| |

রজার বিনি

১৯ জুলাই, ১৯৫৫ তারিখে কর্ণাটকের ব্যাঙ্গালোরে জন্মগ্রহণকারী ইঙ্গ-ভারতীয় বংশোদ্ভূত ক্রিকেটার ও কোচ। মূলতঃ অল-রাউন্ডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ডানহাতে ব্যাটিং করতেন। এছাড়াও, ডানহাতে মিডিয়াম বোলিংয়ে দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। ভারতের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন।

১৯৭৫-৭৬ মৌসুম থেকে ১৯৯১-৯২ মৌসুম পর্যন্ত সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন চলমান রাখেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর ভারতীয় ক্রিকেটে গোয়া ও কর্ণাটকের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। কর্ণাটক দলের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। দীর্ঘদেহী, স্বর্ণকেশর ও অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির অধিকারী। বেশ দূরত্ব নিয়ে বোলিংকালে রমণীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। শারীরিক গড়নের কারণে দলীয় সঙ্গীরা জ্যাকফ্রুটের সংক্ষিপ্ত রূপ ‘জ্যাকি’ ডাকনামে আখ্যায়িত করেন।

উপযোগী পরিবেশে বলকে উভয়দিক দিয়েই সাদামাটাভাবে সুইং করাতে পারতেন। ইংরেজ পরিবেশেই তাঁর বোলিং অধিক কার্যকরী ছিল। দলে সর্বদাই আসা-যাওয়ার পালায় ছিলেন। তাসত্ত্বেও, যখনই খেলতেন, তখনই নিজের কার্যকরীভাব ফুঁটিয়ে তুলতেন। জনপ্রিয় ভারতীয় স্পিনার চতুষ্টয়ের পর বোলিং আক্রমণে নতুন মাত্রা আনেন। প্রায়শঃই ব্যাট হাতে নিয়ে দলে বিরাট ভূমিকা রাখতেন। উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলেছেন। ১৯৭৭-৭৮ মৌসুমে কর্ণাটকের সদস্যরূপে ২১১ রান তুলে সংবাদ শিরোনামে পরিণত হন। রঞ্জী ট্রফিতে কেরালার বিপক্ষে ঐ খেলায় সঞ্জয় দেশাইয়ের সাথে প্রথম উইকেটে ৪৫১ রানের নিরবিচ্ছিন্ন জুটি গড়েন। তাঁদের সংগৃহীত এ রান প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে সর্বোচ্চ অপরাজিত জুটিরূপে স্বীকৃতি পাচ্ছে। এছাড়াও, মাঝারিসারিতে ব্যাটিংয়ে নামতেন। পরিস্থিতি বুঝে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতেন।

১৯৭৯ থেকে ১৯৮৭ সময়কালে ভারতের পক্ষে সর্বমোট ২৭ টেস্ট ও ৭২টি ওডিআইয়ে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৭৯-৮০ মৌসুমে নিজ দেশে আসিফ ইকবালের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানী দলের মুখোমুখি হন। ২১ নভেম্বর, ১৯৭৯ তারিখে ব্যাঙ্গালোরে অনুষ্ঠিত সফররত পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে তাঁর অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। প্রথম ইনিংসে ৪৬ রান তুললেও ঐ খেলায় উইকেট শূন্য অবস্থায় তাঁকে মাঠ ত্যাগ করতে হয়েছিল। খেলাটি ড্রয়ের দিকে গড়ায় ও ছয়-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজটি অমিমাংসিত অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে।

এরপর, ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭৯ তারিখে বোম্বের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত নিজস্ব তৃতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসের শুরুতে মজিদ খান, জহির আব্বাসজাভেদ মিয়াঁদাদকে বিদেয় করে ধ্বস নামান। ঐ টেস্টে তাঁর দল ১৩১ রানে জয় পেয়েছিল।

১৯৭৯-৮০ মৌসুমে দলের সাথে অস্ট্রেলিয়া গমন করেন। ৬ ডিসেম্বর, ১৯৮০ তারিখে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো ওডিআইয়ে অংশ নেন। ১৯৮৩ সালে আহমেদাবাদে অনুষ্ঠিত টেস্টের প্রথম দিন সকালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুখোমুখি হন। প্রতিপক্ষের সংগ্রহ এক অঙ্কের কোটায় রেখেই গর্ডন গ্রীনিজ, ডেসমন্ড হেইন্সভিভ রিচার্ডসকে প্যাভিলিয়নে ফেরৎ পাঠান। তবে, মাইকেল হোল্ডিংয়ের অপূর্ব বোলিংয়ের কারণে তাঁর দল পরাজয়বরণ করেছিল।

১৯৮০-৮১ মৌসুমে প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট খেলেন। ঐ মৌসুমে সুনীল গাভাস্কারের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের সদস্যরূপে নিউজিল্যান্ড গমন করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮১ তারিখে ওয়েলিংটনে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উদ্বোধনী টেস্টে অংশ নেন। খেলায় তিনি বল হাতে নিয়ে ১/৬৭ ও ২/২৬ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, ব্যাট হাতে ১১ ও ২৬* রান সংগ্রহসহ একটি ক্যাচ তালুবন্দী করেছিলেন। তবে, সন্দীপ পাতিলের অসাধারণ অল-রাউন্ড ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শন সত্ত্বেও সফরকারীরা ৬২ রানে পরাজিত হলে তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে পিছিয়ে পড়ে।

১৯৮৩ সালে নিজ শহর ব্যাঙ্গালোরে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে অংশ নেন। মদন লালের সাথে সপ্তম উইকেট জুটিতে ১৫৫ রান সংগ্রহ করেছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে ৮৩ রানে অপরাজিত ছিলেন। দলের সংগ্রহ ৮৫/৬ থেকে ২৭৫ রানে নিয়ে যান।

১৯৮৬ সালে হেডিংলিতে অনুষ্ঠিত টেস্টে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দারুণ খেলেন। ঐ টেস্টে ৫৮ রান খরচায় ৭ উইকেট দখল করেন। তিন-টেস্ট নিয়ে গড়া ঐ সিরিজে ভারত দল ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। এরপর, ১৯৮৬ সালে ইডেন গার্ডেন্সে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে এক পর্যায়ে মাত্র ৩০ বলের ব্যবধানে ৯ রান খরচায় ৪ উইকেট তুলে নিয়ে দর্শনীয় বোলিং করেছিলেন। এ ইনিংসে ব্যক্তিগত সেরা ৬/৫৬ বোলিং পরিসংখ্যান গড়েন।

ভারতের পক্ষে ২ টেস্ট ও ৭ ওডিআইয়ে ইনিংস উদ্বোধনে নেমেছিলেন। সব মিলিয়ে ২৭ টেস্ট ও ৭২টি ওডিআইয়ে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। অভিষেক টেস্টের ন্যায় সর্বশেষ টেস্টও ব্যাঙ্গালোরেই খেলেছিলেন। ১৯৮৬-৮৭ মৌসুমে নিজ দেশে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানী দলের মুখোমুখি হন। ১৩ মার্চ, ১৯৮৭ তারিখে ব্যাঙ্গালোরে অনুষ্ঠিত সফররত পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের পঞ্চম ও চূড়ান্ত টেস্টে অংশ নেন। ০/২৫ বোলিং বিশ্লেষণ দাঁড় করান। এছাড়াও, ব্যাট হাতে নিয়ে ১ ও ১৫ রান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে, সুনীল গাভাস্কারের প্রাণান্তঃকর প্রয়াস চালানো স্বত্ত্বেও সফরকারীরা ১৬ রানের নাটকীয় জয় পেয়ে পাঁচ-টেস্ট নিয়ে গড়া সিরিজে ১-০ ব্যবধানে বিজয়ী হয়। পরবর্তীতে, এটিই তাঁর সর্বশেষ টেস্টে পরিণত হয়।

ভারতের পক্ষে বহুমূখী প্রতিভার অধিকারী অল-রাউন্ডার হিসেবে খেলতেন। আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান ও দূর্দান্ত ফিল্ডার হিসেবে খেলেছেন। তবে, বোলার হিসেবেই মূখ্যতঃ তাঁকে জাতীয় দলে ঠাঁই দেয়া হয়েছিল। টেস্ট ক্রিকেটের তুলনায় সীমিত-ওভারের ক্রিকেটেই অধিক সফলতার স্বাক্ষর রাখেন।

১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় ভারতের প্রথম শিরোপা বিজয়ে অন্যতম ভূমিকা পালন করেন ও দলের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিলেন। ঐ প্রতিযোগিতায় ১৮ উইকেট নিয়ে শীর্ষ উইকেট শিকারীতে পরিণত হন ও প্রতিযোগিতার ইতিহাসের সর্বোচ্চ উইকেট লাভের তৎকালীন রেকর্ড গড়েন। এছাড়াও, ১৯৮৪-৮৫ মৌসুমে বেনসন এন্ড হেজেস বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপে প্রায় একাকী দলের শিরোপা বিজয়ে অংশ নেন। মাত্র ১৩.৬৭ গড়ে ৯ উইকেট দখল করেছিলেন তিনি।

ক্রিকেট খেলা থেকে অবসর গ্রহণের পর কোচিং জগতের দিকে ধাবিত হন। জানুয়ারি, ২০০০ সালে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় দলের শিরোপা বিজয়ে দলকে পরিচালনা করেছিলেন। ২০০৭ সালে বাংলা দলের কোচ হন। এরপূর্বে কর্ণাটক স্টেট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের ব্যবস্থাপনায় যুক্ত ছিলেন। ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১২ সালে জাতীয় দল নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য হন।

ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত তিনি। মায়ান্তি ল্যাঙ্গারের সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। তাঁর সন্তান স্টুয়ার্ট বিনি ভারতের পক্ষে খেলেছেন।

Similar Posts

  • | |

    কেন উইলিয়ামসন

    ৮ আগস্ট, ১৯৯০ তারিখে তৌরাঙ্গা এলাকায় জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত ক্রিকেটার। মূলতঃ শীর্ষসারির ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলছেন। ডানহাতে ব্যাটিং করে থাকেন। এছাড়াও, ডানহাতে অফ-ব্রেক বোলিংয়ে পারদর্শী। নিউজিল্যান্ডের পক্ষে সকল স্তরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন ও অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৭ সাল থেকে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন চলমান রাখছেন। ঘরোয়া আসরের প্রথম-শ্রেণীর নিউজিল্যান্ডীয় ক্রিকেটে নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্টস এবং ইংরেজ কাউন্টি ক্রিকেটে…

  • |

    টেড টাইলার

    ১৩ অক্টোবর, ১৮৬৪ তারিখে ওরচেস্টারশায়ারের কিডারমিনস্টার এলাকায় জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার ছিলেন। মূলতঃ বোলার হিসেবে দলে ভূমিকা রাখতেন। স্লো লেফট-আর্ম অর্থোডক্স বোলিংয়ের পাশাপাশি বামহাতে নিচেরসারিতে ব্যাটিং করতেন। ১৮৯০-এর দশকে ইংল্যান্ডের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছিলেন। শুরুরদিকের অধিকাংশ খেলাই কিডারমিনস্টার ক্লাবের পক্ষে খেলেছেন। ১৮৮৫ ও ১৮৮৬ সালে দুই বছর ওরচেস্টারশায়ার একাদশের সদস্য ছিলেন। ১৮৮৫ সালে বোলিংয়ে বেশ সফলতার…

  • | |

    ক্রেগ ম্যাকডারমট

    ১৪ এপ্রিল, ১৯৬৫ তারিখে কুইন্সল্যান্ডের রেসভিউ এলাকায় জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত ক্রিকেটার ও কোচ। মূলতঃ বোলার হিসেবে দলে ভূমিকা রেখেছেন। ডানহাতে ফাস্ট বোলিংয়ের পাশাপাশি ডানহাতে নিচেরসারিতে ব্যাটিংয়ে নামতেন। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে টেস্ট ও ওডিআইয়ে অংশ নিয়েছেন। ‘বিলি’ ডাকনামে ভূষিত ক্রেগ ম্যাকডারমট ১.৯১ মিটার উচ্চতার অধিকারী। ১৯৮৩-৮৪ মৌসুম থেকে ১৯৯৫-৯৬ মৌসুম পর্যন্ত সময়কালে প্রথম-শ্রেণীর খেলোয়াড়ী জীবন সরব রাখেন। ঘরোয়া…

  • |

    কিথ দাবেঙ্গা

    ১৭ আগস্ট, ১৯৮০ তারিখে বুলাওয়েতে জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার। মূলতঃ অল-রাউন্ডার হিসেবে খেলতেন। বামহাতে ব্যাটিং করতেন। পাশাপাশি, স্লো লেফট-আর্ম অর্থোডক্স বোলিংয়ে পারদর্শী। জিম্বাবুয়ের পক্ষে সকল স্তরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন। ছোটখাটো গড়নের অধিকারী ও কিঞ্চিৎ শক্তিধর হলেও মাঠে বেশ দৌঁড়ুতে পারেন। বুলাওয়েভিত্তিক বাইনেস জুনিয়র ও মিল্টন হাই স্কুলে অধ্যয়ন করেছেন। লীগের খেলায় সুন্দর ক্রীড়ানৈপুণ্য প্রদর্শনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০১…

  • |

    এমজে গোপালন

    ৬ জুন, ১৯০৯ তারিখে মোরাপ্পাকামে জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার ছিলেন। মূলতঃ বোলার হিসেবে দলে ভূমিকা রেখে গেছেন। ডানহাতে ফাস্ট-মিডিয়াম বোলিং করতেন। এছাড়াও, ডানহাতে নিচেরসারিতে ব্যাটিংয়ে নামতেন। ভারতের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশগ্রহণ করেছেন। মাদ্রাজ ক্রিকেটের হর্তাকর্তা সিপি জনস্টোন সর্বপ্রথম তাঁর ক্রিকেট প্রতিভা সম্পর্কে অবগত হয়েছিলেন। বার্মা শেলে তাঁকে চাকুরী প্রদানে সহায়তা করেন তিনি। এরফলে, নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রতিভা বিকাশের সুযোগ…

  • | |

    মুশফিকুর রহিম

    ৯ জুন, ১৯৮৭ তারিখে বগুড়ায় জন্মগ্রহণকারী ক্রিকেটার। মূলতঃ উইকেট-রক্ষক-ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলছেন। উইকেট-রক্ষণের পাশাপাশি ডানহাতে মাঝারিসারিতে ব্যাটিংয়ে দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন। বাংলাদেশের পক্ষে সকল স্তরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন। এছাড়াও, বাংলাদেশ দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন।