৩০ এপ্রিল, ১৯৬৪ তারিখে কুইন্সল্যান্ডের স্প্রিং হিল এলাকায় জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত ক্রিকেটার, প্রশাসক ও ধারাভাষ্যকার। মূলতঃ উইকেট-রক্ষক-ব্যাটসম্যানের দায়িত্ব পালন করতেন। উইকেট-রক্ষণের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ডানহাতে মাঝারিসারিতে নিচেরদিকে ব্যাটিং কর্মে মনোনিবেশ ঘটাতেন। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন ও দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৮৬-৮৭ মৌসুম থেকে ১৯৯৯-২০০০ মৌসুম পর্যন্ত সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন অতিবাহিত করেছেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটে কুইন্সল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ১৯৮৬-৮৭ মৌসুমে কুইন্সল্যান্ড দলে তাঁর অভিষেক ঘটে। এ পর্যায়ে পিটার অ্যান্ডারসনের সহকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
আকস্মিকভাবে জাতীয় দলে খেলার জন্যে আমন্ত্রণ বার্তা লাভ করেন। এ পর্যায়ে তিনি মাত্র ছয়টি প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেট খেলায় অংশ নিয়েছিলেন। অভিজ্ঞতাসম্পন্ন টিম জোরার কিংবা গ্রেগ ডায়ারকে পাশ কাটিয়ে তিনি এ সুযোগ পান। পরবর্তীকালে নিজেকে সেরাদের কাতারে উপস্থাপিত করেন।
১৯৮৮ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত সময়কালে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে সর্বমোট ১১৯ টেস্ট ও ১৬৮টি ওডিআইয়ে অংশ নিয়েছেন। ১৯৮৮-৮৯ মৌসুমে অ্যালান বর্ডারের নেতৃত্বাধীন অজি দলের সাথে পাকিস্তান গমন করেন। ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৮ তারিখে করাচীতে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক পাকিস্তানের বিপক্ষে ওডিআইয়ে অংশ নেয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে প্রবেশ করেন।
একই সফরের ১৪ অক্টোবর, ১৯৮৮ তারিখে লাহোরে অনুষ্ঠিত সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে তাঁর অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। খেলায় তিনি ২৬ ও ২১ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, উইকেটের পিছনে অবস্থান করে একটি ক্যাচ গ্লাভসবন্দীকরণে অগ্রসর হন। তবে, প্রতিপক্ষীয় অধিনায়ক জাভেদ মিয়াঁদাদের অনবদ্য দ্বি-শতকের কল্যাণে সফরকারীরা ইনিংস ও ১৮৮ রানে পরাজয়বরণ করলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে পিছিয়ে পড়ে।
১৯৮৯-৯০ মৌসুমে অ্যালান বর্ডারের নেতৃত্বাধীন অজি দলের সদস্যরূপে প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ড গমন করেন। ১৫ মার্চ, ১৯৯০ তারিখে ওয়েলিংটনে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের একমাত্র টেস্টে অংশ নেন। ব্যাটিংয়ে নেমে ০ ও ১০ রান সংগ্রহ করেন। এছাড়াও, চারটি ক্যাচ গ্লাভসবন্দী করেছিলেন। প্রতিপক্ষীয় অধিনায়ক জন রাইটের অনবদ্য ব্যাটিংশৈলীর কল্যাণে স্বাগতিকরা ৯ উইকেটে জয় পায়।
১৯৯৩-৯৪ মৌসুমে নিজ দেশে প্রথমবারের মতো টেস্ট খেলেন। মার্টিন ক্রো’র নেতৃত্বাধীন কিউই দলের মুখোমুখি হন। ১২ নভেম্বর, ১৯৯৩ তারিখে পার্থে অনুষ্ঠিত সফররত নিউজিল্যান্ড দলের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের সাথে নিজেকে জড়ান। প্রথম ইনিংসে ১০৩ রানে পৌঁছানোকালে ব্যক্তিগত পূর্বতন সর্বোচ্চ রান অতিক্রম করেন। একবার ব্যাটিংয়ে নামার সুযোগ পেয়ে ১১৩* রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, পাঁচটি ক্যাচ গ্লাভসবন্দী করেছিলেন। তবে, অ্যান্ড্রু জোন্সের অসাধারণ ব্যাটিং দৃঢ়তায় বৃষ্টিবিঘ্নিত খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।
১৯৯৬-৯৬ মৌসুমে ব্রিসবেন টেস্টে সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ব্যক্তিগত সেরা ১৬১ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন।
১৯৯৭-৯৮ মৌসুমে নিজ দেশে স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের নেতৃত্বাধীন কিউই দলের মুখোমুখি হন। ৭ নভেম্বর, ১৯৯৭ তারিখে ব্রিসবেনে অনুষ্ঠিত সফররত নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ব্যক্তিগত সফলতার ছাঁপ রাখেন। প্রথম ইনিংসে ৩০ রানে পৌঁছানোকালে টেস্টে ৩৫০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। খেলায় তিনি ৬৮ ও ২৫ রান সংগ্রহসহ দুইটি ক্যাচ গ্লাভসবন্দী করেছিলেন। দলীয় অধিনায়ক মার্ক টেলরের অসাধারণ অল-রাউন্ড ক্রীড়া নৈপুণ্যের কল্যাণে স্বাগতিকরা ১৮৬ রানে জয়লাভ করলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।
৪ অক্টোবর, ১৯৯৮ তারিখে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত টেস্টে কলিন মিলারের বল থেকে ওয়াসিম আকরামের ক্যাচ গ্লাভসবন্দী করে নিজেকে স্মরণীয় করে রাখেন। এ পর্যায়ে সর্বাধিক সফলতম উইকেট-রক্ষক হিসেবে নিজের পরিচিতি ঘটান। রড মার্শের ৩৫৬ ডিসমিসালকে পাশ কাটিয়ে নতুন রেকর্ড গড়েন।
১৯৯৮-৯৯ মৌসুমে নিজ দেশে অ্যালেক স্টুয়ার্টের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ দলের মুখোমুখি হন। ২৬ ডিসেম্বর, ১৯৯৮ তারিখে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত সফররত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের চতুর্থ টেস্টে অংশ নেন। বক্সিং ডে পুরোপুরি বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে যায় ও ৬০০০০ দর্শকের আক্ষেপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। খেলা শুরু হবার পূর্বক্ষণে বৃষ্টি আঘাত হানে। ঘটনাবহুল খেলার চতুর্থ দিন টেস্টে ৩৫০তম ক্যাচ গ্লাভসবন্দীকরণের সাথে নিজেকে জড়ান। খেলায় তিনি তিনটি ক্যাচ গ্লাভসবন্দী করেন। এছাড়াও, ব্যাট হাতে নিয়ে ৩৬ ও ০ রান সংগ্রহ করেছিলেন। ডিন হ্যাডলি’র অসাধারণ বোলিংশৈলীর কল্যাণে ১২ রানে পরাজয়বরণ করলেও স্বাগতিকরা পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
দশ বছরের অধিক সময় ধরে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। টেস্টে দূর্ভাগ্যজনক ঘটনার সাথে নিজেকে জড়ান। ২৩জন খেলোয়াড়ের অন্যতম হিসেবে উভয় ইনিংসে শূন্য রানে রান-আউটের শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। তন্মধ্যে, মার্ক টেলরের সাথে দুই টেস্টের উভয় ইনিংসে রান সংগ্রহ ব্যতিরেকে মাঠ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
১৯৯৯-২০০০ মৌসুমে প্রথমবারের মতো জিম্বাবুয়ের মাটিতে টেস্ট খেলেন। ঐ মৌসুমে স্টিভ ওয়াহ’র নেতৃত্বাধীন অজি দলের সদস্যরূপে জিম্বাবুয়ে গমন করেন। প্রসঙ্গতঃ, এটিই উভয় দলের মধ্যকার উদ্বোধনী টেস্ট ছিল। ১৪ অক্টোবর, ১৯৯৯ তারিখে হারারেতে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের একমাত্র-টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি একবার ব্যাটিংয়ে নেমে ৫ রান সংগ্রহ করেছিলেন। পাশাপাশি, উইকেটের পিছনে অবস্থান করে দুইটি ক্যাচ তালুবন্দীকরণে অগ্রসর হন। দলীয় অধিনায়কের অসাধারণ শতকের কল্যাণে স্বাগতিকরা ১০ উইকেটে পরাজয়বরণ করে। পরবর্তীতে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।
টেস্টগুলোয় তিনি ৩৩৬ ক্যাচ ও ২৯ স্ট্যাম্পিং করেছিলেন। এছাড়াও, চার শতক সহযোগে ২৭.৩৯ গড়ে চার সহস্রাধিক রানের সন্ধান পেয়েছিলেন। মাত্র দশজন অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটারের অন্যতম হিসেবে শতাধিক টেস্টে অংশগ্রহণের গৌরব অর্জন করেন। এক পর্যায়ে দলের অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আটটি ওডিআইয়ে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে পাঁচটিতে জয় পায় ও তিনটি পরাজিত হয় তাঁর দল। ওডিআইয়ে ২৩৩টি ডিসমিসাল ঘটিয়েছিলেন।
খেলোয়াড়ী জীবনের শেষদিকে এসে উদীয়মান অ্যাডাম গিলক্রিস্টের ব্যাটিং সাফল্যের কাছে ম্লান হয়ে পড়েন ও তাঁকে বিদেয় নিতে হয়। ১৯৯৯ সালে ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণকালীন বিশ্বের সেরা উইকেট-রক্ষক হিসেবে বিবেচিত হতেন।
১৯৯৪ সালে উইজডেন কর্তৃক অন্যতম বর্ষসেরা ক্রিকেটারের সম্মাননাপ্রাপ্ত হন। ৯ ডিসেম্বর, ২০০৪ তারিখে স্পোর্ট অস্ট্রেলিয়া হল অব ফেমে তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শেন ওয়ার্ন, আর্থার মরিস, অ্যালান বর্ডার ও নীল হার্ভে’র সাথে অস্ট্রেলিয়ার শতাব্দীর সেরা টেস্ট দলে ঠাঁই পেয়েছেন। ক্রিকেট খেলা থেকে অবসর গ্রহণের পর ধারাভাষ্যকর্মের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এক পর্যায়ে কুইন্সল্যান্ডের বোর্ড পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও, সমারভিল হাউজ ক্রিকেট দলের প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত। টিএ হিলি নামীয় সন্তানের জনক।
