২৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৮ তারিখে পাঞ্জাবের শহরতলী শেখুপুরায় জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার। পাকিস্তানের পক্ষে অল-রাউন্ডার হিসেবে খেলতেন। ডানহাতে মিডিয়াম-ফাস্ট বোলিং করতেন। পাশাপাশি, নিচেরসারিতে ডানহাতে কার্যকর ব্যাটিংশৈলী প্রদর্শনে অগ্রসর হন। পাকিস্তানের পক্ষে সকল স্তরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।
১৬ বছর বয়স পর্যন্ত হকি খেলায় অংশ নিতেন। তবে, গুরুতর আঘাতের কারণে ঐ ক্রীড়ায় অংশ না নেয়ার পরামর্শ পান। কয়েক বছর পর পূর্ণাঙ্গ সুস্থ হয়ে ক্রিকেটের দিকে ঝুঁকে পড়েন। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন লীগে অংশ নিয়ে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। ১৯৯৫-৯৬ মৌসুম থেকে ২০১৫-১৬ মৌসুম পর্যন্ত সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন চলমান রাখেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর পাকিস্তানী ক্রিকেটে অ্যালাইড ব্যাংক, পাকিস্তান কাস্টমস, শেখুপুরা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন, শিয়ালকোট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন এবং ওয়াটার ও পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট অথরিটি, ইংরেজ কাউন্টি ক্রিকেটে ডার্বিশায়ার, সাসেক্স ও ইয়র্কশায়ার এবং অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটে তাসমানিয়ার প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়াও, ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্স, হিয়ারফোর্ডশায়ার, হোবার্ট হারিকেন্স, আইসিএল পাকিস্তান একাদশ, লাহোর বাদশাহ, লাহোর ডিভিশন, মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাব ও শিয়ালকোট স্ট্যালিয়ন্সের পক্ষে খেলেছেন।
এরপর, ১৯৯৪-৯৫ মৌসুমে নিউজিল্যান্ড গমনার্থে পাকিস্তানের ‘এ’ দলের সদস্য হন। ব্যক্তিগত কারণে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ক্রিকেট খেলা থেকে বিরত থাকেন। তবে, ক্রিকেট জগতে ফিরে আসার পর ২০০২ সালে স্বীয় প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে সচেষ্ট হন। এ পর্যায়ে পাকিস্তানী ঘরোয়া আসরে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীর মর্যাদা প্রাপ্ত হন। সব মিলিয়ে ১৫৬টি প্রথম-শ্রেণীর খেলায় অংশ নিয়ে ৪৪৩১ রান তুলেন। নিচেরসারির ব্যাটসম্যান হয়েও পাঁচবার তিন অঙ্কের কোটা স্পর্শ করেছিলেন। এছাড়াও, ৬৫৫ উইকেট দখল করেছেন। ব্যক্তিগত সেরা ৭/৪৯ বোলিং পরিসংখ্যান দাঁড় করিয়েছিলেন।
২০০৩ থেকে ২০১০ সময়কালে পাকিস্তানের পক্ষে নয়টিমাত্র টেস্ট, ৭৪টি ওডিআই ও চারটিমাত্র টি২০আইয়ে অংশ নিয়েছিলেন। ঐ সময়ে তাঁকে আব্দুল রাজ্জাক, শোয়েব মালিক ও আজহার মাহমুদের ন্যায় শীর্ষ খেলোয়াড়দের সাথে অল-রাউন্ডারের অবস্থানের জন্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হতে হয়েছিল। ২০০৩ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে দলের বিপর্যয়কর ফলাফলের পর ৪ এপ্রিল, ২০০৩ তারিখে শারজায় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওডিআইয়ে অংশ নেয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট জীবনের সূত্রপাত ঘটান। ঐ খেলায় দলের সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহক হন ও অল্পের জন্যে হ্যাট্রিক লাভ করা থেকে বঞ্চিত হন।
এক বছর পর ২০০৪-০৫ মৌসুমে নিজ দেশে মারভান আতাপাত্তু’র নেতৃত্বাধীন শ্রীলঙ্কান দলের মুখোমুখি হন। ২৮ অক্টোবর, ২০০৪ তারিখে করাচীতে অনুষ্ঠিত সফররত শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অংশ নেন। রিয়াজ আফ্রিদি’র সাথে তাঁরও একযোগে টেস্ট অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। এ খেলাতেও সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। তবে, তাঁর ৩/৮৩ বোলিং পরিসংখ্যান দানিশ কানেরিয়া’র ৭/১১৮ বোলিং পরিসংখ্যানের কারণে ম্লান হয়ে পড়ে। স্বাগতিকরা ৬ উইকেটে জয় পেয়ে সিরিজ ড্র করতে সক্ষম হয়।
শুরুতে তাঁর খেলায় প্রতিশ্রুতিশীলতার স্বাক্ষর থাকলেও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে তাঁকে খুব শীঘ্রই দল থেকে বের করে দেয়া হয়। তাসত্ত্বেও, পাকিস্তান দলে ক্রমাগত শোয়েব আখতার, মোহাম্মদ আসিফ ও উমর গুলের ন্যায় ফাস্ট বোলারদের সাথে দীর্ঘ সংস্করণের খেলায় স্থান করে নিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়েছিল। এছাড়াও অন্যান্য বোলারের আঘাতের কারণে ওডিআই দলের নিত্য অনুসঙ্গ হিসেবে ফিরে আসেন।
২০০৪-০৫ মৌসুমে জামশেদপুরে ভারতের বিপক্ষে দূর্দান্ত খেলেন। ৬/২৭ বোলিং পরিসংখ্যান গড়ে পাকিস্তানের বিজয়ে ভূমিকা রাখেন ও স্বর্ণালী মুহূর্ত উদযাপন করেন। খেলায় তিনি ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও, নিচেরসারিতে নেমে দলের প্রয়োজনে কিছু মারকুটে ইনিংস উপহার দিতে সচেষ্ট ছিলেন। ২০০৫ সালে বিশ্বের অন্যতম সেরা ওডিআই বোলারে পরিণত হয়েছিলেন। এ পর্যায়ে ২২ ওডিআইয়ে অংশ নিয়ে ২১.৫৩ গড়ে ৪৫ উইকেট দখল করেছিলেন। ফলশ্রুতিতে, তাঁকে আইসিসি বিশ্ব একদিনের একাদশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
পেসের ধরন পরিবর্তনকেও অন্যতম অস্ত্র হিসেবে যুক্ত করেন। তবে, টেস্টে তাঁর অংশগ্রহণ বেশ সীমিত পর্যায়ের ছিল ও বেশ অসফলই বলা চলে। তাসত্ত্বেও, ২০০৫-০৬ মৌসুমে ইংল্যান্ড সফরে তিনি বেশ ভালোমানের ক্রীড়া নৈপুণ্য প্রদর্শন করেছিলেন। ২০০৬ সালে তাঁর খেলার মান বেশ দূর্বল ছিল।
২০০৫ সালে ইংরেজ কাউন্টি ক্রিকেটে সাসেক্সের পক্ষে খেলার জন্যে চুক্তিবদ্ধ হন। সাসেক্সে তিনি কুঁচকির সমস্যায় আক্রান্ত হন। উমর গুলের প্রত্যাবর্তনে তাঁর অবস্থানও কিছুটা সন্দেহের সৃষ্টি করে। তবে, পাকিস্তান দলে সঠিকমানের ফাস্ট বোলারের সন্ধানে হিমশিম খেলে তাঁকে বিশ্বকাপে যুক্ত করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বিপর্যকর ফলাফলের পরও তাঁকে দলে রাখা হয়। ঐ প্রতিযোগিতায় দলের ব্যর্থতায় তাঁকে দলের বাইরে রাখা হয়। তবে, সাসেক্সে ঠিকই নিজেকে মেলে ধরতে তৎপরতা দেখিয়েছেন। নিচেরসারির মারকুটে ব্যাটসম্যান হিসেবে খুব কমই সফলতা পেয়েছেন। তবে, উইকেট-রক্ষক-ব্যাটসম্যান হিসেবেই তিনি নিজেকে গড়াতে চেয়েছিলেন। এছাড়াও, ক্রিকেটকে বেছে নিয়ে প্রথম পছন্দের ক্রীড়া হকি খেলা ছেড়ে দেন তিনি।
২০০৫-০৬ মৌসুমে নিজ দেশে রাহুল দ্রাবিড়ের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের মুখোমুখি হন। ১৩ জানুয়ারি, ২০০৬ তারিখে লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সফররত ভারতের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্ট খেলেন। খেলায় তিনি দলের একমাত্র ইনিংসে ৯ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, ১/৯৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি ফলাফলবিহীন অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।
২০০৭ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী খেলায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তাঁকে চড়ামাশুল গুণতে হয়। ফলশ্রুতিতে, পরবর্তী দুই খেলা থেকে বাদ পড়েন তিনি। এছাড়াও, আবুধাবি ও স্কটল্যান্ড গমনার্থে তাঁকে উপেক্ষিত হওয়াসহ শারীরিক সুস্থতার বিষয়েও নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন। এরফলে, জুলাই, ২০০৭ সালে তাঁকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের চুক্তি থেকে ছেটে ফেলা হয়। ২০০৭ সালে ইয়র্কশায়ারের সাথে দুই বছরের জন্যে চুক্তিবদ্ধ হন। পাকিস্তানে তাঁর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভাবনা ও কাউন্টি ক্রিকেটে যুক্ত হবার পর অনুমোদনবিহীন ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লীগে অংশ নেন। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত লাহোর বাদশাহের সদস্য ছিলেন। তন্মধ্যে, ২০০৮-০৯ মৌসুমের প্রতিযোগিতায় ১২.৭৭ গড়ে ২২ উইকেট দখল ও ওভারপ্রতি ৬.৬৬ রান প্রদানের কারণে প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়াও, ২৭ গড়ে ১৮৯ রান তুলে ব্যাটসম্যান হিসেবেও নিজের গুরুত্বতা প্রদর্শন করেন। ঐ লীগে ১৪৪.২৭ স্ট্রাইক রেটে রান পেয়েছিলেন। তবে, পিসিবি আইসিএলে অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়দের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। ফলশ্রুতিতে, তাঁকে পুণরায় ওডিআই দলে ফিরিয়ে আনা হয়।
২০০৯ সালের শেষদিকে অস্ট্রেলিয়া গমন করেন। ঐ সফরে তাঁর দল জয়বিহীন ছিল। অন্যতম খেলোয়াড় হিসেবে নিষেধাজ্ঞা কিংবা জরিমানার মুখোমুখি হন ও পিসিবির জবাবদিহিতার কবলে পড়েন। কিন্তু, শোয়েব মালিক ও মোহাম্মদ ইউসুফের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলেও তাঁকে বাঁকা চোখের কবলে পড়তে হয় ও এক বছরের জন্যে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত হন। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকালীন তিনি ছয় মাস অতিক্রম করে ফেলেন। এছাড়াও, মোহাম্মদ আমির, মোহাম্মদ আসিফ ও উমর গুলের সাথে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হন।
অস্ট্রেলীয় ঘরোয়া প্রতিযোগিতা বিগ ব্যাশ লীগে তাসমানিয়ান টাইগার্স ও হোবার্ট হারিকেন্সের পক্ষে ২০০৯ সাল থেকে খেলছেন। রাজ্যের বীর বনে যান ও ‘দ্য পিপলস মালেট’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। এরপর, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগে ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্সের পক্ষে এক লক্ষ মার্কিন ডলারের লোভনীয় চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ২০১২ সালে ডার্বিশায়ারের পক্ষে খেলেন।
সীমিত-ওভারের খেলার উপযোগী করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। মাত্র তিন বছরব্যাপী টেস্ট খেলোয়াড়ী জীবনে ১৮ উইকেট দখল ও ২৩৯ রান সংগ্রহ করেছিলেন। ২০০৬-০৭ মৌসুমে ইনজামাম-উল-হকের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানী দলের সদস্যরূপে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যান। ১১ জানুয়ারি, ২০০৭ তারিখে সেঞ্চুরিয়নে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে অংশ নেন। নিচেরসারিতে ব্যাটিংয়ে নেমে ৩০ ও ৩৩ রান তুলেন। তবে, মাখায়া এনটিনি ও পল হ্যারিসের তোপে পড়ে শীর্ষসারিতে ভাঙন ধরে। ফলে, পাকিস্তানের পরাজয় রোধ করতে পারেননি। এছাড়াও, হাশিম আমলা’র অসাধারণ ব্যাটিংশৈলীর কল্যাণে স্বাগতিকরা ৭ উইকেটে জয় পেলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়। পরবর্তীতে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।
টেস্টের সাথে তুলনান্তে ওডিআইয়ে বেশ সফলতা পেয়েছেন। ৭৪ ওডিআই থেকে ২৯.২৮ গড়ে ১১০ উইকেট দখল করেছেন। ওভারপ্রতি ৫.৫৭ রান খরচ করেছেন। এছাড়াও, ৫২৪ রান সংগ্রহ করেছেন। ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ করেছেন ৩৩ রান। পার্থে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সর্বশেষ ওডিআইয়ে অংশ নেন। দ্রুতগতিসম্পন্ন ইয়র্কার ও যাদুকরী আউট-সুইঙ্গারে দর্শকদের বিমোহিত করেছিলেন।
