|

পিযুষ চাওলা

২৪ ডিসেম্বর, ১৯৮৮ তারিখে উত্তরপ্রদেশের আলীগড়ে জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার। মূলতঃ অল-রাউন্ডার হিসেবে দলে ভূমিকা রেখেছেন। ডানহাতে লেগ-ব্রেক বোলিংয়ে দক্ষ। গুগলি, ফ্লিপার সহযোগে নিখুঁততার সাথে বোলিং আক্রমণে অগ্রসর হন ও প্রায়শঃই ব্যাটসম্যানদেরকে বিভ্রান্তিতে ফেলতেন। নিচেরসারিতে বামহাতে ব্যাট হাতেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতেন। ভারতের পক্ষে সকল স্তরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।

৫ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার অধিকারী। ২০০৫-০৬ মৌসুম থেকে ২০১৯-২০ সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন চলমান রাখেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর ভারতীয় ক্রিকেটে মধ্য অঞ্চল, গুজরাত ও উত্তরপ্রদেশ এবং ইংরেজ কাউন্টি ক্রিকেটে সমারসেট ও সাসেক্সের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়াও, এয়ার ইন্ডিয়া, অল স্টার্স, চেমপ্লাস্ট, চেন্নাই সুপার কিংস, কিংস ইলাভেন পাঞ্জাব, কলকাতা নাইট রাইডার্স ও মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের পক্ষে খেলেছেন। সচরাচর ঘরোয়া ক্রিকেটের জগতে অল-রাউন্ডার হিসেবে চিত্রিত হতেন। প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে নিজ নামের পার্শ্বে পাঁচটি শতক যুক্ত করে রেখেছেন। এক পর্যায়ে তাঁকে পরবর্তী ‘অনিল কুম্বলেরূপে’ আখ্যায়িত করা হতো।

প্রায়শঃই তিনি ‘পরস’ ডাকনামে পরিচিত। কৈশোরকাল থেকেই ভারতের পক্ষে অনেকগুলো বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। বেশ কিশোর বয়সে ২০০৬ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় ভারত দলের সদস্য ছিলেন। শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত ঐ প্রতিযোগিতায় ব্যাটসম্যান হিসেবে সংবাদ শিরোনামে ঠাঁই পেয়েছিলেন। চূড়ান্ত খেলায় পাকিস্তানের বিপক্ষে ৪/৮ বোলিং পরিসংখ্যান গড়লেও তাঁর দল পরাজিত হয়। এছাড়াও, উত্তরপ্রদেশের অনূর্ধ্ব-২২ দলের সদস্য ছিলেন। দিলীপ ট্রফিতে মধ্যাঞ্চলের সদস্যরূপে দক্ষিণাঞ্চলের বিপক্ষে অভিষেক ঘটে। ঘরোয়া আসরের ক্রিকেটে বিখ্যাত ক্রিকেটার শচীন তেন্ডুলকরের উইকেট নিয়ে সর্বাধিক আনন্দদায়ক মুহূর্ত অতিক্রম করেছিলেন। প্রতিভাবান তরুণ হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিতে তাঁর দেরী হয়নি।

২০০৬ থেকে ২০১২ সময়কালে ভারতের পক্ষে তিনটিমাত্র টেস্ট, ২৫টি ওডিআই ও সাতটিমাত্র টি২০আইয়ে অংশ নিয়েছেন। ২০০৫-০৬ মৌসুমে নিজ দেশে অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফের নেতৃত্বধীন ইংরেজ দলের মুখোমুখি হন। ৯ মার্চ, ২০০৬ তারিখে মোহালিতে অনুষ্ঠিত সফররত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অংশ নেন। মুনাফ প্যাটেলের সাথে তাঁর একযোগে টেস্ট অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। এরফলে, শচীন তেন্ডুলকরের পর ভারতের দ্বিতীয় কনিষ্ঠ টেস্ট ক্রিকেটারের মর্যাদাপ্রাপ্ত হন। এ পর্যায়ে তাঁর বয়স ছিল ১৭ বছর ৭৫ দিন। বিধ্বংসী অল-রাউন্ডার অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ তাঁর প্রথম শিকারে পরিণত হন। প্রথম ইনিংসে অবশ্য ০/৪৫ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করিয়েছিলেন। তবে, অনিল কুম্বলে দূর্দান্ত বোলিং নৈপুণ্যে স্বাগতিক দল ৯ উইকেটে জয় পায় ও তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। এ সফরেই ইংল্যান্ডের মাঝারিসারিতে বল হাতে নিয়ে বেশ সফলতা পান।

একদিনের আন্তর্জাতিকেই অধিক সফল ছিলেন। ১২ মে, ২০০৭ তারিখে ঢাকায় স্বাগতিক বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো ওডিআইয়ে অংশ নেন। ২০০৭-০৮ মৌসুমে ভারতের একদিনের আন্তর্জাতিক দলের নিয়মিত সদস্যে পরিণত হন। ব্যাট ও বল হাতে নিয়ে সহজাত প্রতিভার স্বাক্ষর রাখলেও তুলনামূলকভাবে ব্যাটিংয়ে তাঁর দূর্বলতা লক্ষ্য করা যায়। স্বল্পসংখ্যক খেলোয়াড়ের অন্যতম হিসেবে টি২০আই ও ওডিআইয়ে বিশ্বকাপের শিরোপা বিজয়ী দলের সদস্য ছিলেন। ২০০৭ সালে টি২০ বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী আসরের শিরোপা বিজয়ী ভারত দলের পক্ষে খেলেন। এছাড়াও, ২০১০ সালের টি২০ বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণসহ ২৮ বছর পর ২০১১ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় ভারতের শিরোপা বিজয়ে ভূমিকা রাখেন।

ভারত দলের পক্ষে খেলাকালীন মূলতঃ লেগ-স্পিনার হিসেবে অংশ নেন। তবে, ঘরোয়া আসরে তিনি প্রকৃত মানসম্পন্ন অল-রাউন্ডাররূপে গণ্য হতেন। বল ও ব্যাট হাতে নিয়ে খেলার গতিধারা পরিবর্তন করে ফেলতেন। ২০০৯ সালে সাসেক্স কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের পক্ষে খেলার জন্যে চুক্তিবদ্ধ হন। ওরচেস্টারশায়ারের বিপক্ষে নিজস্ব প্রথম খেলায় আট উইকেট দখল করেন। এছাড়াও, নয় নম্বরে ব্যাটিংয়ে নেমে ৮৬ বল থেকে ১০২ রানের অপরাজিত ইনিংস উপহার দেন। পরবর্তী দুই বছর কাউন্টি ক্রিকেটে অংশ নেননি। তবে, আগস্ট, ২০১৩ সালে মৌসুমের শেষ পাঁচ সপ্তাহ সমারসেটের বিদেশী খেলোয়াড়রূপে যুক্ত হন।

ইএসপিএনক্রিকইনফোয় এক স্বাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেন যে, তাঁর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শেন ওয়ার্নের বিপক্ষে শচীন তেন্ডুলকরের খেলা দেখতেই তিনি অধিক পছন্দ করেন। যুবরাজ সিং, এমএস ধোনিবীরেন্দ্র শেহবাগের ন্যায় ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে বিশ্বের যে-কোন বোলার বিচলিত বোধ করলেও তিনি এর ব্যতিক্রম। এক স্বাক্ষাৎকারে বলেন যে, তিনি মারকুটে ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্যে বোলিং করতে ভালোবাসেন। ভারত দল থেকে বাদ পড়লে অনিল কুম্বলে তাঁর সাহায্যার্থে এগিয়ে আসেন। কুম্বলে তাঁকে বলতেন, ‘তোমার মতো ক্রিকেট খেল, নিজের ক্রিকেটকে উপভোগ কর এবং নিজের সেরা শটে মনোযোগী হও। সবকিছুই তখন একই স্থানে চলে আসবে।’

২০১২ সালে ইংল্যান্ড দল ভারত সফরে আসলে তাঁকে পুণরায় জাতীয় দলে ফিরিয়ে আনা হয়। ২০১২-১৩ মৌসুমে নিজ দেশে অ্যালাস্টেয়ার কুকের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ দলের মুখোমুখি হন। ১৩ ডিসেম্বর, ২০১২ তারিখে নাগপুরে অনুষ্ঠিত সফররত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের চতুর্থ ও শেষ টেস্টে তাঁকে খেলানো হয়। ৪/৬৯ ও ০/৬৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ায় ও সফরকারীরা ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জয় করে নেয়। পরবর্তীতে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।

এরপর, টি২০আই সিরিজে অংশ নেন। এরপর থেকে ভারত দলে ফিরে আসতে তাঁকে হিমশিম খেতে হয়। তাসত্ত্বেও, ঘরোয়া আসরের ক্রিকেটে নিয়মিতভাবে খেলতে থাকেন।

২০১৪ সালের আইপিএলের আসরে জয়সূচক রান তুলেন। কলকাতা নাইট রাইডার্সের পক্ষে খেলার জন্যে চুক্তিবদ্ধ হন ও দলের অত্যন্ত কার্যকর খেলোয়াড় হিসেবে প্রমাণ দেন। ঐ মৌসুমে ১১ খেলা থেকে ১৪ উইকেট দখল করেন। পূর্বে সংযুক্ত কিংস ইলাভেন পাঞ্জাবের বিপক্ষে চূড়ান্ত খেলায় বাউন্ডারি হাঁকিয়ে জয়সূচক রান তুলে কেকেআরকে আইপিএলের দ্বিতীয় শিরোপা বিজয়ে ভূমিকা রাখেন। এ পর্যায়ে খেলার ১৯তম ওভারের শেষ বলে মিচেল জনসনের বল থেকে ছক্কার মার মারেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন যে, ‘শর্ট বল যে-কোন সময়েই আসতে পারে।’

ছোট-খাঁটো গড়নের অধিকারী হবার সুবাদে তিনি সুবিধে করতে পেরেছেন। তাঁর উচ্চতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি মন্তব্য করেন যে, ‘লেগ-স্পিনার হিসেবে আমাকে বলে ফ্লাইট আনয়ণে সুচারুরূপে করতে সহায়তা করেছেন। ব্রায়ান লারা, রিকি পন্টিং, শচীন পাজী, সুনীল স্যারের (গাভাস্কার) ন্যায় বিখ্যাত তারকা ক্রিকেটারেরা বেঁটে গড়নের। আমি তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চাই।’

২০০৮ সালে আম্পায়ারের সাথে মজার ঘটনায় নিজেকে যুক্ত করেন। হায়দ্রাবাদে সফরকারী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রস্তুতিমূলক খেলায় বল ইচ্ছেকৃতভাবে মুঠোয় রেখে হাত ঘোরালে আম্পায়ার দাগে পা ফেলায় নো-বল ডাকেন। তিনি বিস্মিত হন ও তাৎক্ষণিকভাবে আম্পায়ারের নজর কাড়েন। ১৯৯৩ সালের হিরো কাপের চূড়ান্ত খেলায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অনিল কুম্বলে’র ৬/১২ বোলিং পরিসংখ্যানের পুণরাবৃত্তি ঘটানোর ইচ্ছে পোষণ করেছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত। অনুভূতি চৌহান নাম্নী এক রমণীর পাণিগ্রহণ করেন।

সম্পৃক্ত পোস্ট