১০ অক্টোবর, ১৯২২ তারিখে ওয়াঙ্গানুইয়ে জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার ও প্রশাসক ছিলেন। মূলতঃ অল-রাউন্ডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ডানহাতে মিডিয়াম বোলিংয়ে পারদর্শী ছিলেন। পাশাপাশি, ডানহাতে নিচেরসারিতে কার্যকর ব্যাটিংশৈলী প্রদর্শন করতেন। নিউজিল্যান্ড দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন।
ইন-সুইঙ্গার ও লেগ কাটারে সবিশেষ পারদর্শীতা দেখান। দীর্ঘ সময় ধরে নিখুঁতমানের বোলিং করতেন। ব্যাট হাতে রোমাঞ্চপূর্ণ খেলা প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে উপহার দিলেও টেস্ট ক্রিকেটে তা বহমান রাখতে পারেননি। নেতৃত্বের ধরন ও কর্মী-ব্যবস্থাপনা সুচারূরূপে সম্পন্নের কারণে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৪৫-৪৬ মৌসুম থেকে ১৯৫৮-৫৯ মৌসুম পর্যন্ত প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন অতিবাহিত করেছেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর নিউজিল্যান্ডীয় ক্রিকেটে সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্টস ও ওয়েলিংটনের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
‘কেভম্যান’ ডাকনামে পরিচিত হ্যারি কেভ ৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার অধিকারী ছিলেন। নিউজিল্যান্ডের অন্যতম সুপরিচিতি ক্রিকেট পরিবারের সদস্য ছিলেন। হেনরি বার্নার্ড কেভ ও জারট্রুড ম্যারিওন অ্যালিসন দম্পতির পাঁচ পুত্রের অন্যতম। উত্তর ওয়াঙ্গানুইয়ের ওয়েস্টমেয়ারে তাঁদের পারিবারিক খামার ছিল। এক ভ্রাতা পরবর্তীতে টেস্ট ক্রিকেটে আম্পায়ারের দায়িত্ব পালন করেছেন।
ওয়েস্টমেয়ার স্কুল, সেন্ট জর্জেস স্কুল ও ওয়াঙ্গানুই কলেজিয়েট স্কুলে অধ্যয়ন করেছেন। বালক অবস্থায় দম কম ছিল ও শারীরিকভাবে দূর্বল ছিলেন। পরবর্তীকালে প্রশস্ত কাঁধের অধিকারী হলেও লিকলিকে গড়নের ছিলেন।
পিতা ও তাঁর পাঁচ কাকা ঘরোয়া ক্রিকেটের আসরে ওয়াঙ্গানুইয়ের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। স্বভাবতঃই তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণে ক্রিকেট জগতে প্রবেশ করেছিলেন।
১৯৪৯ থেকে ১৯৫৮ সময়কালে নিউজিল্যান্ডের পক্ষে সর্বমোট ১৯ টেস্টে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৪৯ সালে ওয়াল্টার হ্যাডলি’র নেতৃত্বাধীন কিউই দলের সাথে ইংল্যান্ড সফরের মাধ্যমে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট জীবনের সূত্রপাত ঘটে। পেসে গতি বৃদ্ধি ও অনেক ওভার বোলিংয়ের কারণে ছন্দ হারান ও খেলায় অবদান রাখতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। ১১ জুন, ১৯৪৯ তারিখে লিডসে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টেঅংশ নেন।জিওফ রাবোন ও ফ্রাঙ্ক মুনি’র সাথে তাঁর একযোগে টেস্ট অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। ০/৮৫ ও ৩/১০৩ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, একবার ব্যাট হাতে নিয়ে ২ রান সংগ্রহ করেছিলেন। খেলাটি ড্রয়ে পরিণত হলে চার-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।
একই সফরের ১৩ আগস্ট, ১৯৪৯ তারিখে লন্ডনের ওভালে অনুষ্ঠিত সিরিজের চতুর্থ ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের ছাঁপ রাখেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৩ রানে পৌঁছানোকালে ব্যক্তিগত পূর্বতন সর্বোচ্চ রান অতিক্রম করেন। খেলায় তিনি ১০ ও ১৪* রান সংগ্রহ করেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/৭৮ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করানোসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। খেলাটি ড্রয়ে পরিণত হলে অমিমাংসিত অবস্থায় সিরিজটি শেষ হয়।
১৯৫৫-৫৬ মৌসুমে কিউই দলের অধিনায়কের দায়িত্বে থেকে প্রথমবারের মতো ভারত ও পাকিস্তান সফরে যান। ১৩ অক্টোবর, ১৯৫৫ তারিখে করাচীতে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের সাথে নিজেকে জড়ান। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৪ রানে পৌঁছানোকালে পূর্বতন ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানকে অতিক্রম করেন। ০ ও ২১ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, পাকিস্তানের একমাত্র ইনিংসে ৩/৫৬ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করানোসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। এরফলে, পূর্বতন ব্যক্তিগত সেরা ৩/১০৩ ম্লান হয়ে যায়। ঐ খেলায় তাঁর দল ইনিংস ও ১ রানে পরাভূত হলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে পিছিয়ে পড়ে।এ সফরে ৫৪৩ ওভার বোলিং করেন। তবে, দুই স্টোনের অধিক ওজন হারান। কঙ্কালসার দেহ পুণর্গঠনে তাঁর দুই বছর কেটে যায়।
একই সফরের ৭ নভেম্বর, ১৯৫৫ তারিখে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের ছাঁপ রাখেন। পাকিস্তানের প্রথম ইনিংসে ব্যক্তিগত সেরা বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তাঁর পূর্বেকার সেরা সাফল্য ছিল ৩/৫৬। খেলায় তিনি ৩/৪৫ লাভ করেন। এছাড়াও, ব্যাট হাতে নিয়ে একবার ব্যাটিংয়ে নেমে খান মোহাম্মদের বলে শূন্য রানে বিদেয় নেন। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে স্বাগতিকরা ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জয় করে নেয়।
একই মৌসুমে অধিনায়কের দায়িত্বে থেকে কিউই দলকে নিয়ে ভারত গমন করেন। ৬ জানুয়ারি, ১৯৫৬ তারিখে মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যক্তিগত পূর্বতন সর্বোচ্চ ২১ রান অতিক্রম করেন। ব্যাট হাতে নিয়ে ৯ ও ২২* রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, বল হাতে নিয়ে ০/৯৪ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করানোসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। স্বাগতিকরা ইনিংস ও ১০৯ রানে জয় পেলে ২-০ ব্যবধানে সিরিজে জয়লাভ করে।
১৯৫৬ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শোচনীয় পরাজয়ের পর দল থেকে বাদ পড়েন। ১৯৫৫-৫৬ মৌসুমে নিজ দেশে ডেনিস অ্যাটকিনসনের নেতৃত্বাধীন ক্যারিবীয় দলের মুখোমুখি হন। ৯ মার্চ, ১৯৫৬ তারিখে অকল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সফররত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের চতুর্থ ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। কয়েকটি ব্যক্তিগত সাফল্যের ছাঁপ রাখেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসে এএল ভ্যালেন্টাইনকে বিদেয় করে টেস্টে ব্যক্তিগত সেরা বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তাঁর পূর্বেকার সেরা ছিল ৩/৪৫। দ্বিতীয় ইনিংসে এ সাফল্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান। এ পর্যায়ে আবারও ব্যক্তিগত সেরা বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। তাঁর পূর্বেকার সেরা ছিল ৪/২২। খেলায় তিনি ২৭ ওভারে ৪/২২ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৪/২১ নিয়ে নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসের প্রথম টেস্ট জয়ে প্রধান ভূমিকা রাখেন। এছাড়াও, ১১ ও ০* রান সংগ্রহ করে ২৬ বছর ও ৪৫ টেস্টে অংশ নেয়ার পর নিউজিল্যান্ডের প্রথম টেস্ট বিজয়ে অংশ নেন। খেলায় তাঁর দল ১৯০ রানে জয় পেলেও ৩-১ ব্যবধানে সিরিজ খোঁয়ায়।
১৯৫৭ সালে ইয়ান ক্রেগের নেতৃত্বাধীন অস্ট্রেলিয়া দলের বিপক্ষে তিনি শীর্ষ বোলার ছিলেন। নীল হার্ভেকে তিনবার বিদেয় করেছিলেন। ১৯৫৮ সালে জন রিডের নেতৃত্বাধীন কিউই দলের সহঃঅধিনায়কের দায়িত্বে থেকে দ্বিতীয়বার ইংল্যান্ড গমন করেন। তবে, দল একেবারেই খেলার বাইরে ছিল। ৩ জুলাই, ১৯৫৮ তারিখে লিডসে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় টেস্টে অংশ নেন। উভয় ইনিংসে ২ রান করে সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, ০/৪২ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। ইনিংস ও ৭১ রানে পরাজিত হলে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে। পরবর্তীতে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।
এছাড়াও, নিউজিল্যান্ডের শুরুরদিকের বিদেশ সফরে দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন। প্রায়শঃই দলের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করতেন ও বেশ দক্ষতার সাথে অধিনায়কের কৌশল প্রয়োগ করতেন। তাঁর এক কাকা টেস্ট ক্রিকেটে আম্পায়ারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
১৯৫৯ সালে অবসর গ্রহণ করেন। সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্টস ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়াও, নিউজিল্যান্ডের দল নির্বাচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি মৃদুভাষী, ভদ্র, বিশ্বস্ত, বিনয়ী ছিলেন। ক্রিকেট খেলাকে বেশ ভালোবাসতেন।
ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত ছিলেন। ২৮ এপ্রিল, ১৯৫১ তারিখে ইভন জয়েস অ্যান্ডারসন নাম্নী এক রমণীর পাণিগ্রহণ করেন। এ দম্পতির দুই পুত্র ছিল। ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৯ তারিখে ৬৬ বছর ৩৪০ দিন বয়সে ওয়াঙ্গানুইয়ে তাঁর দেহাবসান ঘটে।
