| |

জন ওয়েট

১৯ জানুয়ারি, ১৯৩০ তারিখে ট্রান্সভালের জোহানেসবার্গে জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার ও প্রশাসক ছিলেন। মূলতঃ উইকেট-রক্ষক-ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলতেন। উইকেট-রক্ষণের পাশাপাশি ডানহাতে নিচেরসারিতে কার্যকর ব্যাটিং করতেন। দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।

ছয় ফুটের অধিক উচ্চতাসম্পন্ন জন ওয়েট রোডস বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম সেরা উইকেট-রক্ষকের মর্যাদাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। ১৯৪৮-৪৯ মৌসুম থেকে ১৯৬৫-৬৬ মৌসুম পর্যন্ত সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন অতিবাহিত করেছেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটে ইস্টার্ন প্রভিন্স ও ট্রান্সভালের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

১৯৫১ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত সময়কালে দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষ সর্বমোট ৫০ টেস্টে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৫১ সালে ডাডলি নোর্সের নেতৃত্বাধীন স্প্রিংবকের সদস্যরূপে ইংল্যান্ড গমন করেছিলেন। ৭ জুন, ১৯৫১ তারিখে নটিংহামের ট্রেন্ট ব্রিজে অনুষ্ঠিত সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ক্লাইভ ফন রাইনেভেল্ড, জ্যাকি ম্যাকগ্লিউ ও জিওফ চাবের সাথে তাঁর একযোগে টেস্ট অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। ৭৬ রানের দৃষ্টিনন্দন ইনিংস উপহার দেন। দ্বিতীয় ইনিংসে অবশ্য ৫ রান তুলেছিলেন। এছাড়াও, উইকেটের পিছনে অবস্থান করে চারটি ক্যাচ গ্লাভসবন্দীকরণে অগ্রসর হন। ঐ খেলায় স্বাগতিকরা ৭১ রানে পরাজয়বরণ করলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে পিছিয়ে পড়ে। একই সফরে ল্যাঙ্কাশায়ারের বিপক্ষে শতক হাঁকান।

১৯৫২-৫৩ মৌসুমে প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট খেলেন। ঐ মৌসুমে জ্যাক চিদামের নেতৃত্বাধীন স্প্রিংবকের সদস্যরূপে নিউজিল্যান্ড সফরে টেস্ট খেলেন। ৬ মার্চ, ১৯৫৩ তারিখে ওয়েলিংটনে অনুষ্ঠিত সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে খেলেন। দক্ষিণ আফ্রিকা দলের প্রথম ইনিংসে ৫৪/০ ও ব্যক্তিগত ৩৩ রানে আঘাতের কারণে মাঠের বাইরে চলে যান। এরপর, দলের সংগ্রহ ১৮৭/৪ থাকাকালে পুণরায় মাঠে ফিরে আসেন। খেলায় তিনি দলের একমাত্র ইনিংসে ৩৫ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, চারটি গ্লাভসবন্দী করেছিলেন। স্বাগতিকরা ইনিংস ও ১৮০ রানে পরাজিত হলে দুই-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে পিছিয়ে পড়ে।

একই সফরের ১৩ মার্চ, ১৯৫৩ তারিখে অকল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সিরিজের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের সাথে নিজেকে জড়ান। প্রথম ইনিংসে ২০ রানে পৌঁছানোকালে টেস্টে ৫০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। ৭২ ও ২৬ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, তিনটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালেও স্বাগতিকরা ১-০ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়।

খুব শীঘ্রই দক্ষিণ আফ্রিকার নিয়মিত উইকেট-রক্ষকে পরিণত হন। ফলশ্রুতিতে, সমসাময়িক রাসেল এনডিনকে কেবলই ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলতে দেখা যায়। ১৯৫২-৫৩ মৌসুমে দলের সাথে অস্ট্রেলিয়া গমন করেন। রে লিন্ডওয়ালকিথ মিলারের পেস বোলিংয়ে বেশ ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। তবে, মেলবোর্নে সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে ইনিংস উদ্বোধনে নেমে ৬৪ রান তুলেন। রে লিন্ডওয়াল ও কিথমিলারের অনুপস্থিতিতে সফরকারীরা ২-২ ব্যবধানে সিরিজে সমতা আনয়ণে সমর্থ হয়।

১৯৫৬-৫৭ মৌসুমে নিজ দেশে পিটার মে’র নেতৃত্বাধীন এমসিসি দলের মুখোমুখি হন। ২৪ ডিসেম্বর, ১৯৫৬ তারিখে ওয়ান্ডারার্সে অনুষ্ঠিত সফররত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সফলতার ছাঁপ রাখেন। প্রথম ইনিংসে ১৩ রানে পৌঁছানোকালে টেস্টে ১০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। খেলায় তিনি ১৭ ও ০ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, উইকেটের পিছনে অবস্থান করে তিনটি ক্যাচ গ্লাভসবন্দীকরণে অগ্রসর হন। ১৩১ রানে পরাজিত হলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে স্বাগতিকরা ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে।

নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান হিসেবেও তাঁর সুনাম ছিল। খেলোয়াড়ী জীবনের শুরুতে ইনিংস উদ্বোধনে নামতেন। তবে, ১৯৫৫ সালে ট্রেভর গডার্ড, জ্যাক ম্যাকগ্লিউ’র সাথে যোগ দিলে তাঁকে ব্যাটিংয়ের জন্যে নিচেরদিকে চলে আসতে হয়। চারটি শতরানের ইনিংস খেলেছেন। ১৯৫৫ সালে ওল্ড ট্রাফোর্ডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একটি, ১৯৫৭-৫৮ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুইটি ও ১৯৬১-৬২ মৌসুমে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে একটি শতক হাঁকিয়েছিলেন। তন্মধ্যে, শেষের মৌসুমটিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এক টেস্ট সিরিজে ২৬ ডিসমিসাল ঘটিয়ে যৌথভাবে সর্বাধিক ডিসমিসাল ঘটানোর সাথে নিজেকে জড়ান। অবশেষে, ১৯৯৮ সালে মার্ক বাউচার তাঁর এ রেকর্ডের সমকক্ষ হন।

১৯৫৭-৫৮ মৌসুমে নিজ দেশে ইয়ান ক্রেগের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ২৩ ডিসেম্বর, ১৯৫৭ তারিখে জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে সফররত অস্ট্রেলিয়া দলের বিপক্ষে খেলেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের ছাঁপ রাখেন। প্রথম ইনিংসে ব্যক্তিগত পূর্বতন সর্বোচ্চ ১১৩ রান অতিক্রম করেন। খেলায় তিনি ১১৫ ও ৫৯ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, উইকেটের পিছনে অবস্থান করে তিনটি ক্যাচ ও একটি স্ট্যাম্পিংয়ের সাথে নিজেকে জড়ান। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।

একই সফরের ২৪ জানুয়ারি, ১৯৫৮ তারিখে ডারবানে অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগতভাবে সফল ছিলেন। প্রথম ইনিংসে ব্যক্তিগত পূর্বতন সর্বোচ্চ ১১৫ রান অতিক্রম করেন। খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ১৩৪ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, উইকেটের পিছনে অবস্থান করে তিনটি ক্যাচ গ্লাভসবন্দীকরণে অগ্রসর হন। খেলাটি ড্রয়ের দিয়ে গড়ালে স্বাগতিকরা ২-০ ব্যবধানে সিরিজে পিছিয়ে পড়ে।

১৯৬১-৬২ মৌসুমে নিজ দেশে জন রিডের নেতৃত্বাধীন সফররত কিউই দলের মুখোমুখি হন। পুরো সিরিজে অসাধারণত্বের পরিচয় দেন। এ সিরিজে ২৬টি ডিসমিসাল ঘটিয়ে নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েন। ২৬ ডিসেম্বর, ১৯৬১ তারিখে জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ১০১ ও ৪ রান সংগ্রহ করেছিলেন। ২০৬ মিনিটে এ শতকটি তাঁর চতুর্থ ও সর্বশেষ শতরান ছিল। এছাড়াও, ছয়টি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। খেলাটি ড্রয়ে পরিণত হলেও পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে স্বাগতিকরা ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।

এরপর, ১ জানুয়ারি, ১৯৬২ তারিখে কেপটাউনে অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের ছাঁপ রাখেন। প্রথম ইনিংসে ২২ রানে পৌঁছানোকালে টেস্টে ২০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। খেলায় তিনি ৩৩ ও ২১ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দীকরণে অগ্রসর হন। এছাড়াও, উইকেটের পিছনে অবস্থান করে চারটি ক্যাচ গ্লাভসবন্দীসহ তিনটি স্ট্যাম্পিংয়ের সাথে নিজেকে জড়ান। সফরকারীরা ৭২ রানে জয় পেলে সিরিজটি ১-১ ব্যবধানে অগ্রসর হতে থাকে। প্রসঙ্গতঃ এটিই নিউজিল্যান্ডের দ্বিতীয় ও বিদেশের মাটিতে প্রথম জয় ছিল।

একই সফরের ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬২ তারিখে জোহানেসবার্গের নিউ ওয়ান্ডারার্সে অনুষ্ঠিত সিরিজের চতুর্থ টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি দলের একমাত্র ইনিংসে ৯ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, উইকেটের পিছনে অবস্থান করে পাঁচটি ক্যাচ গ্লাভসবন্দী করেছিলেন। ঘটনাবহুল এ টেস্টে এক সিরিজে সর্বাধিক ডিসমিসাল গড়ার বিশ্বরেকর্ড গড়েন। সিরিজের এক টেস্ট বাকী থাকতেই তিনি ২৪টি ডিসমিসাল ঘটান। ইনিংস ও ৫১ রানে জয় পেলে স্বাগতিকরা পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।

এরপর, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬২ তারিখে পোর্ট এলিজাবেথের জিকিবার্হায় অনুষ্ঠিত সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ০ ও ৭ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, উইকেটের পিছনে অবস্থান করে দুইটি ক্যাচ গ্লাভসবন্দীকরণে অগ্রসর হন। সফরকারীরা ৪০ রানে জয়লাভ করলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি ২-২ ব্যবধানে শেষ হয়।

শ্বেতাঙ্গ দেশের বিপক্ষে একমাত্র দক্ষিণ আফ্রিকান হিসেবে ৫০ টেস্টে অংশগ্রহণের সাথে নিজেকে জড়ান। ১৯৬৫ সালে নিজের শেষ টেস্টে এ সফলতা পান। ১৯৬৪-৬৫ মৌসুমে নিজ দেশে মাইক স্মিথের নেতৃত্বাধীন এমসিসি দলের মুখোমুখি হন। ১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৫ তারিখে জিকিবার্হায় অনুষ্ঠিত সফররত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ৬ রান সংগ্রহ করে রান-আউটের কবলের পড়েন। এছাড়াও, উইকেট-রক্ষণে অগ্রসর হয়ে তিনটি ক্যাচ গ্লাভসবন্দী করেন। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালেও স্বাগতিকরা ১-০ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়। পরবর্তীতে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।

টেস্টগুলো থেকে ৩০.৪৪ গড়ে চার শতক সহযোগে ২৪০৫ রান পেয়েছেন। এছাড়াও, বর্ণবৈষম্যবাদের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিষেধাজ্ঞার পূর্ববর্তী সময়কালে দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বাধিক ১৪১টি ডিসমিসালের সাথে নিজেকে জড়ান। পরবর্তীতে, ডেভিড রিচার্ডসন ও মার্ক বাউচার তাঁর এ সাফল্যকে ছাঁপিয়ে যান। ইএসপিএনক্রিকইনফো সর্বকালের সেরা দক্ষিণ আফ্রিকা একাদশে ডেভ রিচার্ডসন ও মার্ক বাউচারকে পাশ কাটিয়ে তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করে। ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণের পর প্রশাসনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ট্রান্সভালের ক্রিকেট প্রশাসনে যোগ দেন।

ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত ছিলেন। বারবারা নাম্নী এক রমণীর পাণিগ্রহণ করেন। এ দম্পতির এক পুত্র ও এক কন্যা ছিল। ২২ জুন, ২০১১ তারিখে জোহানেসবার্গের ডিনসগেট এলাকায় ৮১ বছর ১৫৪ দিন বয়সে তাঁর দেহাবসান ঘটে।

Similar Posts