২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৪ তারিখে নাটালের ডারবানে জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত ক্রিকেটার, কোচ ও প্রশাসক। মূলতঃ ব্যাটসম্যান হিসেবে দলে ভূমিকা রেখেছিলেন। বামহাতে ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি লেগ-ব্রেক বোলিংয়ে দক্ষ ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।
৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার অধিকারী। দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম সেরা ক্রিকেটার হিসেবে নিজের পরিচিতি ঘটিয়েছেন। ১৯৬০-৬১ মৌসুম থেকে ১৯৮৬-৮৭ মৌসুম পর্যন্ত সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন চলমান রাখেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটে ইস্টার্ন প্রভিন্স ও ট্রান্সভালের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
১৯৬৩ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সময়কালে দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে সর্বমোট ২৩ টেস্টে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৬৩-৬৪ মৌসুমে ট্রেভর গডার্ডের নেতৃত্বাধীন স্প্রিংবকের সদস্যরূপে অস্ট্রেলিয়া গমন করেন। ১৯ বছর বয়সে ৬ ডিসেম্বর, ১৯৬৩ তারিখে ব্রিসবেনে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ডেভিড পিদি, ডেনিস লিন্ডসে, জো পারট্রিজ, কেলি সেম্যুর ও পিটার ফন ডার মারউই’র সাথে তাঁর একযোগে টেস্ট অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ২৫ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।
নিজের তৃতীয় টেস্টে গ্রাহাম ম্যাকেঞ্জি ও রিচি বেনো’র ন্যায় বোলারদের রুখে দিয়ে ১২২ রান তুলেন।
একই সফরের ২৪ জানুয়ারি, ১৯৬৪ তারিখে অ্যাডিলেডে অনুষ্ঠিত সিরিজের চতুর্থ টেস্ট খেলেন। ব্যক্তিগত সফলতার ছাঁপ রাখেন। প্রথম ইনিংসে ব্যক্তিগত পূর্বতন সর্বোচ্চ ১২২ রান অতিক্রম করেন। খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ১৭৫ রান সংগ্রহ করেন। সফরকারীরা ১০ উইকেটে জয়লাভ করলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ১-১ ব্যবধানে সমতায় নিয়ে আসে।
একই মৌসুমে প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট খেলেন। ঐ মৌসুমে ট্রেভর গডার্ডের নেতৃত্বাধীন স্প্রিংবকের সদস্যরূপে নিউজিল্যান্ড গমন করেন। ১৩ মার্চ, ১৯৬৪ তারিখে অকল্যান্ডে স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ৩০ ও ২৩ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/১৬ লাভ করেন। তবে, খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে সিরিজটি ফলাফলবিহীন অবস্থায় শেষ হয়। পাশাপাশি, টেস্ট ক্রিকেটে দক্ষিণ আফ্রিকার নিষেধাজ্ঞার কবলের পূর্বে এটিই নিউজিল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার সর্বশেষ খেলা ছিল।
১৯৬৪-৬৫ মৌসুমে নিজ দেশে মাইক স্মিথের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ দলের মুখোমুখি হন। ১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৫ তারিখে জিকিবার্হায় সফররত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ১৩৭ ও ৭৭* রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, ০/১৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালেও স্বাগতিকরা ১-০ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়।
১৯৬৫ সালে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট খেলেন। ঐ বছর পিটার ফন ডার মারউই’র নেতৃত্বাধীন স্প্রিংবকের সদস্যরূপে ইংল্যান্ড গমন করেন। ২২ জুলাই, ১৯৬৫ তারিখে লর্ডসে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি ব্যাট হাতে নিয়ে ৫৬ ও ৫ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/২১ ও ১/০ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি ফলাফলবিহীন অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।
১৯৬৬-৬৭ মৌসুমে নিজ দেশে বব সিম্পসনের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৬৬ তারিখে কেপটাউনে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট খেলেন। ব্যক্তিগতভাবে বেশ সফল ছিলেন। প্রথম ইনিংসে ব্যক্তিগত পূর্বতন সর্বোচ্চ ১৭৫ রান অতিক্রম করেন। এ পর্যায়ে ২০৩ রানে পৌঁছানোকালে টেস্টে ১৫০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। খেলায় তিনি ২০৯ ও ৪ রান সংগ্রহ করে উভয় ইনিংসে প্রতিপক্ষীয় অধিনায়কের বোলিংয়ে কাবু হন। স্বাগতিকরা ৬ উইকেটে পরাজয়বরণ করলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।
১৯৬৯-৭০ মৌসুমে নিজ দেশে বিল লরি’র নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। ৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭০ তারিখে ডারবানে অনুষ্ঠিত সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অংশ নেন। কয়েকবার ব্যক্তিগত সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। প্রথম ইনিংসে ১৬২ রানে পৌঁছানোকালে টেস্টে ২০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। এ পর্যায়ে টেস্টে ব্যক্তিগত পূর্বতন সর্বোচ্চ ২০৯ রান অতিক্রম করেন। খেলায় তিনি দলের একমাত্র ইনিংসে ২৭৪ রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/৮ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। ইনিংস ও ১২৯ রানে পরাজয়বরণ করলে সফরকারীরা চার-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে। দর্শনীয় ইনিংসের কল্যাণে ক্রিকেটপ্রেমীরা বেশ নড়েচড়ে বসে। তবে, এরপর তিনি আর মাত্র দুই টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন।
একই সফরের ৫ মার্চ, ১৯৭০ তারিখে জিকিবার্হায় অনুষ্ঠিত সিরিজের চতুর্থ ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। ১ ও ৪ রান সংগ্রহ করেছিলেন। স্বাগতিকরা ৩২৩ রানে জয় পেলে ৪-০ ব্যবধানে সিরিজে বিজয়ী হয়। পরবর্তীতে এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।
বর্ণবৈষম্যবাদ নীতি প্রবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে দক্ষিণ আফ্রিকার অংশগ্রহণ নিষিদ্ধতার কবলে পড়ে। এরফলে বেশ চড়ামূল্য গুণতে হয় তাঁকে। ২৬ বছর বয়সে তাঁর খেলোয়াড়ী জীবন শেষ হয়ে যায়। টেস্টগুলো থেকে ৬০.৯৭ গড়ে সাত শতক সহযোগে ২২৫৬ রান তুলেন। কমপক্ষে ২০ টেস্টে অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়দের মধ্যে ডন ব্র্যাডম্যানের ৯৯.৯৪ গড়ের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন।
প্রথম-শ্রেণীর খেলাগুলো থেকে ৬৪ শতক সহযোগে ৫৪ গড়ে ২০৯৪০ রান তুলেছেন। প্রথমদিকের অন্যতম হিসেবে বেশ ভারী ওজনের ব্যাট ব্যবহার করতেন। ভালোমানের বলগুলো ছেড়ে দিতেন ও বাজে বল থেকে রান সংগ্রহে তৎপর হতেন। দীর্ঘ ডান পা নিয়ে বলের মুখোমুখি হতেন। বলকে অফ-সাইডে ঠেলে দিতেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। শরীরের ওজনকে পিছনের পায়ে নিয়ে যেতেন ও পয়েন্ট বরাবর কাট করতেন।
নিষেধাজ্ঞাকালীন ইস্টার্ন প্রভিন্স ও ট্রান্সভালের পক্ষে খেলা চালিয়ে যেতে থাকেন। অন্যান্য অনেক স্বদেশীর ন্যায় তিনিও কাউন্টি ক্রিকেটের দিকে ঝুঁকে পড়েননি। ১৯৭৪-৭৫ মৌসুমের জিলেট কাপে ইস্টার্ন প্রভিন্সের সদস্যরূপে বর্ডারের বিপক্ষে লিস্ট-এ খেলায় ২২২ রানের অপরাজিত শতক হাঁকিয়ে প্রথম দ্বি-শতরানের ইনিংস খেলেন।
এক পর্যায়ে বিভিন্ন বিদ্রোহী দল দক্ষিণ আফ্রিকায় খেললে তিনি অংশ নেন। ইংল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৬টি অনানুষ্ঠানিক টেস্টে অংশগ্রহণ করেছিলেন। খেলাগুলো থেকে ৬৫.৫২ গড়ে ১৩৭৬ রান তুলেন। ১৯৮৭ সালে অস্ট্রেলীয় বিদ্রোহী দলের বিপক্ষে ১৪৪ রানের ইনিংস খেলার পর ৪২ বছর বয়সে এসে অবসর গ্রহণ করেন। এছাড়াও, অস্ট্রেলীয় ধনকুবের ক্যারি প্যাকারের ব্যবস্থাপনায় বিশ্ব সিরিজ ক্রিকেট খেলার জন্যে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
১৯৯৯ সালে ভোটের মাধ্যমে বিংশ শতাব্দীর দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটার হিসেবে মনোনীত হন। ১৯৬৬ সালে উইজডেন কর্তৃক বর্ষসেরা ক্রিকেটার হিসেবে সম্মাননাপ্রাপ্ত হন। ১৯৬১ ও ১৯৮৪ সালে বর্ষসেরা খেলোয়াড় হন। ২০০৯ সালে আইসিসি ক্রিকেট হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত হন। ক্রিকেট খেলা থেকে অবসর গ্রহণের পর প্রশাসনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ১৯৮৮ সালে ট্রান্সভাল ক্রিকেট কাউন্সিলের দল নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য ও সাউথ আফ্রিকান ক্রিকেট প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ সালে ইউনাইটেড ক্রিকেট বোর্ডের টেস্ট দল নির্বাচক হিসেবে মনোনীত হন ও ২০০২ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। এরপর, দক্ষিণ আফ্রিকা দলের ব্যাটিং কোচ হিসেবে মনোনীত হন। নভেম্বর, ২০১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটে অনবদ্য ভূমিকা পালনের স্বীকৃতিস্বরূপ সেন্ট জর্জেস পার্কের সেঞ্চুরিয়ন প্যাভিলিয়নের নাম পরিবর্তন করে ‘গ্রায়েম পোলক প্যাভিলিয়ন’ রাখা হয়। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত। তাঁর ভ্রাতৃষ্পুত্র শন পোলক দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছে।
