১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৭ তারিখে উত্তরপ্রদেশের আগ্রায় জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার, লেখক ও ধারাভাষ্যকার। মূলতঃ ব্যাটসম্যান হিসেবে দলে ভূমিকা রেখে গেছেন। ডানহাতে ব্যাটিং করতেন। এছাড়াও, ডানহাতে মিডিয়াম কিংবা ডানহাতে অফ-ব্রেক বোলিংশৈলী প্রদর্শন করতেন। ২০০০-এর দশকে ভারতের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছিলেন।
শিশু অবস্থাতেই পরিবারের সাথে দিল্লি চলে যান। শৈশবকাল থেকেই ক্রিকেটের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন। ভ্যাটস হট শট নামের প্রথম ব্যাটটি তাঁর জন্যে ₹৪৫০ রূপীতে ক্রয় করা হয়। তবে, বাসে আরোহণকালে দূর্ভাগ্যবশতঃ ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে ঐ ব্যাটটি। তাসত্ত্বেও, তাঁকে এ খেলা থেকে বিরত রাখা যায়নি। অনূর্ধ্ব-১৬ দলের পক্ষে খেলাকালীন এ ব্যাটটি পুণরায় ব্যবহার করেন।
মাইকেল অ্যাথার্টন ভারতীয় ক্রিকেটারদের কাছে আদর্শের পাত্রে পরিণত না হলেও খুব ছোটবেলা থেকেই ইংল্যান্ডের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানকে পছন্দের তালিকার শীর্ষে রাখেন। ভারত সফরে ঐ ল্যাঙ্কাস্ট্রীয়কে দেখার জন্যে মোহালিতে চলে আসেন।
অনূর্ধ্ব-১৩ দলে খেলার মাধ্যমে তাঁর উত্থান ঘটে। হরিয়াণার বিপক্ষে দিল্লির অনূর্ধ্ব-১৬ দলের অভিষেক খেলায় ৫৬ ও ৬৬ রান সংগ্রহ করেছিলেন। পাতিয়ালায় অনুষ্ঠিত পরের খেলায় পাঞ্জাবের অনূর্ধ্ব-১৬ দলের বিপক্ষে ৩/২২ পান। এরপর, হিমাচলপ্রদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিপক্ষে নিজেকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান। ৪/২৯ বোলিং পরিসংখ্যানের পাশাপাশি ব্যাট হাতে নিয়ে ৪৪ রান তুলেন। এ পর্যায়ে তাঁকে ব্যাটিং অল-রাউন্ডার হিসেবে দেখা যেতো। উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে মাঠে নামতেন। পাশাপাশি মিডিয়াম-পেস ও অফ ব্রেক বোলিং করে মাঝে-মধ্যে খেলাকে অনুকূলে নিয়ে আসতে সচেষ্ট হতেন।
১৯৯৭-৯৮ মৌসুম থেকে ২০১২-১৩ মৌসুম পর্যন্ত সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন চলমান রাখেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর ভারতীয় ক্রিকেটে দিল্লি, হিমাচলপ্রদেশ ও রাজস্থানের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়াও, কলকাতা নাইট রাইডার্স, রাজস্থান রয়্যালস ও মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাবের পক্ষে খেলেছেন।
দিল্লি দলে খেলে রানের ফুলঝুড়ি ছোটান। স্বপ্নীল অভিষেক ঘটে। ব্যাটিং উদ্বোধনে নেমে সঞ্জীব মিশ্রের প্রথম বলেই কভার ড্রাইভে চার হাঁকান। এরপর আর তাঁকে পিছনে তাকাতে হয়নি। ১৫০ রান তুলে দলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন ও সার্ভিসেস দলকে ইনিংস ব্যবধানে পরাজয়ে ভূমিকা রাখেন। পাতিয়ালায় পরের খেলায় পাঞ্জাবের বিপক্ষে ১০০ রানে অপরাজিত ছিলেন। হরভজন সিং, আশীষ কাপুর ও ভারতী বিজের ন্যায় বোলারদের বিপক্ষে খেলে এ সফলতা পান। প্রথম মৌসুমেই ৬৯ গড়ে বিস্ময়কর ৫৫৪ রান পান। ২০০০-০১ ও ২০০১-০২ মৌসুমে নয় শতাধিক রান তুলে শীর্ষে অবস্থান করেন। উভয় ক্ষেত্রেই গড় ৬০-এর অধিক ছিল। দূর্ভাগ্যজনকভাবে ২০০২-০৩ মৌসুমে তাঁর টেস্ট অভিষেকের কথা থাকলেও অভ্যন্তরীণ জটিলতায় তা আর হয়ে উঠেনি। সব মিলিয়ে ১৬২টি প্রথম-শ্রেণীর খেলায় অংশ নিলেও অধিকাংশ খেলাই দিল্লি, রাজস্থান ও হিমাচলপ্রদেশের সদস্যরূপে খেলেন। ২৯ শতক সহযোগে ৪৫.৩৫ গড়ে ১০৮৩৯ রান পেয়েছেন। পাশাপাশি ১৮৬ ক্যাচ তালুবন্দী করেছেন।
দিল্লিতে অনুষ্ঠিত পরের খেলায় জম্মু ও কাশ্মীরের বিপক্ষে ২৪ রান সংগ্রহ করলেও দিলীপ ট্রফিতে খেলার জন্যে মনোনীত হন। সেকান্দারাবাদে ইস্ট জোনের বিপক্ষে খেলেন। প্রথম উইকেট পতনের পর খেলতে নেমে ৬৩ ও ৬৯ রান সংগ্রহ করেন। পরের খেলায় বাংলার বিপক্ষে ৬৫ রান তুলেন। কিছুটা ছন্দহীনতায় ভুগলেও ২০০০-০১ মৌসুমে পুণরায় নিজেকে মেলে ধরতে সোচ্চার হন। দিল্লিতে হিমাচলপ্রদেশের বিপক্ষে ২২২ রান ও জম্মুতে অনুষ্ঠিত পরের খেলায় জম্মু ও কাশ্মীরের বিপক্ষে ১৩৩ রান তুলেন। দুই খেলা পর বিজয়াবাদায় দক্ষিণাঞ্চলের বিপক্ষে ১১০ ও ১২৫ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন। ঐ মৌসুমে চার শতক সহযোগে ৭০.৩৮ গড়ে ৯১৫ রান তুলেন। নবজ্যোৎ সিঁধু’র পর্দার অন্তরালে চলে যাওয়া, ভিভিএস লক্ষ্মণের ব্যাটিং উদ্বোধনে অনীহা এবং সদাগোপান রমেশ ও এসএস দাসের বৃহৎ আসরে নিজেকে মেলে ধরতে না পারার ফলে টেস্ট দলে তাঁর খেলার প্রকৃত সুযোগ আসে।
ভারতীয় দল নির্বাচকমণ্ডলী বীরেন্দ্র শেহবাগ, দীপ দাসগুপ্তা ও সঞ্জয় বাঙ্গারের ন্যায় খেলোয়াড় নির্বাচনের দিকে মনোযোগী ছিলেন। ভারত ‘এ’ দলের সদস্যরূপে তিনি শ্রীলঙ্কা সফরে যান। কলম্বোর আর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে লাসিথ মালিঙ্গা’র ন্যায় খেলোয়াড় সমৃদ্ধ বিসিসিএসএল একাডেমি একাদশের বিপক্ষে ১৪৫ রান তুলেন। এছাড়াও, ২/৭ লাভ করেন। এরপর, বোর্দায় গায়ানার বিপক্ষে ১৭৪ রান তুলেছিলেন। দৃশ্যতঃ পরবর্তী স্তরে খেলার উপযোগী করে তুললেও রঞ্জী ট্রফির সেমি-ফাইনালের পূর্বে ফুটবল খেলাকালীন ডান হাঁটুতে আঘাত পান। ফলশ্রুতিতে, চ্যালেঞ্জাস ট্রফিতে অংশগ্রহণের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায় তাঁর। তবে, অ্যান্ড্রু লিপাসের তত্ত্বাবধানে শারীরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে দ্রুত খেলার জগতে ফিরে আসতে সক্ষম হন।
ঐ মৌসুমের শেষদিকে নিউজিল্যান্ড দল ভারত সফরে আসলে দলে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। বিশাখাপত্তনমে সফরকারী দলের বিপক্ষে খেলার জন্যে বোর্ড সভাপতি একাদশের পক্ষে তাঁকে রাখা হয়। ১০৩ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন। একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে রাজকোটে ভারত ‘এ’ দলের পক্ষে পরের খেলায় ৬৬ রান তুলেন। এরফলে মোতেরায় ভারতীয় টেস্ট দলের সদস্যরূপে মনোনীত করা হয়।
২০০৩ থেকে ২০০৪ সময়কালে ভারতের পক্ষে সর্বমোট ১০ টেস্টে অংশ নিয়েছিলেন। ২০০৩-০৪ মৌসুমে নিজ দেশে স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের নেতৃত্বাধীন কিউই দলের মুখোমুখি হন। ৮ অক্টোবর, ২০০৩ তারিখে আহমেদাবাদে অনুষ্ঠিত সফররত নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে অংশ নেন। লক্ষ্মীপতি বালাজী’র সাথে তাঁর একযোগে টেস্ট অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। প্রথম ইনিংসে নিজের উইকেট টিকিয়ে রাখতে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। উদ্বোধনী জুটিতে বীরেন্দ্র শেহবাগের সাথে ৩৫ রান যোগ করেন। বীরেন্দ্র শেহবাগ ২৯ রানে বিদেয় নেবার পর রাহুল দ্রাবিড়ের সাথে সঠিক মানের জুটি গড়েন। ৭২ রানের জুটি গড়ে ড্যানিয়েল ভেট্টোরি’র বলে বিদেয় নেন। ১১৬ বল থেকে চারটি চারের মারে ৪২ রান তুলেছিলেন তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসেও খুব দ্রুত শেহবাগের সঙ্গচ্যূত হন। তাসত্ত্বেও আবারও রাহুল দ্রাবিড়ের সাথে দ্বিতীয় উইকেটে ৭৭ রানের জুটি গড়েন। ড্যানিয়েল ভেট্টোরি’র বলে স্কট স্টাইরিসের হাতে বিদেয় নেয়ার পূর্বে ৭২ বল মোকাবেলায় দুই বাউন্ডারি সহযোগে ৩১ রান তুলেন। রাহুল দ্রাবিড়ের প্রাণান্তঃকর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও নিউজিল্যান্ড দল খেলাটিকে ড্রয়ে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিল ও দুই-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।
মোহালিতে ৬৩০/৬ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করলে নিউজিল্যান্ড দল দৃশ্যতঃ সিরিজ ড্রয়ে সক্ষম হয়। এ পর্যায়ে সিরিজ রক্ষার্থে ভারতের ব্যাটসম্যানেরা তৎপর হয়। তিনি ১১৯ বল মোকাবেলান্তে ছয়টি চারের মারে নিজস্ব প্রথম অর্ধ-শতক করেন ও এক পর্যায়ে ১৪৮ বলে ৬০ রানে তাঁর উইকেটের পতন হয়। বীরেন্দ্র শেহবাগের সাথে প্রথম উইকেটে ১৬৪ রান যুক্ত করেন।
তবে, বীরেন্দ্র শেহবাগ ও ভিভিএস লক্ষ্মণের শতরানের ইনিংস সত্ত্বেও ২০৬ রানের ব্যবধানে ফলো-অনের কবলে পড়ে ভারত দল। দ্বিতীয় ইনিংসে ড্যারিল টাফি’র তোপে পড়েন। দলের সংগ্রহ ১৮/৩ হলে ভিভিএস লক্ষ্মণের সাথে জুটি গড়েন। এ জুটি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে অগ্রসর হয়। ১৬০ বলে ৮ বাউন্ডারি সহযোগে ৫২ রান তুলে টেস্ট ড্রয়ে বিরাট ভূমিকা রাখেন। জোড়া অর্ধ-শতরানের ইনিংস খেলার স্বীকৃতিস্বরূপ অস্ট্রেলিয়া গমনার্থে তাঁকে ভারত দলে রাখা হয়।
অক্টোবর, ২০০৩ থেকে অক্টোবর, ২০০৪ সালের মধ্যে ১০ টেস্টে অংশ নিয়েছিলেন। তালুবন্দীকৃত ১৫ ক্যাচের বেশ কয়েকটি বেশ ব্যতিক্রমী পন্থায় মুঠোয় পুড়েছিলেন। ২৩ গড়ে ৪৩৭ রান তুললেও কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে প্রত্যেকবারই ব্যাটিংয়ে গড়ে ৬৬ বল মোকাবেলা করেছিলেন। দিল্লির দলীয় সঙ্গী বীরেন্দ্র শেহবাগের সাথে বিদেশের মাটিতে ১১বার ইনিংস উদ্বোধনে নামেন। উভয়ে ৫৮.০৯ গড়ে উদ্বোধনী জুটিতে ৬৩৯ রান করেছেন। বিদেশের মাটিতে দশ বা ততোধিক উদ্বোধনী জুটি গড়ে কেবলমাত্র ওয়াসিম জাফর ও দিনেশ কার্তিক তাঁদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছেন। ২০০৩-০৪ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়া ও ২০০৪ সালে পাকিস্তান সফরে ৫৮ গড়ে রান পেয়েছিলেন। তন্মধ্যে, অস্ট্রেলিয়ায় আটবার মাঠে নেমে ৫৭ গড়ে ৪৫৯ রান তুলেন।
শুরুটা তাঁর বেশ ভালো হয়েছিল। প্রথম ৫ ইনিংসের প্রত্যেকটিতেই ৩০-এর অধিক রান পান। মাত্র দুইবার অর্ধ-শতরানের ইনিংস খেললেও চারবার ৪০-এর অধিক রান তুলেন। তবে, দূর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁর সুন্দর ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শন স্বত্ত্বেও দল নির্বাচকমণ্ডলী যুবরাজ সিংকে শীর্ষে খেলানো হলে তাঁকে বাদ পড়তে হয়।
হাঁটুর আঘাতের কারণে ২০০২-০৩ মৌসুম শেষে দলের বাইরে চলে যেতে হয় তাঁকে। তবে, নিজ দেশে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুই-টেস্ট নিয়ে গড়া সংক্ষিপ্ত সিরিজে ফিরে এসে সকলকে তাক লাগিয়ে দেন। এরপর, ২০০৩-০৪ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ায় ভারতের ঐতিহাসিক সফরের সাথে যুক্ত থাকেন ও সম্ভবতঃ ভারতের অন্যতম সেরা সফর ছিল। গ্লেন ম্যাকগ্রা কিংবা শেন ওয়ার্নের মুখোমুখি না হলেও দলে জেসন গিলেস্পি, ব্রেট লি, অ্যান্ড্রু বিকেল ও স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল ছিলেন। রাহুল দ্রাবিড়ের বীরত্বগাঁথা ও বীরেন্দ্র শেহবাগের আড়ম্বরতায় ঘেরা সিরিজে তিনি তেমন সুবিধে করতে পারেননি। ৮ ইনিংসে অংশ নিয়ে কোনবারই পঞ্চাশ রানের কোটা স্পর্শ করতে পারেননি। এ সফরে বেশ কয়েকটি বড় ধরনের জুটি গড়ে সফরকারীরা। তিনি কোন অর্ধ-শতকের সন্ধান পাননি। তবে, ভিভিএস লক্ষ্মণ, রাহুল দ্রাবিড়, শচীন তেন্ডুলকর, বীরেন্দ্র শেহবাগ ও সৌরভ গাঙ্গুলী’র সাথে থেকে তিনিও বিরাট ভূমিকা পালন করেছিলেন।
তারকা খেলোয়াড়দের পাশে খেলে বর্ণহীন ভূমিকা রাখেন। বলের চাকচিক্য ভাব নষ্ট করতে তৎপর হন ও এরফলে পরবর্তী ব্যাটসম্যানদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে খেলতে সহায়তা করে। বীরেন্দ্র শেহবাগের সাথে উদ্বোধনী জুটি গড়ে ভারতের ভিত্তি গড়েছেন কয়েকবার। বলে চাকচিক্য রোধের পাশাপাশি সহজাত স্ট্রোক খেলেছেন। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ভিক্টোরিয়ার বিপক্ষে প্রস্তুতিমূলক খেলায় ৫৫ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন। গাব্বায় সিরিজের প্রথম টেস্টে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন। স্বাগতিক দলের সংগ্রহ ২৬৮/২ থেকে ৩২৩ রানে গুটিয়ে যাবার পর তিনি ও বীরেন্দ্র শেহবাগ ৬১ রান তুলেন। ৪৫ রানে বীরেন্দ্র শেহবাগের বিদেয়ের পর জেসন গিলেস্পি চার বলের ব্যবধানে রাহুল দ্রাবিড় ও শচীন তেন্ডুলকরকে বিদেয় করলে সফরকারীদের সংগ্রহ ৬২/৩ দাঁড়ায়।
সৌরভ গাঙ্গুলীকেও বিদেয় নিতে হয়। তাসত্ত্বেও তিনি একপ্রান্তে নিজেকে আরও আঁকড়ে ধরার চেষ্টা চালান। তাঁরা ৬৫ রান তুলে ফলো-অনের ভীতি দূর করেন। ১৪৫ বল মোকাবেলান্তে ৩৬ রান তুলে জেসন গিলেস্পি’র বলে ম্যাথু হেইডেনের তালুবন্দী হন। দ্বিতীয় ইনিংসে তেমন সুবিধে করতে পারেননি। নাথান ব্রাকেনের বলে জাস্টিন ল্যাঙ্গারের মুঠোয় পুড়োর পূর্বে ৪ রান তুলেন। নিজস্ব ষষ্ঠ ইনিংসে ও প্রথমবারের মতো টেস্ট খেলোয়াড়ী জীবনে ৩০-এর কম রান তুলেন। খেলাটি ড্রয়ে পরিণত হয়েছিল।
অ্যাডিলেডে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় টেস্টে অস্ট্রেলিয়া দল ৫৫৬ রান তুললে বীরেন্দ্র শেহবাগের সাথে চমৎকার সূচনা করেন। তাঁরা ৬৬ রান যুক্ত করেন। অ্যান্ড্রু বিকেলের বলে বিদেয় নেন। ৪৪ বল থেকে ২৭ রান তুলেছিলেন তিনি। চতুর্থ ইনিংসে ২৩০ রানের জয়ের লক্ষ্যমাত্রায় তাঁকে আবারও নতুন বলের স্বাদ আস্বাদন করতে হয়। ৫৪ বলে ২০ রান করেন ও বীরেন্দ্র শেহবাগের সাথে ৪৮ রানের জুটি গড়েন।
এমসিজিতে উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানদ্বয় ১৪১ রান তুলেন। ১৩৮ বল মোকাবেলায় ৪৮ রান সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। তবে, দলের সংগ্রহ ২৭৮/১ থেকে এক পর্যায়ে ৩৬৬ রানে গুটিয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়া দল ১৯২ রানে এগিয়ে গেলে দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁরা ব্যর্থ হন। তিনি ৪ ও বীরেন্দ্র শেহবাগ ১১ রানে বিদেয় নেন। ফলশ্রুতিতে, স্বাগতিকরা ৯ উইকেটে জয় পায়।
সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে এ জুটি আবারও নিজেদের মেলে ধরতে সোচ্চার হয়। ১২৩ রানের জুটি গড়ার পর বীরেন্দ্র শেহবাগ ৭২ রানে বিদেয় নেন ও কিছু সময় পর ১৩৯ বল মোকাবেলান্তে ৪৮ রান তুলেন। ভারত দল ৭০৫/৭ তুলে ও টেস্ট জয়ের পাশাপাশি সিরিজ বিজয় করে। এ সিরিজে ২৩.২৫ গড়ে ১৮৬ রান তুলেছিলেন তিনি। সংখ্যার দিক দিয়ে রানগুলো তেমন ভালো না হলেও ৮ ইনিংসে তিনি ৫৩৮ বল মোকাবেলা করেছিলেন। প্রতি আউটের জন্যে প্রতিপক্ষীয় বোলারদের ৬৭ বলের অধিক বোলিং করতে হয়েছিল। উদ্বোধনী জুটিতে ৫৭.৩৮ গড়ে ৪৫৯ রান তুলেন।
এ পর্যায়ে বিদেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত সিরিজে বীরেন্দ্র শেহবাগ ও আকাশ চোপড়া সেরা উদ্বোধনী জুটির মর্যাদা পান। ১৯৭৯ সালে সুনীল গাভাস্কার ও চেতন চৌহানের ৪৫৩ রানের সংগ্রহকে তাঁরা ম্লান করে দেন। বিদেশের মাটিতে আটবারে সংগৃহীত ইনিংসে তাঁরা সর্বোচ্চ সিরিজ গড়ের অধিকারী হন। ডেভিড ফ্রিদ মন্তব্য করেন যে, ‘তাঁদের জুটি জ্যাক হবস ও হার্বার্ট সাটক্লিফ, গর্ডন গ্রীনিজ ও ডেসমন্ড হেইন্স, বব সিম্পসন ও বিল লরি’র কাছাকাছি পর্যায়ের ছিল।’
পাকিস্তানের মাটিতে এর পূর্বে ভারত দল কোন সিরিজ তো নয়ই, টেস্টেও জয় পায়নি। ফলশ্রুতিতে, এ অবস্থার পরিবর্তনে দলটি দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল। কিন্তু, এতে দলটি ধাক্কা খায়। সৌরভ গাঙ্গুলী নিজেকে অপ্রস্তুত বিবেচনায় এনে প্রথম দুই টেস্ট থেকে স্বীয় নাম প্রত্যাহার করলে যুবরাজ সিংকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করা হয়। সৌরভ গাঙ্গুলী’র আঘাতের কারণে অন্য যে-কারও তুলনায় সর্বাপেক্ষা তিনি আঘাত পান। রাহুল দ্রাবিড়ের নেতৃত্বে ভারত দল মুলতানের পিচে ফিল্ডিংকে বেছে নেয়। শোয়েব আখতার ও মোহাম্মদ সামি’র আক্রমণ সামাল দিয়ে ওভারপ্রতি চার রান তুলে নিতে থাকেন তিনি ও বীরেন্দ্র শেহবাগ। এক পর্যায়ে ১২১ বলে ৫ চারের সাহায্যে তিনি ৪২ রান তুলে বিদেয় নেন। এ জুটি ৩৯.৪ ওভারে ১৬০ রান যুক্ত করে দলে ভিত্তি আনে।
বীরেন্দ্র শেহবাগের ৩০৯ ও শচীন তেন্ডুলকরের ১৯৪ রানের বদৌলতে রাহুল দ্রাবিড় ইনিংস ঘোষণা করেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, যুবরাজ সিং ৬৬ বলে আটটি চারের সহায়তা নিয়ে ৫৯ রানের দূর্দান্ত ইনিংস খেলে দলকে ইনিংস বিজয়ে ভূমিকা রেখেছিলেন।
লাহোরে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে তিনি ব্যর্থতার পরিচয় দেন। ৪ ও ৫ রান তুলেন; অন্যদিকে যুবরাজ সিং প্রথম ইনিংসে ১২৯ বল মোকাবেলা ১১২ রানের দারুণ ইনিংস খেলেন। দলের অন্য কেউ অর্ধ-শতরানের কোটা স্পর্শ করতে পারেননি। অভিষেক ঘটা উমর গুলের বিপক্ষে এক চোট নিয়ে নেন। পাকিস্তান ঐ টেস্টে ৯-উইকেটের সহজ জয় পেয়ে সিরিজে সমতা আনে।
রাওয়ালপিন্ডি টেস্টে সৌরভ গাঙ্গুলী ফিরে আসেন। দর্শনীয় খেলা উপহার দেয়ায় যুবরাজ সিংকে দলে রাখা হয়। তাঁকেসহ পার্থিব প্যাটেলের দূর্বলমানের ক্রীড়াশৈলীর কারণে দলের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। ভারত দল ইনিংস ব্যবধানে জয় পায়।
দূর্ভাগ্যজনকভাবে বড় ধরনের ইনিংস খেলায় ব্যর্থতা ও আগ্রাসী শটের কারণে যুবরাজ সিং ও মোহাম্মদ কাইফকে তাঁর তুলনায় এগিয়ে রাখা হয়। ২০০৪-০৫ মৌসুমে নিজ দেশে অ্যাডাম গিলক্রিস্টের নেতৃত্বাধীন অজি দলের মুখোমুখি হন। আশানুরূপ সফলতার স্বাক্ষর রাখতে না পারার কারণে গৌতম গম্ভীরকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করা হয়। আরও একবার আকাশ চোপড়া-যুবরাজ সিংয়ের দলে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি সফরকারী দলের বিপক্ষে অবলোকন করা হয়। ব্যাঙ্গালোরে প্রথম টেস্টের পূর্বে শচীন তেন্ডুলকর নিজেকে অনুপযুক্ত বিবেচনা করলে উভয়কেই দলে খেলানো হয়। তবে, ০ ও ৫ রান তুললে অস্ট্রেলিয়া দল জয় পায়। চেন্নাইয়ে তাঁকে বাদ দেয়া হয় ও যুবরাজ সিংকে ইনিংস উদ্বোধনের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
আরও একবার খেলার সুযোগ পান তিনি। শেষ মুহূর্তে সৌরভ গাঙ্গুলী নিজেকে দলের বাইরে নিয়ে যান। ২৬ অক্টোবর, ২০০৪ তারিখে নাগপুরে অনুষ্ঠিত সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় টেস্টে অংশ নেন। এবারও তিনি ব্যর্থ হন। ৯ ও ১ রান তুলেন। এরফলে, গত ৬ ইনিংসে তিনি মাত্র ২৪ রান তুলেছিলেন। খেলায় তাঁর দল ৩২৪ রানে পরাজয়বরণ করলে চার-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে। মুম্বইয়ে চূড়ান্ত টেস্টে দিল্লির দলীয় সঙ্গী গৌতম গম্ভীরকে তাঁর পরিবর্তে দলে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর থেকে তাঁকে আর টেস্ট খেলতে দেখা যায়নি। পরবর্তীতে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।
তিন বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারত ‘এ’ দলের সদস্যরূপে গমন করেন। সেখানে অপরাজিত দ্বি-শতক হাঁকান। ২০০৭-০৮ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়া সফরে ভারত দলের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানের সমস্যা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে রাখা হয়নি ও বীরেন্দ্র শেহবাগকে শূন্যতা পূরণে দলে রাখা হয়।
২০০৩-০৪ মৌসুমের পর থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে উপেক্ষিত হন। চার মৌসুম পর আকস্মিকভাবে ঘরোয়া ক্রিকেটে দূর্দান্ত খেলতে থাকেন। চারদিনের ক্রিকেটে ১৩৩৯ রান তুলেন। বিজয় হাজারে ট্রফিতে তিনবার দ্রুতলয়ে শতক হাঁকান। ২০০৭-০৮ মৌসুমের রঞ্জী ট্রফিতে ৭৮৩ রান তুলে ছন্দ ফিরে পান ও দিল্লি দলের শিরোপা বিজয়ে দারুণ ভূমিকা রাখেন। তবে, দল নির্বাচকমণ্ডলী তরুণদের প্রতি দৃষ্টিপাত করে। দিলীপ ট্রফিতে ৩১০ রান তুলে উত্তরাঞ্চলকে শিরোপা বিজয়ে সহায়তা করলেও তাঁকে বিবেচনায় আনা হয়নি।
ভারতের শীর্ষসারির পাথরপ্রাচীর ব্যাটসম্যান হিসেবে ও অন্যতম সেরা শর্ট-লেগ ফিল্ডার হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। ভারতের পক্ষে ব্যাটিং উদ্বোধন করতেন। ব্যাট-প্যাডে অসাধারণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি চমৎকার ক্রিকেট লেখক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন। বীরেন্দ্র শেহবাগের সাথে অপর প্রান্তে অবস্থানের জন্যে ভারতীয় দল নির্বাচকমণ্ডলী অনেক উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানের অন্যতম হিসেবে তাঁকে দলে রাখা হয়েছিল। উইকেটের অপর প্রান্তে থেকে ধ্রুপদীশৈলী খেলা উপহারে সচেষ্ট হন। নতুন বল মোকাবেলা করে খেলাকে অনুকূলে নিয়ে আসেন ও মাঝারিসারির ব্যাটিংয়ে অনুকূল প্রভাব ফেলেন।
২০০৮ সালে আইপিএলের উদ্বোধনী আসরে কলকাতা নাইট রাইডার্সের পক্ষে খেলার জন্যে চুক্তিবদ্ধ হন। সেখানে তেমন সুবিধে করতে পারেননি। রাজস্থানে চলে যান ও উপর্যুপরী দুই মৌসুম দলের প্রথম দুইটি রঞ্জী শিরোপা বিজয়ে ভূমিকা রাখেন। তন্মধ্যে, প্রথম মৌসুমে প্লেট গ্রুপ থেকে দলকে শীর্ষে আনেন। এ পর্যায়ে সাড়ে তেরো ঘণ্টার অধিক সময় নিয়ে মহারাষ্ট্রের বিপক্ষে ৩০১ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেছিলেন। এছাড়াও, হিমাচলপ্রদেশের পক্ষে খেলেছেন। সব মিলিয়ে ৪৫ গড়ে ১০৩৮৯ রান পেয়েছেন। পরবর্তীতে সকল স্তরের ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণের কথা ঘোষণা করেন। ক্রিকেট সমালোচক, ধারাভাষ্যকার ও লেখক হিসেবে ক্রিকেট জ্ঞানকে বিস্তারের চেষ্টা করছেন। ‘বিয়ন্ড দ্য ব্লুজ: এ ফার্স্ট-ক্লাস সিজন লাইক নো আদার’ এবং ‘আউট অব দ্য ব্লু: রাজস্থান’স রোড টু দ্য রঞ্জী ট্রফি’ শীর্ষক দুইটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন।
