১ জানুয়ারি, ১৯৮৫ তারিখে পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে সোভিয়েত যুদ্ধ পরবর্তী আফগানিস্তানের লোগার প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। কার্যকর অল-রাউন্ডার হিসেবে পরিচিতি পান। ডানহাতে মাঝারিসারিতে দূর্দান্ত খেলেন। পাশাপাশি আলতো অফ-স্পিন বোলিংয়ে সক্ষমতা দেখিয়েছেন। আফগানিস্তানের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সকল স্তরে অংশ নিয়েছেন। এছাড়াও, দলের প্রথম ওডিআই ও প্রথম টেস্টের সাথে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি, আফগানিস্তান দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন।
৫ ফুট ৯ ইঞ্চি (১.৭৫ মিটার) উচ্চতার অধিকারী। ২০০৭ সাল থেকে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন চলমান রাখছেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর আফগান ক্রিকেটে অ্যামো রিজিওন ও মিস আইনাক নাইটস এবং ইংরেজ কাউন্টি ক্রিকেটে কেন্ট ও লিচস্টারশায়ারের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়াও, বাল্খ লিজেন্ডস, বন্দ-ই-আমির ড্রাগন্স, বেঙ্গল টাইগার্স, কলম্বো স্টার্স, জ্যামাইকা তল্লাজ, করাচী কিংস, সিলেট রয়্যালস, রংপুর রাইডার্স, চিটাগং ভাইকিংস, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, পাখতুন্স, পাকিস্তান কাস্টমস, রংপুর র্যাঞ্জার্স, শারজাহ ওয়ারিয়র্স, সেন্ট লুসিয়া জুকস, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স, কোয়েটা গ্ল্যাডিয়েটর্স, সানাইরাইজার্স হায়দ্রাবাদ, কলকাতা নাইট রাইডার্স, লন্ডন স্পিরিট, মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাব, সেন্ট কিটস ও নেভিস প্যাট্রিয়টস এবং মেলবোর্ন রেনেগাডেসের পক্ষে খেলেছেন। ৩০ লাখ রূপীতে সানরাইজার্সের সাথে খেলার জন্যে চুক্তিবদ্ধ হন।
এমসিসি’র পরিচালনায় কাউন্টি ক্রিকেটে কিংবা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার উদ্দেশ্যে হামিদ হাসানের ন্যায় তিনিও এমসিসি ইয়ং ক্রিকেটার্স থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। উত্থান পর্বটি অনেকাংশেই ক্রিকেটাঙ্গনে আফগানিস্তানের উত্থানের ন্যায়। আইসিসির বিশ্ব ক্রিকেট লীগের পঞ্চম বিভাগে আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রথম আবির্ভাবে দলের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেছিলেন।
পেশাওয়ারে বসবাসকালে ১০ বছর বয়সে ক্রিকেটের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলেন। টেনিস বলের ক্রিকেটে নিজেকে শাণিত করেন। পেশাওয়ারভিত্তিক আরশাদ খানের একাডেমিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। ২০০৩ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন কর্নেলিয়াস ট্রফি প্রতিযোগিতায় রহিম ইয়ার খান ক্রিকেট সংস্থার বিপক্ষে প্রতিযোগিতাধর্মী খেলায় অভিষেক ঘটে। ৬১ রান তুলেন তিনি। ২০০০-এর দশকে ভারত সফরে মাইক গ্যাটিংয়ের সুনজরে পড়েন। এমসিসি দলের বিপক্ষে খেলে অভিজ্ঞতায় পুষ্ট হন। ১০ জুলাই, ২০০৭ তারিখে আরুনডেলে এমসিসি দলের সদস্যরূপে শ্রীলঙ্কা ‘এ’ দলের বিপক্ষে খেলেন ও খেলায় শতক হাঁকিয়ে দলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন। লিস্ট-এ ক্রিকেটে পাকিস্তান কাস্টমসের পক্ষে প্রথম খেলেন।
২০০৯ সালের আইসিসি বিশ্ব ক্রিকেট লীগ তৃতীয় বিভাগে ১১ উইকেট দখল করেন ও দলকে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে নিয়ে যান। ২০০৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে আফগানিস্তানের উত্তরণে প্রধান ভূমিকা রাখেন। ঐ প্রতিযোগিতায় আফগানিস্তান দল ওডিআই মর্যাদা লাভ করে। ১৯ এপ্রিল, ২০০৯ তারিখে বেনোনিতে অনুষ্ঠিত স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক খেলায় ৫৮ রানের দূর্দান্ত ইনিংস উপহার দেন। অবশ্য, বল হাতে নিয়ে উইকেট শূন্য অবস্থায় তাঁকে মাঠ ত্যাগ করতে হয়েছিল। দল জয় পেলেও বিশ্বকাপে দলের অন্তর্ভুক্তি ঘটাতে পারেননি। তবে, এরপর থেকে আফগানিস্তান দলের নিয়মিত সদস্যরূপে খেলতে থাকেন।
ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে আফগানিস্তানের সদস্যরূপে প্রথমবারের মতো প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে অংশ নিয়ে জিম্বাবুয়ীয় একাদশের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ১০২ রানের মনোরম ইনিংস খেলেন। পরের বছর ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১০ তারিখে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর টি২০আইয়ে অভিষেক হয়। অবশ্য ঐ খেলায় ব্যাট কিংবা বল হাতে নিয়ে তেমন সফল হননি। মিতব্যয়ী বোলিং করে একটি উইকেটের সন্ধান পান। ঐ বছরের শেষদিকে এশিয়ান গেমসকে ঘিরে আফগানিস্তানের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। তবে, ঐ প্রতিযোগিতার পর নওরোজ মঙ্গলকে পুণরায় দায়িত্ব ফিরিয়ে দেয়া হয়।
২০১১-১২ মৌসুমে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ফয়সাল ব্যাংক টি২০ কাপ প্রতিযোগিতায় আফগান চিতার পক্ষে খেলেন। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগে সিলেট রয়্যালসের পক্ষে খেলেন। এ পর্যায়ে কিছু বিস্ময়কর ক্রীড়াশৈলী উপস্থাপনায় দলটিকে সেমি-ফাইনালে নিয়ে যান। ১৩ খেলায় অংশ নিয়ে ১৬ উইকেট দখল করেন ও প্রতিযোগিতার অন্যতম শীর্ষ রান সংগ্রাহকে পরিণত হন।
দলের অন্যতম চালিকা শক্তি হিসেবে ২০১০, ২০১২ ও ২০১৪ সালের বিশ্ব টি২০ বাছাইপর্বের বাঁধা ডিঙান। এরপর, ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে অংশ নেন। ঐ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে আফগানিস্তান দলের প্রথম বিজয়ের সাথে যুক্ত ছিলেন। ২০১৬ সালের টি২০ বিশ্বকাপের শিরোপা বিজয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলকেও হারায় তাঁর দল। কয়েকবার আফগানিস্তান দলের অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলেন। মার্চ, ২০১৩ সালে নওরোজ মঙ্গলের কাছ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। আফগানিস্তানের ক্রিকেটের বৈপ্লবিক পরিবর্তনে যথেষ্ট ভূমিকা রাখেন। তবে, আরও চুপচাপ থাকেন। ক্লাব ক্রিকেটে খেলার পাশাপাশি ইংল্যান্ড, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন। ফলশ্রুতিতে, সফলতা লাভের পাশাপাশি আরও অভিজ্ঞতার ঝুলি পুড়েন।
২০০৯ সাল থেকে আফগানিস্তানের পক্ষে টেস্ট, ওডিআই ও টি২০আইয়ে অংশ নিচ্ছেন। ২০১৪ সালে আফগানিস্তান দলের নেতৃত্বে থেকে এশিয়া কাপে অংশ নেন ও টেস্টভূক্ত যে-কোন দল হিসেবে বাংলাদেশ দলকে পরাভূত করেন। তবে, ঐ প্রতিযোগিতায় এটিই তাঁর দলের একমাত্র সফলতা ছিল। এছাড়াও, ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায়ও দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে, দূর্বল খেলার কারণে অধিনায়কত্ব করা থেকে বিরত থাকেন। রান খরায় ভুগলেও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অপূর্ব খেলেন। একটি শতক হাঁকান ও ম্যান অব দ্য সিরিজের পুরস্কার পান।
২০১৬ সালের টি২০ বিশ্বকাপে প্রধান ভূমিকা রাখেন। আফগানিস্তানকে সুপার-টেন পর্বে উত্তরণ ঘটান। এছাড়াও, আফগানিস্তানের ক্রিকেটের ইতিহাসের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ১৪ জুন, ২০১৮ তারিখে বেঙ্গালুরুতে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে তাঁর টেস্ট অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে দলের শোচনীয় ফলাফলের মাঝেও তিনি সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহকে পরিণত হন। ঐ প্রতিযোগিতায় তাঁর দল কোন খেলায় জয়লাভ করতে ব্যর্থ হয়।
৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ তারিখে চট্টগ্রামে বাংলাদেশের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে অংশগ্রহণ করে দলের বিজয়ে ভূমিকা রাখেন। এরপর সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সালে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণের কথা ঘোষণা করেন ও সাদা-বলের ক্রিকেটে মনোনিবেশের কথা জানান। একমাস পর হৃদযন্ত্রক্রীয়ায় তাঁর মৃত্যুর গুজব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ সাড়া পড়ে যায়। পরবর্তীতে, তিনি তা নাকচ করে দেন।
টি২০আইয়ে আফগানিস্তানের দ্রুততম অর্ধ-শতক হাঁকান। এছাড়াও, প্রথম আফগান বোলার হিসেবে ওডিআইয়ে ১০০ উইকেট দখল করেন। এক পর্যায়ে ওডিআইয়ে বিশ্বের শীর্ষ ১০ অল-রাউন্ডারের অন্যতম ছিলেন।
২০১৯-২০ মৌসুমে রশীদ খানের অধিনায়কত্বে একমাত্র টেস্ট খেলতে বাংলাদেশ সফর করেন। মোটেই সুবিধে করতে পারেননি। ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত ঐ টেস্টে স্বাগতিক দল ২২৪ রানের ব্যবধানে জয়লাভ করে। খেলায় তিনি ০ ও ৮ রান সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। তবে, বল হাতে নিয়ে ৩/৫৬ ও ১/৩৯ লাভ করেছিলেন।
২০১৭ সালে আফগানিস্তানের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ইন্ডিয়ান টি২০ লীগে অংশগ্রহণের গৌরব অর্জন করেন। সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের সদস্য হন। তবে, তিনটিমাত্র খেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান। বল হাতে নিয়ে ওভারপ্রতি ৫.৫-এর কম রান খরচ করেন। ২০১৮ সালের আইপিএল নিলামে ১ কোটি রূপীর বিনিময়ে পুণরায় তাঁকে দলে রাখা হয়। পাঁচ খেলা থেকে তিন উইকেট পান। ২০১৯ সালে আট খেলায় অংশ নেন। তন্মধ্যে, ব্যাঙ্গালোরের বিপক্ষে শীর্ষসারিতে ভাঙ্গন ধরান ও চার উইকেট লাভ করেন।
২০১৯ সালের ভাইটালিটি ব্ল্যাস্ট প্রতিযোগিতায় কেন্টের পক্ষে নয়টি খেলায় অংশ নেন। ১৫৩.১২ স্ট্রাইক রেটে ১৪৭ রান সংগ্রহ করেছিলেন। তন্মধ্যে, জুলাইয়ে কিয়া ওভালে পুরনো প্রতিপক্ষ সারের বিপক্ষে ১২ বল মোকাবেলান্তে ৪৩ রান তুলে দলের বিজয় নিশ্চিত করেন। জাক ক্রলি ও অ্যালেক্স ব্ল্যাকের ১২ ছক্কার একটি কম নিয়ে কেন্টের ছক্কা হাঁকানোর তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করেন। বল হাতে নিয়ে ওভারপ্রতি ৭.২২ রান খরচ করে আট উইকেট দখল করেন। এছাড়াও তিনটি ক্যাচ তালুবন্দী করেন। তন্মধ্যে, সেন্ট লরেন্সের দ্য স্পিটফায়ার গ্রাউন্ডে নিজস্ব প্রথম খেলায় সমারসেটের বিপক্ষে বাউন্ডারি সীমানা থেকে দর্শনীয় ক্যাচ মুঠোয় পুড়েছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর, ২০২০ তারিখে টি২০ ব্ল্যাস্ট খেলার উদ্দেশ্য নিয়ে নর্দাম্পটনশায়ার দলের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন।
২০২০-২১ মৌসুমে বিগ ব্যাশ লীগের দশম আসরকে ঘিরে মেলবোর্ন রেনেগাডেসের পক্ষে চতুর্থবারের মতো পুণরায় যুক্ত হন। রেনেগাডেসের সমর্থকেরা তাঁকে আদর করে ‘দ্য প্রেসিডেন্ট’ ডাকনামে ভূষিত করে। সব মিলিয়ে দলটির পক্ষে ২৭ খেলায় অংশ নিয়ে ৩০ গড়ে ও ১৩১ স্ট্রাইক রেটে রান তুলেন। পাশাপাশি ওভারপ্রতি ৭.১৭ রান খরচ করে ২১ উইকেট দখল করেছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত। হাসান ইসাখিল নামীয় সন্তানের জনক।
