৩ অক্টোবর, ১৯১১ তারিখে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বাংলার কলকাতায় জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার ও আম্পায়ার ছিলেন। মূলতঃ বোলার হিসেবে দলে ভূমিকা রেখে গেছেন। ডানহাতে ফাস্ট-মিডিয়াম বোলিংয়ে পারদর্শী ছিলেন। পাশাপাশি ডানহাতে নিচেরসারিতে কার্যকর ব্যাটিং করতেন। ভারতের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।
দূর্ভাগা ভারতীয় ক্রিকেটারদের দীর্ঘ তালিকা থেকে খুব সম্ভবতঃ তিনি স্ব-মহিমায় বেশ উঁচুতে নিয়ে যেতে পারতেন। যথেষ্ট পরিশ্রমী বোলার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৩১-৩২ মৌসুম থেকে ১৯৫৯-৬০ মৌসুম পর্যন্ত সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেট জীবন অতিবাহিত করেছেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর ভারতীয় ক্রিকেটে বাংলা, বিহার, হিন্দু, মধ্যপ্রদেশ ও নয়ানগরের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
১৯৩৬-৩৭ মৌসুমের রঞ্জী ট্রফি প্রতিযোগিতায় সাধারণমানের বাংলা দলকে নেতৃত্ব দিয়ে চূড়ান্ত খেলায় নিয়ে যান। সেন্ট্রাল ইন্ডিয়ার বিপক্ষে ৫/৩৩ পান। সেমি-ফাইনালে হায়দ্রাবাদের বিপক্ষে ৪৭ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন। চূড়ান্ত খেলার পূর্বে নয়ানগরের যুবরাজ তাঁকে চাকুরী দেয়ার প্রস্তাব পাঠান। এরফলে, বাংলা দলের পরিবর্তে নয়ানগরের পক্ষে খেলার জন্যে উপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত হন। ক্রিকেট ক্লাব অব ইন্ডিয়া ঘোষণা করে যে, তিনি চূড়ান্ত খেলায় কোন দলের পক্ষেই খেলতে পারবেন না। বলাবাহুল্য, বাংলা দল ঐ খেলায় পরাজিত হয়েছিল।
মোহাম্মদ নিসার, অমর সিং, জাহাঙ্গীর খান প্রমূখ পেস বোলারদের দাপটে নিজেকে কখনো মেলে ধরতে পারেননি। ব্যাটসম্যানদের সমীহের পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। প্রায়শঃই ব্যাটের প্রান্ত ভাগ স্পর্শে উইকেট-রক্ষকের গ্লাভসে বল চলে যেতো। ১৯৩৬ সালে প্রথমবারের মতো বিদেশ সফরে যান। ইংল্যান্ড সফরে ইন-সুইঙ্গারে দক্ষ হয়ে উঠেন। বলে বেশ বৈচিত্র্যতা এনেছিলেন। মাঝে-মধ্যে ধীরগতির বলগুলো অনেকাংশে লেগ-ব্রেক কিংবা আউট-সুইঙ্গারের ন্যায় ছিল।
প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে ভারতের অন্যতম সেরা অল-রাউন্ডার ছিলেন। মানসম্পন্ন মিডিয়াম পেসার ও নিচেরসারির কার্যকর ব্যাটসম্যান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। সবচেয়ে সেরা খেলা প্রদর্শনে তৎপরতা দেখিয়েছিলেন। দূর্ভাগ্যজনকভাবে নিজের স্বর্ণালী সময়ে টেস্টে অংশগ্রহণের সুযোগ পাননি। তাসত্ত্বেও, শেষ উইকেট জুটিতে রেকর্ড গড়ে ইতিহাসের পর্দায় নিজেকে ঠাঁই করে নেন।
নামের প্রথমাংশ শরদিন্দু হলেও বিস্ময়করভাবে প্রায় সকলক্ষেত্রেই শরবিন্দু নাথ ব্যানার্জী হিসেবে লিখিত রয়েছে। মূল নাম শরদিন্দু নাথ হলেও ক্রিকেট ঐতিহাসিক ও পরিসংখ্যানবিদদের কাছে শরবিন্দু হিসেবেই পরিচিত হয়ে আছেন। আরিয়ান্স ক্লাবের মাধ্যমে খেলোয়াড়ী জীবনের সূত্রপাত ঘটান। এরপর, পাতিয়ালায় পাতিয়ালা মহারাজা একাদশের সদস্যরূপে পতৌদির নবাব একাদশের মাধ্যমে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে অংশ নেন। ঐ খেলায় অপরাজিত ৩০ ও ১১ এবং ৩/৩৮ বোলিং পরিসংখ্যান গড়েন। ফলশ্রুতিতে, হিন্দু দলে খেলার জন্যে মনোনীত হন।
সব মিলিয়ে পাঁচটি অনানুষ্ঠানিক টেস্টে অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। ১৯৩৫ সালে প্রথমবারের মতো অনানুষ্ঠানিক টেস্টে অংশ নেন। বাংলা দলের সদস্যরূপে জ্যাক রাইডারের নেতৃত্বাধীন সফররত অস্ট্রেলীয় একাদশের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় অনানুষ্ঠানিক টেস্টে ব্যাটিং ও বোলিং – উভয় বিভাগেই উদ্বোধনে নেমেছিলেন। ঐ খেলায় প্রথমবারের মতো ইনিংসে পাঁচ-উইকেট পান। ৫/৫৩ বোলিং পরিসংখ্যান গড়েছিলেন। এরফলে, লাহোরে একই দলের বিপক্ষে অনানুষ্ঠানিক টেস্টে অংশগ্রহণের জন্যে মনোনীত হন। খেলায় তিনি মাত্র চার ওভার বোলিং করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে, দ্বিতীয় ইনিংসে তিন নম্বর অবস্থানে ব্যাটিংয়ে নেমে ৭০ রান সংগ্রহ করেছিলেন।
দুই বছর পর লর্ড টেনিসনের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ একাদশের বিপক্ষে তিনটি অনানুষ্ঠানিক টেস্টে অংশ নেন। এরপর, ১৯৪৫ সালে অস্ট্রেলিয়ান সার্ভিসেস দলের বিপক্ষে আরও একটি অনানুষ্ঠানিক টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে, তাঁর পূর্ণাঙ্গ টেস্ট খেলোয়াড়ী জীবন মাত্র একটিতেই সীমাবদ্ধ ছিল।
১৯৩৬ সালে প্রথমবারের মতো ভারত দলের পক্ষে খেলার জন্যে অন্তর্ভুক্ত হন। পূর্ব নির্ধারিত সময়সূচী মোতাবেক দলের সাথে ইংল্যান্ড গমন করেন। শোচনীয় ঐ সফরে ভারত দল মাঠ ও মাঠের বাইরে পর্যদুস্ত হয়। দলের সেরা খেলোয়াড় লালা অমরনাথকে মাঝামাঝি সময়ে দেশে ফেরৎ পাঠানো হলে দলটি অধিনায়ক ভিজ্জি ও সিকে নায়ড়ু শিবির দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এ সফরের প্রস্তুতিমূলক খেলাগুলোয় তিনি বেশ ভালো করেন। ২৯.৪২ গড়ে ৪০ উইকেট দখল করেছিলেন। ওভালে সিরিজের সর্বশেষ টেস্টে তাঁর অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হবার কথা ছিল। তবে, টেস্ট শুরুর পূর্বক্ষণে সকালে নাস্তার টেবিলে বাকা জিলানী সিকে নায়ড়ুকে অপমান করলে ভিজ্জি এর প্রতিদানস্বরূপ তাঁকে টেস্ট খেলার সুযোগ করে দেন। ফলশ্রুতিতে, দূর্ভাগ্যজনকভাবে দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে থাকতে হয় শুঁটে ব্যানার্জীকে। এ সফরে তিনি মোহাম্মদ নিসার ও অমর সিংয়ের দাপটে পিছনে ছিলেন।
দ্বিতীয়বারের মতো ইংল্যান্ড গমনের সুযোগ পান। ব্যাটসম্যান হিসেবে খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেন ও রেকর্ড গড়েন। মূলতঃ নিচেরসারির কার্যকর ব্যাটসম্যান ছিলেন। ১১ মে, ১৯৪৬ সালে ওভালে সারের বিপক্ষে সফরের তৃতীয় প্রস্তুতিমূলক খেলায় অংশ নেয় ভারতীয় একাদশ। দলের সংগ্রহ ২০৫/৯ থাকা অবস্থায় দশ নম্বর ব্যাটসম্যান চান্দু সরবটে’র সাথে খেলতে মাঠে নামেন। এ দুজন ১৯০ মিনিটে ২৪৯ রান তুলে নতুন রেকর্ড গড়েন। অদ্যাবধি, সকল স্তরের ক্রিকেটে তাঁদের সংগৃহীত রান দ্বিতীয় সেরার মর্যাদা পাচ্ছে। এছাড়াও, ক্রিকেটের ইতিহাসের একমাত্র ঘটনা হিসেবে ১০ ও ১১ নম্বর ব্যাটসম্যান – উভয়েই শতক হাঁকানোর গৌরব অর্জন করেন। জ্যাক পার্কারের ফাস্ট বোলিংয়ে তিনি ১২১ রানে বিদেয় নিলেও চান্দু সরবটে ১২৪ রানে অপরাজিত ছিলেন। এরপর, দ্বিতীয় ইনিংসে ৫/৫৪ নিয়ে সারে দলকে ফলো-অনে ফেলেন। ভারত দল ১০ উইকেটে জয় পায়। তবে, এ সফরেও তিনি কোন টেস্টে অংশ নেয়ার সুযোগ পাননি।
প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেকের ১৯ বছর পর অবশেষে ৩৭ বছর বয়সে ১৯৪৮-৪৯ মৌসুমে নিজ দেশে জন গডার্ডের নেতৃত্বাধীন ক্যারিবীয় দলের মুখোমুখি হন। ৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৯ তারিখে বোম্বের বিএসে অনুষ্ঠিত সফররত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে তাঁর অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। এ পর্যায়ে অবশ্য তিনি তাঁর স্বর্ণালী সময় থেকে অনেকটা দূরে অবস্থান করছিলেন। খেলায় তিনি ৫ ও ৮ রান তুলেন। উভয় ইনিংসেই তিনি গতিদানব প্রায়র জোন্সের শিকারে পরিণত হন। ঐ খেলায় ১২৭ রান খরচায় ৫ উইকেট দখল করেছিলেন। তন্মধ্যে, নিজস্ব পঞ্চম বলে উইকেট পেয়েছিলেন। প্রথম ইনিংসে ১/৭৩ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৪/৫৪ লাভ করেছিলেন তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসে বিরতি নিয়ে বোলিংয়ে অগ্রসর হন ও তড়িৎগতিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসের সমাপ্তি রাখতে যথাযথ ভূমিকা রাখেন। ঐ খেলায় ৩৬১ রানের জয়ের লক্ষ্যমাত্রায় ভারত দল মাত্র ৬ রানের ঘাটতি ও দুই উইকেট হাতে রেখে খেলা শেষ করে। রোমাঞ্চকর ঐ খেলাটি ড্রয়ে গড়ালেও সফরকারীরা ১-০ ব্যবধানে সিরিজ জয় করে নেয়। এরপর, আর তাঁকে ভারতের পক্ষে টেস্ট খেলতে দেখা যায়নি।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে উপেক্ষিত হবার পরও রঞ্জী ট্রফিতে বিহার দলের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে সবিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৯৫৭-৫৮ মৌসুম পর্যন্ত প্রায় ১৫ বছর দলটির পক্ষে খেলেন। তবে, অনুশীলনবিহীন অবস্থায় থেকেও পরের মৌসুমে ৪৮ বছর বয়সে বিস্ময়করভাবে মধ্যপ্রদেশ দলের পক্ষে খেলেন। বিদর্ভের বিপক্ষে একটিমাত্র খেলায় অংশ নেয়ার পর ক্রিকেট জগৎকে বিদেয় জানান।
সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ বছরের খেলোয়াড়ী জীবনে ১৩৮টি প্রথম-শ্রেণীর খেলায় অংশ নেন। পাঁচ শতক ও ১১টি অর্ধ-শতক সহযোগে ২০.৬৩ গড়ে ৩৭১৫ রান সংগ্রহ করেছেন। ১৯৫২-৫৩ মৌসুমে বিহারের সদস্যরূপে বাংলার বিপক্ষে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ১৩৮ রান তুলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে পনেরোবার পাঁচ-উইকেট লাভসহ ২৬.৬৮ গড়ে ৩৮৫ উইকেট দখল করেন। ১৯৪১-৪২ মৌসুমে নয়ানগরের সদস্যরূপে মহারাষ্ট্রের বিপক্ষে ইনিংসে ব্যক্তিগত সেরা ৮/২৫ বোলিং পরিসংখ্যান গড়েন।
রামচন্দ্র গুহ তাঁর ‘স্টেটস অব ইন্ডিয়ান ক্রিকেট’ শীর্ষক গ্রন্থে প্রত্যেক রাজ্যের ক্রিকেটের ইতিহাস সম্পর্কীয় সর্বকালের সেরা রাজ্য একাদশে বাংলা দলে তাঁকে মাঝারিসারির ব্যাটসম্যান হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তাঁর চমৎকার ইনিংস খেলার কারণে ব্যাটিংয়ের অবস্থান ভিন্নতর হয়। তবে, তিনি মূলতঃ নিচেরসারির ব্যাটসম্যান ছিলেন।
ক্রিকেট খেলা থেকে অবসর গ্রহণের পর রঞ্জী ট্রফিতে দুইটি খেলায় আম্পায়ারের দায়িত্ব পালন করেছেন। তন্মধ্যে, প্রথম-শ্রেণীর খেলা থেকে অবসর গ্রহণের পূর্বেই একটিতে খেলা পরিচালনা করেছিলেন। ১৪ অক্টোবর, ১৯৮০ তারিখে ৬৯ বছর ১১ দিন বয়সে কলকাতায় তাঁর দেহাবসান ঘটে।
