১৩ জানুয়ারি, ১৯৮২ তারিখে পাঞ্জাবের লাহোরে জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার। মূলতঃ উইকেট-রক্ষক-ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলেছেন। উইকেট-রক্ষণের পাশাপাশি ডানহাতে কার্যকর ব্যাটিংশৈলী প্রদর্শন করতেন। পাকিস্তানের পক্ষে সকল স্তরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।
বিখ্যাত অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার অ্যাডাম গিলক্রিস্টের পর ক্রিকেট জগতে সর্বাধিক গুরুত্বতা তুলে ধরেছেন। ধ্বংসাত্মক ব্যাটিংয়ের কারণে দিন, ইনিংস, ধাঁপ পরিবর্তনে ব্যাট হাতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল। তাঁর ব্যাটিং নিয়ে কিছুটা সন্দেহ ছিল। ড্রাইভে তাঁর দক্ষতা এবং কাট ও পুলে শক্তিমত্তার বিষয়টি উপমহাদেশের নিশ্চল পিচে সফলতার লাভ করা সর্বদাই বিরাট ভূমিকার দাবীদার রাখে।
১৯৯৭-৯৮ মৌসুম থেকে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন চলমান রাখেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর পাকিস্তানী ক্রিকেটে লাহোর ও পাকিস্তান ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়াও, এশিয়া একাদশ, ডাম্বুলা ভাইকিং, লাহোর সিটি, লাহোর ঈগলস, লাহোর লায়ন্স, পেশাওয়ার জালমি, পাঞ্জাব স্ট্যালিয়ন্স, রাজস্থান রয়্যালস, সেন্ট লুসিয়া স্টার্স, টরন্টো ন্যাশনালস এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর পক্ষে খেলেছেন।
২০০২ থেকে ২০১০ সময়কালে পাকিস্তানের পক্ষে সর্বমোট ৫৩ টেস্ট, ১৫৭টি ওডিআই ও ৫৮টি টি২০আইয়ে অংশ নিয়েছেন। ২০০২-০৩ মৌসুমে ওয়াকার ইউনুসের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানী দলের সাথে জিম্বাবুয়ে গমন করেন। ৯ নভেম্বর, ২০০২ তারিখে হারারেতে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে তাঁর অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। রে প্রাইসের বল শূন্য রানে বোল্ড হয়ে আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়ী জীবনের যাত্রা শুরু করেছিলেন। দ্বিতীয় ইনিংসেও ৩৮ রান তুলে রে প্রাইসের শিকারে পরিণত হন। এছাড়াও, চারটি ক্যাচ গ্লাভসবন্দী করেছিলেন। তবে, তৌফিক উমরের অসাধারণ ব্যাটিংশৈলীর কল্যাণে সফরকারীরা ১১৯ রানে জয় পায় ও দুই-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে এগিয়ে যায়।
নভেম্বর, ২০০২ সালে কঠিন সময় অতিবাহনের পর নিজেকে মেলে ধরতে সচেষ্ট হন। তবে, নিজস্ব দ্বিতীয় টেস্টেই খেলার জগতে ফিরে আসেন। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্টে ৫৬ রান তুলেন। দুই টেস্টে নয়টি ডিসমিসাল ঘটিয়ে রশীদ লতিফ ও মঈন খানের শূন্যতা পূরণে স্বীয় সামর্থ্যের পরিচয় দেন।
জানুয়ারির কোন এক সকালে করাচী টেস্টে সফরকারী ভারতের বিপক্ষে ঐ দশকের অন্যতম সেরা টেস্ট ইনিংস খেলেছিলেন। এ পর্যায়ে দলে কেবলমাত্র তিনিই সফলতা পেয়েছিলেন ও শতক হাঁকান। কিন্তু, গ্লাভস হাতে নিয়ে শুরু থেকেই বেশ প্রতিশ্রুতিশীলতার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন। ২০০৪ সালের শেষদিকে কার্যতঃ রশীদ লতিফ ও মঈন খানের সাথে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান ঘটে। খুব কমসংখ্যক খেলায় তাঁর ভুল-ত্রুটি ধরা পড়ে। সবসময় না হলেও তাঁর ভালো খেলা ইয়ান হিলি’র কাছেও বিস্ময়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে, বিরামহীনভাবে তিন স্তরের খেলায় অংশ নেয়ার ফলে কিছু ভুল-ভ্রান্তি ঘটতে থাকে ও ক্রিকেট বিশ্লেষকদের কাছে তাঁর ক্ষাণিকটা বিশ্রামের কথা তুলে ধরা হতে থাকে।
২৯ জানুয়ারি, ২০০৫ তারিখে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত শতকের সন্ধান পান। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ইনিংস উদ্বোধনে নেমে শতক হাঁকান। ১২৪ রানের ইনিংস খেলে ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার পান। তাঁর ঐ ইনিংসের কল্যাণে পাকিস্তান দল ছয় উইকেটে জয় পায়। মার্চ, ২০০৫ সালে স্বর্ণালী মুহূর্ত অতিবাহিত করেন। স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে চণ্ডীগড়ে অনুষ্ঠিত টেস্টে আব্দুল রাজ্জাককে সাথে নিয়ে বীরোচিত ভূমিকা রাখেন। দূর্দান্ত শতক হাঁকিয়ে টেস্টটি ড্র করান ও সিরিজে ১-১ ব্যবধানে সমতা আসে।
জুন, ২০০৫ সালে স্ট্যাম্পের পিছনে অবস্থান করে বিশ্বস্ততার পরিচয় দেন। কিংস্টন টেস্টে নয়টি ক্যাচ তালুবন্দী করেন। সাময়িক নীরবতা ভেঙ্গে উইকেট-রক্ষণে দক্ষতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে সমালোচকদের সমুচিত জবাব দেন। নভেম্বর, ২০০৫ সালে সাদা-বলের খেলায় স্বীয় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। লাহোরে সফরকারী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মোহাম্মদ ইউসুফের ২২৩ রানের পাশাপাশি ১৫৪ রান তুলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ২-০ ব্যবধানে বিজয়ে ভূমিকা রাখেন। ডিসেম্বর, ২০০৫ সালে ওডিআইয়েও চমৎকার ছন্দে ছিলেন। ইংরেজদের ধারহীন বোলিং আক্রমণ প্রতিহত করে লাহোর ও করাচীতে অনুষ্ঠিত ওডিআইগুলোয় উপর্যুপরী শতক হাঁকান।
জানুয়ারি, ২০০৬ সালে ভারতের বিপক্ষে স্বর্ণালী মুহূর্ত অতিবাহিত করেন। করাচীতে সিরিজ নির্ধারণী টেস্টে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস উপহার দেন। ইরফান পাঠানের হ্যাট্রিকের কল্যাণে প্রথম ওভার শেষে ০/৩ ও পরবর্তীতে ৩৯/৬ থাকা অবস্থায় ব্যাটিংয়ে নামেন। আব্দুল রাজ্জাকের সাথে জুটি গড়েন। পাল্টা আক্রমণ শেনে ১৪৮ বলে ১১৩ রান তুলে দলকে অসম্ভব জয় এনে দেন। এ সিরিজে ব্যক্তিগতভাবে সফল ছিলেন। ২৯৩ রান সংগ্রহের পাশাপাশি ১১টি ডিসমিসাল ঘটিয়েছিলেন।
জানুয়ারি, ২০০৭ সালে চাপের মুখে পড়েও বীরোচিত ভূমিকা রাখেন। ব্যাটিং অনুপযোগী পিচে পাকিস্তানের পাঁচ উইকেটের পতনের পর আরও ৯৯ রান তুলে দলকে জয়ে বিরাট অবদান রাখেন। পোর্ট এলিজাবেথে অনুষ্ঠিত ঐ টেস্টে স্থিরলয়ে অর্ধ-শতকের ইনিংস খেলেন ও ইউনুস খানকে যোগ্য সঙ্গ দেন। ৩১ জানুয়ারি, ২০০৭ তারিখে স্ট্যাম্পের পিছন থেকে তাঁকে সড়িয়ে আনা হয়। ব্যাটিংয়ের মান ক্রমাগত উন্নতির দিকে যেতে থাকায় তাঁর উইকেট-রক্ষণের মান নিচেরদিকে যেতে থাকে। ফলশ্রুতিতে, দল নির্বাচকমণ্ডলী তাঁকে বিশ্রামে পাঠান ও গুরুত্ব আরোপে ফিরিয়ে আনার কথা তুলে ধরেন। অন্যদিকে, রশীদ লতিফের ন্যায় অভিজ্ঞজন বিষয়টিকে কৌশলগত ত্রুটিরূপে উল্লেখ করেন।
অক্টোবর, ২০০৭ সালে আবারও চাপের মুখে ব্যাটিং করে দলের বিপর্যয় রক্ষায় নিজেকে মেলে ধরেন। নিজ দেশে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এ সফলতা পান। লাহোরে অনুষ্ঠিত ড্র হওয়া ঐ টেস্টে উভয় ইনিংসে গুরুত্বপূর্ণ অর্ধ-শতরানের ইনিংস খেলেছিলেন। নভেম্বর, ২০০৭ সালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিপক্ষে আরও একটি শতক হাঁকিয়েছিলেন। এরফলে, স্বাগতিক দলের বিপক্ষে গুরুতর অবস্থা থেকে দলকে ফলো-অন থেকে রক্ষা করাসহ খেলাকে রক্ষা করেন। ইডেন গার্ডেন্সে মিসবাহ-উল-হকের সাথে জুটি গড়েছিলেন। ভারতের সংগৃহীত পর্বতসম ৬১৬ রানের জবাবে ১৫০/৬ থাকা অবস্থায় নেমে এ সফলতা পেয়েছিলেন।
২০০৮-০৯ মৌসুমে নিজ দেশে মাহেলা জয়াবর্ধনে’র নেতৃত্বাধীন শ্রীলঙ্কান দলের মুখোমুখি হন। ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ তারিখে করাচীতে অনুষ্ঠিত সফররত শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। ১৫৮* রান সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়াও, তিনটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। তবে, ইউনুস খানের (৩১৩) মনোরম ত্রি-শতকের কল্যাণে খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ালে দুই-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।
৩ মে, ২০০৯ তারিখে মরুভূমিতে অজি দলের বশের কারণ হয়ে দাঁড়ান। কর্তৃত্বমূলক ভূমিকায় অগ্রসর হন। আবুধাবিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১১৬ রানের অপরাজিত ইনিংস উপহার দিয়ে পাকিস্তান দলকে বিরাট জয় এনে দেন। এরপর, দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত টি২০ খেলায় ৫২ রান তুলেও একই ভূমিকা রাখেন।
২১ জুন, ২০০৯ তারিখে বিশ্ব টি২০ প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত খেলায় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দূর্দান্ত খেলেন। শহীদ আফ্রিদি’র সাথে তাল মিলিয়ে ২৮ বলে ৩৩ রান তুলে খেলাকে পাকিস্তানের অনুকূলে নিয়ে আসেন। নভেম্বর, ২০০৯ সালে কনিষ্ঠ ভ্রাতা উমর আকমলের সাথে ডুনেডিনে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডকে প্রায় পরাজিত করে ফেলেছিলেন। ১৭৬ রানের জুটিতে কামরান আকমলের ৮২ ও উমর আকমলের প্রথম শতক সত্ত্বেও ৩২ রানে দল পরাজয়বরণ করে। এরপর ভ্রাতৃদ্বয় ওয়েলিংটনে অনুষ্ঠিত সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে আবারও নিজেদেরকে মেলে ধরতে সচেষ্ট হন। প্রথম ইনিংসে কামরান আকমলের ৭০ রানের পাশাপাশি দ্বিতীয় ইনিংসে উমর আকমলের শ্বাসরুদ্ধকর ৩৩ বলে ৫২ রান পাকিস্তানকে জয় এনে দেয়।
মানসম্মত স্পিনে ব্যাটসম্যানদেরকে ফেরৎ পাঠাতে ব্যর্থ হন। পরবর্তী বছরগুলোয় দানিশ কানেরিয়া’র বলে সফলতা নিয়ে আসতে পারেননি ও বিরাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধারাবাহিকভাবে ভুল করতে থাকায় দলকে খেসারত গুণতে হয়। তন্মধ্যে, ২০০৯-১০ মৌসুমের সিডনি টেস্টে চারটি ক্যাচ ও একটি রান-আউটের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারেননি। ফলশ্রুতিতে, জানুয়ারি, ২০১০ সালে অস্ট্রেলিয়া খেলায় ফিরে আসে ও জয় তুলে নেয়। মাইকেল হাসি ও পিটার সিডলকে বেশ কয়েকবার বিদেয় করতে পারেননি। পরের খেলায় অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রাখা হয়। ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১০ তারিখে রান তুলে দল নির্বাচকমণ্ডলীকে জবাব দেন। ৩৩ বলে ৬৪ রান তুলে টি২০ খেলায় অস্ট্রেলিয়ার ১২৭ রানের জয়ের লক্ষ্যমাত্রায় মাত্র ২ রানে পরাজিত হয়। অপূর্ব ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শন সত্ত্বেও সংযুক্ত আব আমিরাতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টি২০ সিরিজে তাঁকে খেলানো হয়নি। এরপর, দল থেকে বাদ পড়েন ও শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে জরিমানার সম্মুখীন হন। ১০ মার্চ, ২০১০ তারিখে ৩ মিলিয়ন রূপী জরিমানা ও ছয় মাসের নজরদারীতে পড়েন।
২০১০ সালে সালমান বাটের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানী দলের সাথে ইংল্যান্ড গমন করেন। ২৬ আগস্ট, ২০১০ তারিখে লন্ডনের লর্ডসে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের চতুর্থ টেস্টে অংশ নেন। চারটি ক্যাচ গ্লাভসবন্দী করেন। এছাড়াও, ১৩ ও ১ রান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে, স্টুয়ার্ট ব্রডের অসামান্য অল-রাউন্ড নৈপুণ্যে স্বাগতিকরা ইনিংস ও ২২৫ রানে জয় পেয়ে ৩-১ ব্যবধানে সিরিজ করায়ত্ত্ব করে নেয়। পরবর্তীতে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।
