২৪ নভেম্বর, ১৯৩০ তারিখে বার্কশায়ারের রিডিং এলাকায় জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত ক্রিকেটার, কোচ ও প্রশাসক ছিলেন। মূলতঃ ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলতেন। ডানহাতে ব্যাটিং করতেন। এছাড়াও, লেগ-ব্রেক বোলিংয়ে পারদর্শীতা দেখিয়েছেন। ইংল্যান্ডের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।
১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন অতিবাহিত করেছেন। ঘরোয়া পর্যায়ের প্রথম-শ্রেণীর ইংরেজ কাউন্টি ক্রিকেটে সারে দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। খুব কম সময়ই তিনি তাঁর সময়কালে ইংল্যান্ডের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানদের তালিকায় যুক্ত করতে পেরেছিলেন। তবে, ইংরেজদের মধ্যে কেবলমাত্র হার্বার্ট সাটক্লিফের পরই টেস্ট ব্যাটিং গড়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন। সারে দলে যুক্ত হবার পর শুরুর দিনগুলোয় সহজাত প্রকৃতিতে স্ট্রোক মারতেন। তবে, দুই টেস্ট খেলার পরপরই দল থেকে বাদ পড়েন। এরফলে, নিজেকে আরও দৃঢ়প্রত্যয়ী মনোভাব ও সতর্কিত ভঙ্গীতে খেলায় অংশ নিতে প্রেরণা জোগায়। ফলশ্রুতিতে, ১৯৬০-এর দশকে ইংল্যান্ড দলের ইনিংসের ভিত্তি গড়ে তুলতে বিরাট ভূমিকা রাখেন।
১৯৫৫ থেকে ১৯৬৮ সময়কালে ইংল্যান্ডের পক্ষে সর্বমোট ৮২ টেস্টে অংশ নিয়েছিলেন। টেস্টগুলো থেকে ৫৮.৬৭ গড়ে রান পেয়েছেন। ১৯৫৫ সালে নিজ দেশে জ্যাক চিদামের নেতৃত্বাধীন স্প্রিংবকের মুখোমুখি হন। ৯ জুন, ১৯৫৫ তারিখে নটিংহামে অনুষ্ঠিত সফররত দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে তাঁর অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে এডি ফুলারের বলে শূন্য রানে বিদেয় নিয়েছিলেন। স্বাগতিকরা ইনিংস ও ৫ রানে জয়লাভ করলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।
১৯৬০ সালে নিজ দেশে জ্যাকি ম্যাকগ্লিউ’র নেতৃত্বাধীন স্প্রিংবকের মুখোমুখি হন। ২১ জুলাই, ১৯৬০ তারিখে ম্যানচেস্টারে অনুষ্ঠিত সফররত দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের চতুর্থ টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের ছাঁপ রাখেন। প্রথম ইনিংসে ৬৬ রানে পৌঁছানোকালে টেস্টে ১০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। খেলায় তিনি ৭৬ ও ৩৫ রান সংগ্রহ করে উভয় ইনিংসে ট্রেভর গডার্ডের শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে সফরকারীরা ৩-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে।
১৯৬২-৬৩ মৌসুমে প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট খেলেন। ঐ মৌসুমে টেড ডেক্সটারের নেতৃত্বাধীন এমসিসি দলের সদস্যরূপে নিউজিল্যান্ড সফরে যান। ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৩ তারিখে অকল্যান্ডে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের সাথে নিজেকে জড়ান। প্রথম ইনিংসে ১১৫ রানে পৌঁছানোকালে টেস্টে ৩০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। দলের একমাত্র ইনিংসে ১২৬ রান সংগ্রহ করেছিলেন। সফরকারীরা ইনিংস ও ২১৫ রানে জয় পেলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।
একই সফরের ১ মার্চ, ১৯৬৩ তারিখে ওয়েলিংটনে অনুষ্ঠিত সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের সন্ধান পান। নিউজিল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যক্তিগত সেরা বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তাঁর পূর্বেকার সেরা ছিল ৩/৩৬। খেলায় তিনি ১/১ ও ৩/৩২ লাভ করেন। এছাড়াও, দলের একমাত্র ইনিংসে ব্যাট হাতে নিয়ে ৭৬ রান সংগ্রহসহ দুইটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। স্বাগতিকরা ইনিংস ও ৪৭ রানে পরাজিত হলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে।
১৯৬৫ সালে নিজ দেশে জন রিডের নেতৃত্বাধীন কিউই দলের মুখোমুখি হন। ২৭ মে, ১৯৬৫ তারিখে বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত সফররত নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ঘটনাবহুল এ টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৮৫ রানে থাকাকালে পরবর্তী ৬২ মিনিট তিনি কোন রান সংগ্রহ করেননি। খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ১৩৭ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/২৫ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। স্বাগতিকরা ৯ উইকেটে জয়লাভ করলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।
একই সফরের ৮ জুলাই, ১৯৬৫ তারিখে লিডসে অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি দলের একমাত্র ইনিংসে ১৬৩ রান সংগ্রহ করেছেন। দ্বিতীয় উইকেটে জন এডরিচের (৩১০*) সাথে ৩৬৯ রানের জুটি গড়েন। এছাড়াও, দুইটি ক্যাচ তালুবন্দীকরণে অগ্রসর হন। স্বাগতিকরা ইনিংস ও ১৮৭ রানে জয় পেলে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজে জয়লাভ করে।
১৯৬৭ সালে নিজ দেশে হানিফ মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানী দলের মুখোমুখি হন। লর্ডস টেস্টে ১৪৮ রানের মনোমুগ্ধকর ইনিংস খেলেন। এরফলে, লর্ডস অনার্স বোর্ডে নিজেকে যুক্ত করার গৌরব অর্জন করেন। পঞ্চদশ টেস্টে নিজস্ব প্রথম শতরানের সন্ধান পান। প্রথম দিন খেলা শুরুর বিশ মিনিট পর মাঠে নামেন। কলিন মিলবার্ন বিদেয় নিলে বাদ-বাকী সময় অতিবাহিত করেন। দ্বিতীয় দিনের শুরুতে আসিফ ইকবালের বলে কট বিহাইন্ডে পরিণত হন। তবে, তাঁর এ দৃষ্টিনন্দন শতক হানিফ মোহাম্মদের নয় ঘণ্টায় সংগৃহীত অপরাজিত ১৮৭ রানের কল্যাণে ঢাকা পড়ে যায় ও খেলাটি ড্রয়ে পরিণত হয়।
১০ আগস্ট, ১৯৬৭ তারিখে নটিংহামে অনুষ্ঠিত সফররত পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অংশ নেন। অপূর্ব ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শনে অগ্রসর হন। একবার ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেয়ে ১০৯* রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। স্বাগতিকরা ১০ উইকেটে জয় পেলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।
১৯৬৮ সালে নিজ দেশে ব্যারি জার্মনের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ২৫ জুলাই, ১৯৬৮ তারিখে লিডসে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের চতুর্থ টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ৪৯ ও ৪৬* রান সংগ্রহসহ দুইটি ক্যাচ তালুবন্দী করেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/১৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ১-০ ব্যবধানে স্বাগতিকরা পিছিয়ে পড়ে। পরবর্তীতে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।
১৯৫৫ সালে ক্রিকেট রাইটার্স ক্লাব কর্তৃক বর্ষসেরা তরুণ ক্রিকেটার ও ১৯৬০ সালে উইজডেন কর্তৃক অন্যতম বর্ষসেরা ক্রিকেটারের সম্মাননাপ্রাপ্ত হন। এছাড়াও, ১৯৬২ সালে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট ও ১৯৬৫ সালে সাউথ আফ্রিকান ক্রিকেট অ্যানুয়েল কর্তৃক বর্ষসেরা ক্রিকেটার হিসেবে মনোনীত হন। ১৯৬৬ সালে ওয়াল্টার লরেন্স ট্রফি লাভ করেন। ২০১১ সালে আইসিসি ক্রিকেট হল অব ফেমে তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ‘প্লেয়িং ইট স্ট্রেইট’ শীর্ষক গ্রন্থ প্রকাশ করেন। ইংল্যান্ডে প্রথমবারের মতো ডাবল-উইকেট প্রতিযোগিতায় খেলাকালীন হৃদযন্ত্রের সমস্যার কারণে মাটিতে পড়ে যান। অতঃপর, আরোগ্য লাভের পর ৩৮ বছর বয়সে টেস্ট ক্রিকেট থেকে আকস্মিকভাবে অবসর গ্রহণের কথা ঘোষণা করেন। খেলোয়াড়ী জীবনের শেষদিকে বেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রান তুলতেন। তবে, খুব শীঘ্রই কোচ হিসেবে সফলতম কর্মজীবন শুরু করেন। ইংল্যান্ড দলকে নিয়ে বেশ কয়েকবার বিদেশ সফরে যান। ১৯৮১ সালের শুরুতে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ সফরে বার্বাডোস টেস্টের প্রথমদিন রাত্রে দ্বিতীয়বার হৃদযন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত হন। অতঃপর, ১৪ মার্চ, ১৯৮১ তারিখে বার্বাডোসের নিধামস পয়েন্ট এলাকায় মাত্র ৫০ বছর ১১০ দিন বয়সে তাঁর দেহাবসান ঘটে।
