|

রুসি সুর্তি

২৫ মে, ১৯৩৬ তারিখে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের গুজরাতের সুরাটে জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার ছিলেন। মূলতঃ অল-রাউন্ডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। বামহাতে ব্যাটিং করতেন। এছাড়াও, বামহাতে মিডিয়াম বোলিংয়ে পারদর্শী ছিলেন। ১৯৬০-এর দশকে ভারতের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছিলেন।

১৯৫৬-৫৭ মৌসুম থেকে ১৯৭২-৭৩ মৌসুম পর্যন্ত সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন অতিবাহিত করেছেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর ভারতীয় ক্রিকেটে গুজরাত, কুইন্সল্যান্ড ও রাজস্থানের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। কার্যকর অল-রাউন্ডার ও ব্যতিক্রমধর্মী ফিল্ডার হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন। এছাড়াও, ক্রিকেটের প্রত্যেক বিভাগেই তাঁর সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যেতো। যে-কোন অবস্থানেই নিজেকে ব্যাট হাতে মানিয়ে নিতে পারতেন। দৃঢ়চেতা মনোভাবসম্পন্ন বামহাতি ব্যাটসম্যান হিসেবে প্রয়োজনে দ্রুতলয়ে রান তুলতে অগ্রসর হতেন। নতুন বল নিয়ে বোলিংকর্মে নিয়োজিত হতেন। গতিসম্পন্ন বোলিংয়ের পাশাপাশি প্রয়োজনমাফিক বামহাতে অর্থোডক্স স্পিন বোলিং করতেন।

১৯৬০-এর দশকে ভারতীয় ক্রিকেটারদের মাঝে ফিল্ডিংয়ের দক্ষতা দেখতে পাওয়া যায়নি। তরুণ নবাব মনসুর আলী খান পতৌদি দলের দায়িত্ব পেয়ে ফিল্ডিংয়ে দক্ষতার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। তাসত্ত্বেও, কেবলমাত্র একজন ভারতীয় ফিল্ডারকে অস্ট্রেলীয় দর্শকদের মনোরঞ্জনে থাকতে দেখা যায় ও তিনি ফিল্ডিংকে খেলার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গরূপে উপলদ্ধি করেন। তাঁরা ‘সুর্তির কাছে বল ঠেলে দেয়া’র আওয়াজ তুলে। ১৯৬৭-৬৮ মৌসুমের ঐ সফরে নিজের স্বর্ণালী সময়ে অবস্থান করেছিলেন।

১৯৬০ থেকে ১৯৬৯ সময়কালে ভারতের পক্ষে সর্বমোট ২৬ টেস্টে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন। ১৯৬০-৬১ মৌসুমে নিজ দেশে ফজল মাহমুদের নেতৃত্বধীন পাকিস্তানী দলের মুখোমুখি হন। ২ ডিসেম্বর, ১৯৬০ তারিখে বোম্বের বিএসে অনুষ্ঠিত সফররত পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে তাঁর অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। ০/৩৭ ও ০/২১ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, একবার ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেয়ে ১১ রান সংগ্রহ করেছিলেন। খেলাটি ড্রয়ে পরিণত হয় ও পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।

১৯৬৭-৬৮ মৌসুমে চান্দু বোর্দে’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের সাথে অস্ট্রেলিয়া সফর করেন। চার টেস্ট থেকে ৪৫.৮৭ গড়ে ৩৬৭ রান সংগ্রহ করে দলে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকে পরিণত হয়েছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ইএএস প্রসন্নের পর ৩৫.২০ গড়ে ১৫ উইকেট নিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহক হন। অ্যাডিলেডে সিরিজের প্রথম টেস্টে প্রায় একাকী ভারত দলকে চতুর্থ দিন পর্যন্ত খেলায় টিকিয়ে রেখেছিলেন। প্রথম ইনিংসে মনোমুগ্ধকর ৭০ রান তুলেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৩ রানের ইনিংস খেলেন। এরপর, ০/৩০ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করালেও দ্বিতীয় ইনিংসে ৫/৭৪ লাভ করেন। খেলায় তাঁর দল ১৪৬ রানে পরাজিত হয়।

ব্রিসবেনে দুইবার ব্যাট হাতে দাপট দেখান। ৫২ ও ৬৪ রান সংগ্রহের পাশাপাশি উভয় ইনিংসে তিনটি করে উইকেট নিয়ে দলকে প্রায় জয়ের দোরগোরায় নিয়ে যান। ৩৯৬ রানের জয়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৪০ রান দূরে থাকে ভারত দল। চার-টেস্ট নিয়ে গড়া ঐ সিরিজে সফরকারীরা ৪-০ ব্যবধানে পরাভূত হয়।

অস্ট্রেলিয়া সফরের পর নিউজিল্যান্ড অভিমুখে ভারত দল রওয়ানা দেয়। এ সিরিজেই ভারত দল বিদেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো সিরিজ জয় করে। তিনি ৪৫.৮৫ গড়ে ৩২১ রান সংগ্রহসহ ৭ উইকেট দখল করেছিলেন। ১৯৬৭-৬৮ মৌসুমে প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট খেলেন। ঐ মৌসুমে মনসুর আলী খান পতৌদি’র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের সদস্যরূপে নিউজিল্যান্ড গমন করেন। খেলায় তিনি ২৮ ও ৪৪ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/৫১ ও ০/৩ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। স্বাগতিকরা ৫ উইকেটে পরাজয়বরণ করলে চার-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে পিছিয়ে পড়ে।

একই সফরের ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৮ তারিখে ক্রাইস্টচার্চে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। প্রথম ইনিংসে ৩৬ রানে পৌঁছানোকালে টেস্টে ১০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। ৬৭ ও ৪৫ রান সংগ্রহ করেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/৬৫ ও ০/৩ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। স্বাগতিক দল ৬ উইকেটে জয় পেলে সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।

এরপর, একই সফরের ৭ মার্চ, ১৯৬৮ তারিখে অকল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সিরিজের চতুর্থ ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের সাথে নিজেকে জড়ান। দ্বিতীয় ইনিংসে ৭১ রানে পৌঁছানোকালে টেস্টে ব্যক্তিগত পূর্বতন সর্বোচ্চ রান অতিক্রম করেন। ২৮ ও ৯৯ রান তুলেছিলেন। ২/৩২ ও ২/৩০ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। স্বাগতিকরা ২৭২ রানে পরাজিত হলে ৩-১ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়।

তবে, এরপর আর মাত্র তিনটি টেস্টে অংশ নিতে পেরেছিলেন। ভারতে ফিরে তাঁর দ্রুত ছন্দপতন ঘটতে শুরু করে। নিজ দেশে মাত্র ৫০ রান ও ২ উইকেটের সন্ধান পান। এরফলে, দৃশ্যতঃ তাঁর আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়ী জীবনের সমাপ্তির ইঙ্গিত দেন। আরেক বামহাতি অল-রাউন্ডার ও তাঁর তুলনায় অধিকতর দক্ষ ফিল্ডার একনাথ সোলকারকে স্থলাভিষিক্ত করা হয়।

১৯৬৯-৭০ মৌসুমে নিজ দেশে বিল লরি’র নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ৪ নভেম্বর, ১৯৬৯ তারিখে বোম্বের বিএসে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে অংশ নেন। ৪ ও ১৩ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, ০/২৩ ও ২/৯ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করানোসহ দুটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। সফরকারীরা ৮ উইকেটে জয় পেয়ে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। পরবর্তীতে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।

এ সময়ে কুইন্সল্যান্ড থেকে খেলার জন্যে প্রস্তাবনা পান ও শেফিল্ড শীল্ডে দলটির পক্ষে খেলেন। এরপর, আর তাঁকে জাতীয় দলে খেলার জন্যে বিবেচনায় আনা হয়নি। ২৬ টেস্টে অংশ নিয়ে ২৮.৭০ গড়ে ১২৬৩ রান ও ৪৬.৭১ গড়ে ৪২ উইকেট দখল করেছিলেন। বর্তমানের প্রেক্ষিতে তা হয়তোবা সামঞ্জস্য নয়; তবে, ঐ সময়ে ভারত দলের ভিত্তি আনয়ণে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছিলেন। কিছু সময় তাঁর বামহাতে অল-রাউন্ড ক্রীড়াশৈলীর অপূর্ব দক্ষতা ও বিস্ময়কর ফিল্ডিংয়ের কারণে ‘গরীবের গ্যারি সোবার্স’ নামে আখ্যায়িত করা হতো।

১২ জানুয়ারি, ২০১৩ তারিখে মহারাষ্ট্রের মুম্বইয়ে ৭৬ বছর ২৩২ দিন বয়সে তাঁর দেহাবসান ঘটে।

Similar Posts

  • |

    রমেশ সাক্সেনা

    ২০ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৪ তারিখে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের দিল্লিতে জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার ছিলেন। মূলতঃ ব্যাটসম্যান হিসেবে দলে ভূমিকা রেখেছিলেন। ডানহাতে ব্যাটিং করতেন। এছাড়াও, লেগ-ব্রেক বোলিংয়ে পারদর্শীতা দেখিয়েছেন। ১৯৬০-এর দশকে ভারতের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছিলেন। লঘুচরণের অধিকারী ব্যাটসম্যান হিসেবে স্পিনারদের বিপক্ষে দারুণ সফলতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। ধ্রুপদীশৈলীর স্ট্রোকপ্লের মারে দর্শকদের নির্মল বিনোদন জোগাতেন। সময়ে সময়ে দলের প্রয়োজনে বড়…

  • | | |

    মাকসুদ আহমেদ

    ২৬ মার্চ, ১৯২৫ তারিখে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের অমৃতসর এলাকায় জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার ও প্রশাসক ছিলেন। মূলতঃ ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলেছেন। ডানহাতে ব্যাটিং করতেন। এছাড়াও, ডানহাতে মিডিয়াম বোলিংয়ে পারদর্শী ছিলেন। ১৯৫০-এর দশকে পাকিস্তানের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছিলেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পূর্বেই খেলোয়াড়ী জীবনের সূত্রপাত ঘটান। ১৯৪৪-৪৫ মৌসুম থেকে ১৯৬৩-৬৪ মৌসুম পর্যন্ত সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন…

  • |

    স্যাম মরিস

    ২২ জুন, ১৮৫৫ তারিখে তাসমানিয়ার হোবার্টে জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার ছিলেন। মূলতঃ বোলার হিসেবে দলে ভূমিকা রেখে গেছেন। ডানহাতে মিডিয়াম বোলিংয়ের পাশাপাশি ডানহাতে নিচেরসারিতে ব্যাটিংয়ে নামতেন। ১৮৮০-এর দশকে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছিলেন। আইজাক মরিস ও এলিজাবেথ অ্যান দম্পতির সন্তান ছিলেন। তাঁর জনপ্রিয়তা বেশ তুঙ্গে অবস্থান করে ও দি অস্ট্রালাসিয়ানের প্রতিবেদক ফেলিক্স মন্তব্য করেন যে, স্যামকে…

  • | |

    ক্রিস প্রিঙ্গল

    ২৬ জানুয়ারি, ১৯৬৮ তারিখে অকল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার ও কোচ। মূলতঃ বোলার হিসেবে দলে ভূমিকা রেখেছিলেন। ডানহাতে ফাস্ট-মিডিয়াম বোলিং করতেন। এছাড়াও, ডানহাতে নিচেরসারিতে ব্যাটিংয়ে নামতেন। ১৯৯০-এর দশকে নিউজিল্যান্ডের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন। দীর্ঘকায় গড়নের অধিকারী ও খোলা বক্ষে বোলিং কর্মে অগ্রসর হন। ডিসেম্বর, ১৯৮৭ সালে প্রথমবারের মতো প্রতিনিধিত্বমূলক খেলায় সকলের দৃষ্টি কাড়েন। অকল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-২০ দলের…

  • |

    চার্লি স্মিথ

    ২৫ ডিসেম্বর, ১৮৭২ তারিখে কেপ কলোনির গ্যামটুস রিভার এলাকায় জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার ছিলেন। মূলতঃ ব্যাটসম্যান হিসেবে দলে ভূমিকা রাখতেন। ডানহাতে ব্যাটিং কর্মে মনোনিবেশ ঘটাতেন। এছাড়াও, কার্যকর বোলিং করতেন। ১৯০০-এর দশকে দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটে ট্রান্সভালের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ১৮৯৩-৯৪ মৌসুম থেকে ১৯০৪-০৫ মৌসুম পর্যন্ত সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন…

  • | | |

    কেকি তারাপোর

    ১৭ ডিসেম্বর, ১৯১০ তারিখে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের মহারাষ্ট্রের বোম্বেতে জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার, প্রশাসক ও কোচ ছিলেন। মূলতঃ বোলার হিসেবে দলে ভূমিকা রেখেছিলেন। স্লো লেফট-আর্ম অর্থোডক্স বোলিং করতেন। এছাড়াও, ডানহাতে নিচেরসারিতে ব্যাটিংয়ে নামতেন। ১৯৪০-এর দশকে ভারতের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছিলেন। পার্সি পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা বোম্বের ব্যবসায়ী ছিলেন। ১৯৩৭-৩৮ মৌসুম থেকে ১৯৪৮-৪৯ মৌসুম পর্যন্ত সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর…