| |

কেভিন ও’ব্রায়ান

৪ মার্চ, ১৯৮৪ তারিখে ডাবলিনে জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার। মূলতঃ অল-রাউন্ডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ডানহাতে ব্যাটিংসহ ডানহাতে কার্যকর মিডিয়াম-ফাস্ট বোলিং করতেন। আয়ারল্যান্ডের সর্বাপেক্ষা প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের অন্যতম। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সকল স্তরে আয়ারল্যান্ডের পক্ষে অংশ নিয়েছেন। এছাড়াও, অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন।

এমসিসি’র পরিচালনায় কাউন্টি ক্রিকেটে কিংবা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার উদ্দেশ্যে উইলিয়াম পোর্টারফিল্ডের ন্যায় তিনিও এমসিসি ইয়ং ক্রিকেটার্স থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর আইরিশ ক্রিকেটে লিনস্টার লাইটনিং, নিউজিল্যান্ডীয় ক্রিকেটে নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্টস এবং ইংরেজ কাউন্টি ক্রিকেটে গ্লুচেস্টারশায়ার, লিচেস্টারশায়ার, নটিংহ্যামশায়ার, সমারসেট ও সারে দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়াও, মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাব, এডমন্টন রয়্যালস, কান্দাহার নাইটস, রংপুর রাইডার্স, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো এবং মুনস্টার রেডসের পক্ষে খেলেছেন।

মজবুত গড়ন ও ফ্যাকাসে রঙের চুলের অধিকারী। ক্যান্সারের চিকিৎসায় সম্পৃক্ত দাতব্য প্রতিষ্ঠানে যুক্ত রয়েছেন। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে অসাধারণ কৃতিত্বের ফলে তাৎক্ষণিকভাবে আয়ারল্যান্ডের জাতীয় বীরে পরিণত হন। এরপর থেকেই ঘরোয়া টি২০ ক্রিকেটে নিয়মিতভাবে অংশ নিচ্ছেন। তবে, ক্রিকেট আয়ারল্যান্ডের সাথেই যোগসূত্র স্থাপন করে চলেছেন।

আয়ারল্যান্ডের উত্থানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বাক্ষর রেখেছেন। ২০০৪ সালের আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ড দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। ঐ প্রতিযোগিতায় ২৪১ রান তুলে স্বীয় প্রতিভার কথা জানান দেন। ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো জাতীয় দলে খেলেন। ২০০৮ সালে ফ্রেন্ডস প্রভিডেন্ট ট্রফিতে প্রথমবারের মতো স্বীয় প্রতিভার কথা জানান দেন। ডাবলিনে বোলিং উদ্বোধনে নেমে ৪/৩১ লাভ করেন। এরপর, ট্রেন্ট ব্রিজে ৮৩ রানের মারকুটে ব্যাটিং করে আয়ারল্যান্ড দলকে প্রায় জয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিলেন।

নবপ্রবর্তিত আইরিশ ইন্টারপ্রো সিরিজে লিনস্টার লাইটনিংয়ের অধিনায়কের দায়িত্বে রয়েছেন। ক্লাবের ৬৫৫ নম্বর ক্যাপধারী তিনি। জুন, ২০০৬ সালে সাসেক্সের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে অংশ নেন। আয়ারল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটের পেশাদার খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতিতে অধিনায়কের গুরুদায়িত্ব একান্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করে গেছেন। সেপ্টেম্বর, ২০১৪ সালে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে অধিনায়কত্ব করে উপর্যুপরী অর্ধ-শতক হাঁকিয়ে ওডিআই সিরিজ বিজয়ে ভূমিকা রাখেন।

হাল ছেড়ে না দেয়ার মানসিকতাসম্পন্ন ব্যাটসম্যানের পরিচিতি লাভ করেন। এছাড়াও, চাতুর্যতার সাথে মিডিয়াম-পেস বোলিংয়ে পারদর্শী। বিদেশের মাটিতে টি২০ লীগগুলোয় অংশ নেয়ার ফলে বলে বৈচিত্র্যতা আনয়ণে সফলতা পেয়েছেন। ক্রিকেটপ্রিয় পরিবারের সন্তান তিনি। পিতা ব্রেন্ডন ‘জিঞ্জার’ ও’ব্রায়ান, ও ভ্রাতা নীল ও’ব্রায়ান – সকলেই রেলওয়ে ইউনিয়নের পক্ষে খেলেছেন। তন্মধ্যে, কনিষ্ঠ ভ্রাতা নীল ও’ব্রায়ান জাতীয় দলে খেলেছেন। তাঁর সাথে তুলনান্তে পৃথক গুণাবলীর অধিকারী। ভগ্নী ক্লারা ও’ব্রায়ান আয়ারল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-১৯ ও ২৩ দলের পক্ষে খেলেছে।

২০০৭ সালের বিশ্ব ক্রিকেট লীগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী ছিলেন। ঐ প্রতিযোগিতায় ৫০ ঊর্ধ্ব গড়ে অভিজ্ঞতায় পরিপক্কতার কথা জানান দেন। ২০০৭ সালের আইসিসি বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায়ও অল-রাউন্ডারের ভূমিকার বিষয়টি অব্যাহত রাখেন ও কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। সেন্ট প্যাট্রিকস ডেতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৫২ বল মোকাবেলা করে অপরাজিত ১৬ রান তুলে নিজের নিষ্প্রভ ইনিংস খেললেও তা কোন অংশেই মূল্যহীন ছিল না। ঐ খেলায় আয়ারল্যান্ড দল বৃহৎ কোন ক্রিকেট দলকে পরাজিত করে। ঐ প্রতিযোগিতায় আটটি খেলায় অংশ নেন। তন্মধ্যে, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৪৯ ও বাংলাদেশের বিপক্ষে ৪৮ রান তুলেছিলেন।

ফ্রেন্ডস প্রভিডেন্ট ট্রফিতে আয়ারল্যান্ডের আগেভাগে বিদেয়ের প্রেক্ষিতে মে, ২০০৯ সালে মৌসুমের দ্বিতীয়ার্ধ্বে নটিংহ্যামশায়ারের যোগ দেন ও প্রধানতঃ একদিনের খেলাগুলোয় অংশ নেন। প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে ৬০৫ নম্বর সদস্যের মর্যাদাপ্রাপ্ত হন। মে মাসের শেষদিকে ডারহামের বিপক্ষে টি২০ খেলায় নটসের সদস্যরূপে অভিষেক ঘটে। ঐ বছরে পাঁচটি খেলায় অংশ নিয়ে ৩১ রান তুলেন ও দুই উইকেট পান। এছাড়াও, ন্যাটওয়েস্ট প্রো৪০ প্রতিযোগিতার আট খেলার সবকটি থেকে ৭৯ রান সংগ্রহ করেন ও একটি উইকেটের সন্ধান পান। দৃশ্যতঃ সাদা-বলের উপযোগী হিসেবে বিবেচিত হলেও নটিংহ্যামশায়ারে থাকাকালীন জুন মাসে পার্কসে অনুষ্ঠিত অক্সফোর্ড ইউসিসিই দলের বিপক্ষে একটি প্রথম-শ্রেণীর খেলায় অংশ নিয়েছিলেন। ১৩ ও ৫ রান তুলেন এবং উভয় ইনিংসেই একটি করে উইকেট পান। জেসন ব্রাউন, অ্যান্ডি কার্টার ও অখিল প্যাটেলের সাথে চারজন খেলোয়াড়ের অন্যতম হিসেবে নটিংহ্যামশায়ারের পক্ষে ঐ খেলায় প্রথমবারের মতো প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে অংশ নেন। পরবর্তীতে, গ্লুচেস্টারশায়ার, লিচেস্টারশায়ার, সমারসেট ও সারে দলের পক্ষে টি২০ ক্রিকেট খেলেন।

২০০৬ সাল থেকে আয়ারল্যান্ডের পক্ষে টেস্ট, ওডিআই ও টি২০আইয়ে অংশ নিচ্ছেন। প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেকের পূর্বে ১৩ জুন, ২০০৬ তারিখে বেলফাস্টে অনুষ্ঠিত সফররত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওডিআইয়ে অংশ নেয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে প্রবেশ করেন। আয়ারল্যান্ডের ক্রিকেটের ইতিহাসের প্রথম ওডিআইয়ে অংশ নিয়ে ৪৮ বলে ৩৫ রান তুলেন। এক বছর পর আবুধাবিতে স্বাগতিক সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে নিজস্ব প্রথম ঘরোয়া খেলায় অংশ নেন। প্রকৃত মানসম্পন্ন অল-রাউন্ডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।

২ আগস্ট, ২০০৮ তারিখে বেলফাস্টে অনুষ্ঠিত সফররত স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে টি২০আইয়ে প্রথম খেলেন। ২০০৯ সালের টি২০ বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় আয়ারল্যান্ডের পাঁচ খেলার সবকটিতেই অংশ নেন। ২০০৮ সালে কেনিয়ার বিপক্ষে ব্যক্তিগত সেরা অপরাজিত ১৭১ রান তুলেন। এছাড়াও, ২০১০ সালে কানাডার বিপক্ষে ব্যক্তিগত সেরা ৫/৩৯ লাভ করেন।

২০০৭ থেকে ২০১১ সালের তুলনায় ২০১১ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সদস্যভুক্ত দলগুলোর বিপক্ষে খুব স্বল্পসংখ্যক খেলায় আয়ারল্যান্ডের অংশগ্রহণ থাকলেও দলের অবিসংবাদিত ক্রিকেটার হিসেবে পরিগণিত হয়েছিলেন। ২০১৩ সালে ৪৭ বলে অপরাজিত ৮৪ রান তুলে পাকিস্তানের বিপক্ষে ফলাফল টাইয়ে রূপান্তরকরণে সবিশেষ ভূমিকা রাখেন।

২০১১ সালে বেঙ্গালুরুতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যাদুকরী ইনিংস খেলে আইরিশ ক্রিকেটকে মহিমান্বিত করেন ও নিজেকে স্মরণীয় করে রাখেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩২৭ রানের জয়ের লক্ষ্যমাত্রায় নেমে এক পর্যায়ে দলীয় সংগ্রহ ১১১/৫ হবার পরও ৫০ বলে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ইতিহাসের দ্রুততম শতক হাঁকানোর গৌরবের সাথে নিজেকে জড়ান। সবমিলিয়ে ছয়টি ছক্কা ও ১৩টি চার সহযোগে ৬৩ বলে ১১৩ রান তুলেছিলেন। এরফলে, তিন উইকেটের ব্যবধানে আয়ারল্যান্ডের ঐতিহাসিক বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এছাড়াও, বিশ্বকাপের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ সফলতম জয়ের লক্ষ্যমাত্রায় টেস্টভুক্ত দলগুলোর বিপক্ষে আয়ারল্যান্ডের শক্তিমত্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। এরপর, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৪/৭১ বোলিং পরিসংখ্যান গড়েছিলেন।

আয়ারল্যান্ডের পক্ষে একদিনের ও টি২০আইয়ে অংশ নিয়ে তিনি তাঁর খেলার ধারা অব্যাহত রাখেন। ২০১৭ সালে আয়ারল্যান্ডের পূর্ণাঙ্গ টেস্ট মর্যাদা লাভের পর টেস্ট ক্রিকেটে অংশ নেন। ১১ মে, ২০১৮ তারিখে ডাবলিনের মালাহাইডে অনুষ্ঠিত আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসের উদ্বোধনী টেস্টে বয়েড র‌্যাঙ্কিন বাদে অন্য সকলের সাথে তাঁর স্বপ্নীল অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। সফরকারী পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ৪০ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ফলো-অনের কবলে পড়েও তিনি ১১৮ রান তুলেন। প্রথম টেস্টে অংশ নিয়ে দ্বিতীয় সর্বাধিক আইসিসি র‍্যাঙ্কিং পয়েন্ট লাভ করেন। ফলো-অনের কবলে পড়ে এক পর্যায়ে আয়ারল্যান্ড দলকে জয়ের দিকে নিয়ে যেতে থাকেন। ঐ টেস্টে তাঁর দল ৫ উইকেটে পরাজিত হলেও দূর্দান্ত খেলার সুবাদে ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও, সুন্দর ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শনের স্বীকৃতিস্বরূপ ৪৪০ র‍্যাঙ্কিং পয়েন্ট পান। সংখ্যার দিক দিয়ে অস্ট্রেলীয় চার্লস ব্যানারম্যানের ৪৪৭ র‍্যাঙ্কিং পয়েন্টের পর দ্বিতীয় স্থানে নিজেকে নিয়ে যান।

২০১৯ সালে উইলিয়াম পোর্টারফিল্ডের নেতৃত্বাধীন আইরিশ দলের সদস্যরূপে ইংল্যান্ড গমন করেন। ২৪ জুলাই, ২০১৯ তারিখে লন্ডনের লর্ডসে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসের প্রথম ও সিরিজের একমাত্র টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ২৮ ও ৪ রান সংগ্রহ করেছিলেন। জ্যাক লিচের অনবদ্য ব্যাটিংশৈলীর কল্যাণে ঐ টেস্টে তাঁর দল ১৪৩ রানে পরাজয়বরণ করেছিল। পরবর্তীকালে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।

আগস্ট, ২০২০ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আরও একটি ওডিআই বিজয়ে অংশ নেন। আইরিশ অধিনায়ক অ্যান্ড্রু বালবির্নি ও উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান পল স্টার্লিংয়ের জোড়া শতকে ৩২৯ রানের জয়ের লক্ষ্যমাত্রা সহজতর হয় ও তিনি জয়সূচক রান তুলেন।

২০১৩ সালে আইসিসি’র বর্ষসেরা সহযোগী ও অনুমোদিত ক্রিকেটারের সম্মাননায় ভূষিত হন।

সম্পৃক্ত পোস্ট