন্ডনের হাইড পার্ক হোটেলে ৭৬ বছর ১০৮ দিন বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। ১৫ মে, ১৯৪৭ তারিখে মৃত্যু পরবর্তীকালীন হিসেব অনুযায়ী £৮৫,৬২০ পাউন্ড-স্টার্লিং মূল্যমানের সম্পদ রেখে যান।
